প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বিতুল পারওয়ান বিল ছিল একসময় পাঁচ গ্রামের বাসিন্দাদের ধান ও মাছের প্রধান উৎস। এই বিল গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার নাগরী ইউনিয়নের বিতুল, পারওয়ান, রয়েন, সিপুলিয়া ও পিপুলিয়া গ্রামের মানুষের চাহিদা মেটাতো।
২০২২ সাল থেকে বিভিন্ন কোম্পানি কৃষকদের কাছ থেকে জমি কিনে ঐতিহ্যবাহী এই বিল ভরাট করতে শুরু করেছে। সড়কের পাশে পাকা দেয়াল ও টিনের বেড়া দিয়ে রাতের অন্ধকারে ভরাট করা হচ্ছে বিলের জমি। ফলে এলাকার ফসল ও মাছের উৎস বিলীন হওয়ার পথে রয়েছে।
কালীগঞ্জ উপজেলার অধিকাংশ বিলের অবস্থা বিতুল পারওয়ান বিলের মতোই। এসব বিলের কৃষিজমি ভরাটের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। এতে খাদ্য উৎপাদন কমার পাশাপাশি এলাকার প্রাকৃতিক ভারসাম্য মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
কালীগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলায় মোট ১৫ হাজার ৩৩০ হেক্টর আবাদি জমি রয়েছে। এর মধ্যে ৯ হাজার ৫১ হেক্টর জমি এক ফসলি, চার হাজার ৭৮ হেক্টর দুই ফসলি এবং দুই হাজার ২০০ হেক্টর জমি তিন ফসলি।
কিন্তু কী পরিমাণ কৃষিজমি ভরাট হয়েছে বা ভরাট হওয়ার পথে রয়েছে, সে বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
গতকাল সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) ও আজ মঙ্গলবার সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, উপজেলার বিভিন্ন নিচু ও আবাদযোগ্য জমিতে মাটি ফেলে উঁচু করা হচ্ছে। কোথাও জমির একাংশ ইতোমধ্যে ভরাট হয়ে গেছে, কোথাও ভরাটের প্রস্তুতি চলছে। কৃষিজমির পাশেই পড়ে থাকতে দেখা যায় মাটির স্তূপ। সড়কের পাশে বিল বা নিচু কৃষিজমি ভরাট হচ্ছে প্রকাশ্যেই।
স্থানীয়রা জানান, মাঝে মাঝে প্রশাসন অভিযান চালিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা করে। তবে সংশ্লিষ্টরা চলে যাওয়ার পর ফের শুরু হয় ভরাটের কাজ। নাগরী বাজারসংলগ্ন সড়কের পাশে দেখা যায়, ইট ও টিনের দেয়াল তুলে নির্মাণ করা হয়েছে গেট। রাত হলেই শুরু হয় জমি ভরাটের কাজ।
নাগরী ইউনিয়নের গলান এলাকায়ও চলছে বিল ভরাটের কাজ। এতে একদিকে ফসলি জমির স্বাভাবিক চরিত্র বদলে যাচ্ছে, অন্যদিকে পানি অপসারণের পথও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কৃষিজমি ভরাটের ফলে প্রতিবছর আবাদি জমির পরিমাণ কমছে। আগে যেসব এলাকায় ধান, সবজি ও অন্যান্য ফসল উৎপাদন হতো, সেসব জমি ধীরে ধীরে বসতবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কিংবা বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের উপযোগী করে তোলা হচ্ছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, রাজধানীর পূর্বাচলঘেঁষা গাজীপুরের কালীগঞ্জে সাইনবোর্ড সর্বস্ব কিছু প্রতিষ্ঠান কৌশলে মাটি ভরাট করে কৃষিজমি নষ্ট করছে। আবার কিছু বৈধ কোম্পানি আইনের তোয়াক্কা না করে মাটি ভরাট করছে। বেআইনি ও অপরিকল্পিতভাবে জমি ভরাটের ফলে বর্ষা মৌসুমে পানি নিষ্কাশনের সমস্যা দেখা দিচ্ছে। খাল, নালা ও নিচু জমি ভরাট হয়ে গেলে বৃষ্টির পানি দ্রুত সরতে না পেরে জলাবদ্ধতা দেখা দিতে পারে।
সচেতন নাগরিকদের ভাষ্য, উন্নয়ন প্রয়োজন, কিন্তু উন্নয়নের নামে নির্বিচারে কৃষিজমি ভরাট কোনোভাবেই কাম্য নয়। পরিকল্পিত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের জন্য নির্ধারিত এলাকার বাইরে কৃষিজমি রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। কৃষিজমি ভরাটের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও পরিবেশগত বিষয়গুলো কঠোরভাবে অনুসরণ করা প্রয়োজন।
তাদের দাবি, উপজেলায় কোথায় কতটুকু কৃষিজমি ভরাট হচ্ছে, তার সঠিক তথ্য সংগ্রহ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষিজমি রক্ষায় প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারি বাড়ানো এবং আইন লঙ্ঘন করে ভরাটের অভিযোগ পাওয়া গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
নাগরী এলাকার একজন কৃষক সুবল চন্দ্র দাস বলেন, এখনই যদি কৃষিজমি রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে কালীগঞ্জের বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠ হারিয়ে যেতে পারে। কৃষিজমির জায়গা দখল করবে কংক্রিটের স্থাপনা—এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে শুধু কৃষি নয়, এলাকার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যও পড়বে হুমকিতে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) গাজীপুর মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক মো. ইসমাঈল হোসেন বলেন, প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণেই কৃষিজমি ভরাট হচ্ছে। আরো কঠোরভাবে আইনের প্রয়োগ করা উচিত।
গাজীপুরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে কাজ করা সংগঠন চেতনা গাজীপুরের সাধারণ সম্পাদক কবি মনোয়ার হোসেন বলেন, প্রকৃতির লীলাভূমি গাজীপুরের খাল বিল নদী নালা ও বন আমাদের অলংকার। এই সম্পদ ধ্বংসের জন্য কিছু অসাধু ব্যক্তি দায়ী। তারা কৃষিজমি ও খাল-বিল ভরাট করছে, যা গাজীপুরের জন্য হুমকি। অচিরেই জেলার ঐতিহ্য রক্ষায় সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
কালীগঞ্জে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ টি এম কামরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, কৃষিজমি ভরাটের খবর পেলেই ভ্রাম্যমাণ আদালত যাচ্ছে। কোনো বেআইনি কর্মকাণ্ড বরদাশত করা হবে না। সড়কের পাশে দেয়াল নির্মাণ করে ভেতরে বিল ভরাটের ছবি দেখে তিনি বলেন, ‘এটি অবৈধ। ব্যবস্থা নেওয়া হবে’।
কৃষি থেকে পাওয়া উল্লেখিত তথ্য প্রসঙ্গে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হাসিবুল হাসান বলেন, ‘কৃষিজমির এই পরিসংখ্যান আমি অফিসে যোগদান করার পর পেয়েছি, যা আপডেট ধরে নিয়ে কাজ করছি।’ কৃষিজমি ভরাট বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সরকারের অনুমতি ছাড়া কেউ কৃষিজমি ভরাট করলে আমরা ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে শাস্তি নিশ্চিত করি।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন