প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অভিবাসন নিয়ন্ত্রণকে আরো কঠোর করার লক্ষ্যে জনসমাগমস্থলে মুখ শনাক্তকারী ক্যামেরা ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে রেলস্টেশন, পরিবহনকেন্দ্র এবং বড় জনসমাগমের অনুষ্ঠানে অভিবাসন আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে খোঁজা ব্যক্তিদের শনাক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ভিসার মেয়াদ অতিক্রম করে দেশটিতে অবস্থানকারী এবং বৈধ অনুমতি ছাড়া প্রবেশকারী ব্যক্তিদেরও এই নজরদারির আওতায় আনার সম্ভাবনা রয়েছে।
সরকারি নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রযুক্তিটির ব্যবহার নির্দিষ্ট আইনগত উদ্দেশ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হবে। তথ্য সুরক্ষা এবং কর্মকর্তাদের মাধ্যমে সতর্কবার্তা যাচাই করার বিধানও এতে অন্তর্ভুক্ত। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা প্রথম প্রকাশিত হয় ৫ নভেম্বর ২০২৫। এরপর ২৮ জানুয়ারি, ১৯ ফেব্রুয়ারি, ১৪ এপ্রিল ও ১৫ জুলাই ২০২৬ তারিখে বিভিন্ন সংশোধন করা হয়। সর্বশেষ ৮ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে নীতিমালার হালনাগাদ সংস্করণ প্রকাশিত হয়। ২২ অক্টোবর প্রযুক্তির ব্যবহারসংক্রান্ত তথ্য সুরক্ষা মূল্যায়ন নথিও প্রকাশ করা হয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ব্রিটেনে বৈধ ভিসা নিয়ে বসবাসকারী বিদেশি নাগরিকদের জন্য এই পরিকল্পনা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন অপরাধ বা গ্রেপ্তারের বিধান তৈরি করছে না। তবে যাদের বিরুদ্ধে অভিবাসন আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে এবং যাদের আইনগতভাবে খোঁজা হচ্ছে, তাদের শনাক্ত করার ক্ষেত্রে প্রযুক্তিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
গত ৪ নভেম্বর ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান ও অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম লিবার্টি ইনভেস্টিগেটসও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাতে এমন তথ্য প্রকাশ করেছে। সরকারের নথিতে এ কর্মসূচিকে সাধারণ অভিবাসন আইন প্রয়োগের অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে শুধু অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তি কিংবা বহিষ্কারাদেশ থাকা ব্যক্তিদের নয়, বরং অভিবাসন আইনের শর্ত অমান্যকারী ব্যক্তিদেরও শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
নতুন পরিকল্পনায় যেসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে বহিষ্কারাদেশ রয়েছে, অভিবাসনসংক্রান্ত অপরাধে আদালতের পরোয়ানা রয়েছে কিংবা যাদের আইনগতভাবে আটক বা বহিষ্কারের জন্য খোঁজা হচ্ছে, তাদের মুখের ছবি নির্দিষ্ট তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। প্রবেশ বা অবস্থানের শর্ত অমান্যকারী এবং বৈধ অনুমতি ছাড়া যুক্তরাজ্যে পুনরায় প্রবেশের চেষ্টা করছেন—এমন ব্যক্তিদের শনাক্ত করার লক্ষ্যও রয়েছে। তবে ভিসার মেয়াদ শেষ হলেই প্রত্যেক ব্যক্তির মুখ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওই তালিকায় যুক্ত হবে, এমন সিদ্ধান্তের কথা সরকারি নথিতে বলা হয়নি।
প্রযুক্তিটি কিভাবে কাজ করবে: নির্দিষ্ট এলাকায় স্থাপিত ক্যামেরা মানুষের মুখের ছবি ধারণ করে আগে থেকে তৈরি শনাক্তকরণ তালিকার সঙ্গে তুলনা করবে। যদি কোনো ব্যক্তির মুখের সঙ্গে তালিকাভুক্ত কারো সম্ভাব্য মিল পাওয়া যায়, তবে একটি সতর্কবার্তা তৈরি হবে। এরপর প্রশিক্ষিত কর্মকর্তা সেই মিল যাচাই করবেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয় ও অভিবাসনসংক্রান্ত তথ্য পরীক্ষা করার পর আইনগত ভিত্তি থাকলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অর্থাৎ ক্যামেরা নিজে কাউকে গ্রেপ্তার বা বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেবে না।
পরীক্ষামূলক ব্যবহার শুরু
যুক্তরাজ্যের উত্তর ওয়েলসের হলিহেড বন্দরে ইতিমধ্যে এই প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক ব্যবহার হয়েছে। ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সেখানে তিনটি পরীক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। এসব পরীক্ষার উদ্দেশ্য ছিল আয়ারল্যান্ড থেকে যুক্তরাজ্যে প্রবেশকারী এমন ব্যক্তিদের শনাক্ত করা, যাদের বিরুদ্ধে বহিষ্কারাদেশ রয়েছে অথবা অভিবাসনসংক্রান্ত অপরাধে আদালতের পরোয়ানা আছে। পরবর্তী পর্যায়ে পরিবহনকেন্দ্র ও নির্দিষ্ট জনসমাগমপূর্ণ অনুষ্ঠানে প্রযুক্তিটির ব্যবহার সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তবে কোন শহর বা কোন স্থানে ক্যামেরা স্থাপন করা হবে, সে বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট তালিকা প্রকাশ করা হয়নি।
অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের এই উদ্যোগের পাশাপাশি দেশটির সরকার অভিযান, গ্রেপ্তার ও বহিষ্কারের সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনাও নিয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদের অধীনে অভিবাসন আইন প্রয়োগকারী বিভাগের বাজেট দ্বিগুণ এবং কর্মীসংখ্যা ৬০ শতাংশ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের যুক্তি, প্রযুক্তির সাহায্যে খোঁজ করা ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করা গেলে বাড়ি কিংবা কর্মস্থলে বারবার অভিযান চালানোর প্রয়োজন কমতে পারে। এতে সরকারি সম্পদের ব্যবহার আরো কার্যকর হবে এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বিঘ্ন কমবে। তবে সরকারের এই পরিকল্পনা নিয়ে মানবাধিকার ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষাকারী সংগঠনগুলোর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, জনসমাগমস্থলে মুখ শনাক্তকারী প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণের ফলে অভিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে। প্রযুক্তিটি সব জাতিগত গোষ্ঠীর মানুষের ক্ষেত্রে সমান নির্ভুল না-ও হতে পারে। ভুল শনাক্তকরণের কারণে নিরপরাধ ব্যক্তিরাও অপ্রয়োজনীয় যাচাই কিংবা আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তাদের মুখোমুখি হতে পারেন।
সব মিলিয়ে, যুক্তরাজ্যের অভিবাসন নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা আরো প্রযুক্তিনির্ভর ও কঠোর করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে এই উদ্যোগকে। তবে প্রযুক্তিটির নির্ভুলতা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং স্বাধীন তদারকি কতটা নিশ্চিত করা যায়, তা নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন