প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
দেশে উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ লবণ অবিক্রীত অবস্থায় থাকায় কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের লবণচাষিরা বর্তমানে লোকসানে রয়েছেন। এই প্রেক্ষাপটে দেড় লাখ মেট্রিক টন অপরিশোধিত লবণ আমদানির অনুমতি দেওয়ার ফলে চাষিদের মধ্যে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। চাষিরা আশঙ্কা করছেন, আমদানিকৃত লবণ বাজারে প্রবেশ করলে দেশীয় লবণের দাম ও চাহিদা আরও কমে যাবে। ফলে উৎপাদন খরচ তুলতে না পারার কারণে আগামী মৌসুমে অনেক চাষি লবণ উৎপাদন থেকে সরে দাঁড়াতে পারেন।
বিশেষ করে কুতুবদিয়া, মহেশখালী, পেকুয়া, চকরিয়া, কক্সবাজার সদর, টেকনাফ ও বাঁশখালীর লবণচাষিরা এ বিষয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। তাদের দাবি, নতুন করে লবণ আমদানির আগে দেশের বাজারে বিদ্যমান মৌজুদ, স্থানীয় উৎপাদন, চাহিদা, বাজারদর ও উৎপাদন খরচের বিষয়গুলো বিবেচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অবিক্রীত দেশীয় লবণ বাজারজাতের ব্যবস্থা করে চাষিদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
লবণচাষিরা অভিযোগ করেছেন, গত মৌসুমে বৈরী আবহাওয়া ও অতিবৃষ্টির কারণে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম হয়েছে। বাজারে প্রত্যাশিত দামও পাওয়া যায়নি। এর ফলে একদিকে উৎপাদন কমেছে, অন্যদিকে উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিপুল পরিমাণ অবিক্রীত লবণের চাপ।
বিসিক কক্সবাজার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত মৌসুমে কক্সবাজারের ৯টি উপজেলা ও চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে মোট ৬৭ হাজার ৭৫৭ একর জমিতে লবণ চাষ হয়। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৬ লাখ ৭৫ হাজার টন। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ১৯ লাখ ৩৫ হাজার টন। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় উৎপাদন কম হয়েছে প্রায় ৭ লাখ টন।
এছাড়া মাঠ ও বিভিন্ন সংরক্ষণস্থানে প্রায় ৪ লাখ টন লবণ অবিক্রীত রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। নতুন মৌসুম শুরুর আগে এই বিপুল পরিমাণ লবণ কীভাবে বাজারজাত হবে—তা নিয়ে চাষিদের মধ্যে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
বিসিক কক্সবাজার কার্যালয়ের পরিদর্শক ইদ্রিস মিয়া জানিয়েছেন, মাঠে প্রায় ৪ লাখ টন লবণ অবিক্রীত রয়েছে। অতিবৃষ্টির কারণে গত মৌসুমে চাষিদের নির্ধারিত সময়ের প্রায় ১৫ দিন আগেই মাঠ ছাড়তে হয়েছিল। এতে উৎপাদন কমে যায়। ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
কক্সবাজারের মাতামুহুরী এলাকার পশ্চিম বড়ভেওলার চাষি হারুনুর রশিদ গত মৌসুমে প্রায় ৬০ একর জমিতে লবণ উৎপাদন করেন। তিনি চকরিয়া উপজেলার পূর্ব বড়ভেওলা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। তার হিসাবে, লবণ উৎপাদনে প্রায় ৭০ লাখ টাকা ব্যয় হলেও বিক্রি করে পেয়েছেন মাত্র ৪০ লাখ টাকা। এতে তার প্রায় ৩০ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে।
হারুনুর রশিদ বলেন, "গত মৌসুমে প্রতি ৮০ কেজির বস্তা লবণ ৪৫০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। এর সঙ্গে প্রতি বস্তায় প্রায় ১৫০ টাকা পরিবহন খরচ যুক্ত হয়েছে। উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারদর কম হওয়ায় চাষিদের বড় ধরনের লোকসান গুনতে হয়েছে। লবণ চাষে এর আগে এত বড় লোকসানের মুখে পড়েননি।"
একই এলাকার রামপুরের চাষি নজরুল ইসলামের প্রায় ৫০ টন লবণ এখনো অবিক্রীত রয়েছে। খুটাখালী ইউনিয়নের বহলতলী মৌজার চাষি মিজানুর রহমান চৌধুরীর জমিতেও গত তিন মৌসুমের প্রায় ৫০ টন লবণ পড়ে আছে। তিনি প্রায় ১০০ একর জমিতে লবণ উৎপাদন করেছেন।
মাতামুহুরী উপজেলার বদরখালী ইউনিয়নের চাষি নুরুন নবী প্রায় ৩০০ একর জমিতে লবণ উৎপাদনে নিজস্ব পুঁজির পাশাপাশি ব্যাংকঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করেছিলেন। লোকসানের কারণে এখনো ঋণের পুরো টাকা পরিশোধ করতে পারেননি। তার দাবি, লবণ উৎপাদনে প্রায় ৮০ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে।
দেড় লাখ টন লবণ আমদানির অনুমতি
বাংলাদেশ লবণ মিল মালিক সমিতির পক্ষ থেকে আমদানির তদবিরের পর বিসিক চলতি বছরে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে লবণ আমদানির সুপারিশ করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত সপ্তাহে ব্যবসায়ীদের দেড় লাখ টন অপরিশোধিত লবণ আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়।
অনুমোদনের আওতায় ২৪৪টি লবণ মিলকে ৫৪৩ টন করে মোট ১ লাখ ৩২ হাজার ৫০০ টন এবং ভ্যাকুয়াম পদ্ধতিতে লবণ উৎপাদনকারী ৭টি প্রতিষ্ঠানকে ২ হাজার ৫০০ টন করে মোট ১৭ হাজার ৫০০ টন অপরিশোধিত লবণ আমদানির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে আমদানির অনুমোদিত পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫০ হাজার টন।
চাষিদের প্রশ্ন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় যখন বিপুল পরিমাণ মাঠে উৎপাদিত লবণ অবিক্রীত রয়েছে এবং উৎপাদন খরচ তুলতে না পেরে চাষিরা লোকসান গুনছেন, তখন কোন কল্পিত ঘাটতির ভিত্তিতে নতুন করে আমদানির অনুমতি দেওয়া হলো?
কক্সবাজার জেলা বিএনপির সহসভাপতি ও চকরিয়ার ডুলাহাজারা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান চৌধুরী (প্রকাশ খোকন মিয়া) বলেন, "মাঠের প্রকৃত পরিস্থিতি বিবেচনা না করেই লবণ আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এতে লবণচাষি এবং এ খাতের ওপর নির্ভরশীল বিপুলসংখ্যক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। আগামী নভেম্বর থেকে অনেক চাষি লবণ উৎপাদনে নামবেন না বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন।"
মাতামুহুরীর চাষি শোয়াইবুল ইসলাম সবুজ ও রামপুরের চাষি নজরুল ইসলাম বলেন, "গত জুনে মাতামুহুরী উপজেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ লবণের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু চাষিরা এখনো নিজেদের উৎপাদিত লবণ বিক্রি করতে পারছেন না। তাদের প্রশ্ন, দেশের মাঠে উৎপাদিত লবণ বিক্রির ব্যবস্থা না করে লবণ ঘাটতির আশঙ্কায় আমদানির অনুমতি দেওয়া আত্মঘাতি।"
মাতামুহুরী উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক চেয়ারম্যান জামিল ইব্রাহিম চৌধুরী বলেন, "গত বছর অনেক চাষি উৎপাদন খরচও তুলতে পারেননি। এরপরও পৈতৃক পেশা ধরে রাখতে আগামী মৌসুমে লবণ উৎপাদনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা। কিন্তু আমদানির খবরে চাষিদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।"
দেশের গুরুত্বপূর্ণ কৃষিভিত্তিক শিল্প
লবণ শুধুমাত্র একটি নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য নয়; দেশের শিল্প ও খাদ্যব্যবস্থার সঙ্গেও এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের দিনমজুর থেকে শুরু করে সর্বস্তরের মানুষ প্রতিদিনের খাবারে লবণ ব্যবহার করেন। একই সঙ্গে বিভিন্ন শিল্পকারখানায়ও বিপুল পরিমাণ লবণ ব্যবহৃত হয়।
কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের উপকূলীয় অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষের জীবিকা লবণ চাষ, পরিবহন, বিপণন, মজুত ও ব্যবসার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, এ খাতের সঙ্গে কমপক্ষে ১৫ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা নির্ভরশীল। ফলে লবণের বাজারে অস্থিরতা শুধু চাষিদের নয়, এর সঙ্গে যুক্ত শ্রমিক, ব্যবসায়ী, পরিবহনকর্মী ও অন্যান্য পেশাজীবীর ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
চাষিদের আশঙ্কা, অবিক্রীত দেশীয় লবণের বড় মৌজুদ থাকা অবস্থায় আমদানিকৃত লবণ বাজারে ঢুকলে বাজারদরের ওপর আরও চাপ তৈরি হতে পারে। এতে আগামী মৌসুমে চাষাবাদে বিনিয়োগের আগ্রহ কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
লবণচাষিদের দাবি, আমদানির আগে দেশের প্রকৃত মৌজুদ, উৎপাদন, বাজারের চাহিদা, বর্তমান দর ও উৎপাদন ব্যয় সমন্বিতভাবে পর্যালোচনা করা হোক। একই সঙ্গে অবিক্রীত দেশীয় লবণ দ্রুত বাজারজাত এবং উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা হোক। তাদের মতে, মাঠে লবণ উৎপাদন চাষিরা নিরুৎসাহিত হলে ভবিষ্যতে এই গুরুত্বপূর্ণ কৃষিভিত্তিক শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন