প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
পাহাড়ের গায়ে মেঘের ভেলা, সবুজের সমারোহ আর প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য—এসব নিয়েই সাজেক ভ্যালীর পরিচিতি। কিন্তু সেই সৌন্দর্যের আড়ালে এখন জমছে অনিশ্চয়তার মেঘ। টানা সাত দিন ধরে সড়ক অবরোধ ও যোগাযোগব্যবস্থায় অচলাবস্থার প্রভাবে খাদ্যসংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার এই পর্যটন জনপদে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দা, মুদি দোকানদার, পর্যটন ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী মানুষ।
সাজেকের সঙ্গে যোগাযোগের বিকল্প পথ না থাকায় সড়ক অবরোধের প্রভাব সরাসরি পড়ছে স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রায়। দোকানে মজুত থাকা চাল, ডাল, তেল, শাকসবজিসহ প্রয়োজনীয় পণ্য ফুরিয়ে আসছে। নতুন করে পণ্য সরবরাহের ব্যবস্থা না হওয়ায় সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন চাহিদা পূরণ কঠিন হয়ে উঠছে। দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় মুদি দোকানদাররা জানান, এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে অবরোধ চলায় দোকানে আগে থেকে মজুত রাখা চাল, ডাল, তেল, শাকসবজি ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য শেষ হয়ে আসছে। নতুন করে সরবরাহ না থাকায় ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এভাবে অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়বে।
বিশেষ করে সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর জন্য পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। প্রতিদিনের উপার্জনের ওপর নির্ভরশীল মানুষ এবং পর্যটন খাতে কর্মরত ব্যক্তিরা একদিকে আয় কমে যাওয়া, অন্যদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট—দুই ধরনের চাপের মুখে পড়ছেন।
সাজেকের অর্থনীতির বড় একটি অংশ পর্যটননির্ভর। রিসোর্ট, হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহনসেবা ও ক্ষুদ্র ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত অসংখ্য মানুষের জীবিকা এ খাতের ওপর নির্ভরশীল।
সাজেকের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য অনিত্য ত্রিপুরা বলেন, পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত অনেক মানুষের জীবিকা বর্তমানে অনিশ্চয়তার মুখে। পর্যটকদের চলাচল ব্যাহত হওয়ায় রিসোর্ট, হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহনসেবা ও ক্ষুদ্র ব্যবসার স্বাভাবিক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। আয়-রোজগার কমে যাওয়ায় সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানোও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি না হলে খাদ্য সরবরাহের সংকটের পাশাপাশি পর্যটনশিল্প ও স্থানীয় অর্থনীতিতেও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হতে পারে।
সৃষ্ট পরিস্থিতি নিরসনে প্রশাসনিক পর্যায়ে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত ২৫ অক্টোবর রাঙামাটি জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে স্থানীয় হেডম্যান-কারবারিদের সাথে এবং ২৬ অক্টোবর বাঘাইছড়ি উপজেলা পরিষদে প্রশাসন ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন খাগড়াছড়ি জেলার সংসদ সদস্য আব্দুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া ও রাঙ্গামাটি জেলার সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ান,খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার শাহাদাৎ সহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অন্যদিকে আন্দোলনকারী ও সাজেকবাসীর পক্ষে উপস্থিত ছিলেন বাবুধন চাকমা, নতুন জয় চাকমা, উষাতন চাকমা, জিকো চাকমা ও সাধনা দেবী চাকমা।
বৈঠকে আন্দোলনকারীদের পাঁচটি দাবির মধ্যে চারটি বিষয়ে সমঝোতা হলেও একটি দাবি নিয়ে মতানৈক্য থেকে যায়। ফলে অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। আলোচনা হলেও মাঠপর্যায়ে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফেরেনি বলে স্থানীয়দের বক্তব্য।
স্থানীয়দের ভাষ্য, অবরোধের কারণে সাধারণ মানুষকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। তাঁদের মতে, অধিকার আদায়ের দাবি থাকতেই পারে; কিন্তু সেই দাবি ঘিরে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়া উচিত নয়, যেখানে সাধারণ মানুষ খাদ্যসংকটে পড়ে, কর্মজীবী মানুষের আয় বন্ধ হয়ে যায় কিংবা শিশুদের খাবার জোগাড় করা কঠিন হয়ে ওঠে।
এক স্থানীয় বাসিন্দা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা পাহাড়ে শান্তি চাই, পাহাড়ে বাঁচতে চাই। আমাদের সন্তানরা যেন খাবারের অভাবে কষ্ট না পায়। আমরা চাই, আলোচনার মাধ্যমে সুন্দর একটি সমাধান হোক।”
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও মনে করেন, এ ধরনের পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা, জীবন-জীবিকা ও নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে বিরোধের শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তির মাধ্যমে সাজেকের সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থা স্বাভাবিক করা প্রয়োজন।
অবরোধ কোনো সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়; বরং দীর্ঘায়িত হলে এর নেতিবাচক প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনেই সবচেয়ে বেশি পড়ে। দাবি আদায়ের প্রক্রিয়ায় যখন খাদ্য সরবরাহ ব্যাহত হয়, মানুষের আয় বন্ধ হয়ে যায় এবং একটি জনপদ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তখন সেই পরিস্থিতি কারও জন্যই কল্যাণ বয়ে আনে না।
সাজেকের বর্তমান পরিস্থিতি তাই শুধু যোগাযোগের সংকট নয়, এটি মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা, জীবিকা ও স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার প্রশ্নও। বিরোধের সমাধান আলোচনার টেবিলে হওয়াই কাম্য—যাতে কোনো পক্ষের দাবি উপেক্ষিত না হয়, আবার সাধারণ মানুষকেও সংকটের বোঝা বইতে না হয়।
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা, যোগাযোগব্যবস্থা স্বাভাবিক করা এবং চলমান অচলাবস্থার শান্তিপূর্ণ অবসান ঘটানো হোক। পাহাড়ের সৌন্দর্যের পাশাপাশি সাজেকের মানুষের জীবনেও ফিরুক স্বস্তি, নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক ছন্দ।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন