প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাখোঁ তাঁর ‘এক্স’পেজে জ্বালানির বর্তমান মূল্যকে ‘অসহনীয়’ বলে অভিহিত করেছেন। ১৮ সেপ্টেম্বর তিনি প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধি দের সাথে বৈঠক করেছেন, যেখানে জ্বালানি বাজারের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ১৭ সেপ্টেম্বরের হিসাব অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) পেট্রোলের গড় দাম প্রতি লিটারে ২.৬ ইউরো এবং ইউরোজোনে ২.১২ ইউরো ছিল।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সরকারগুলোর হাতে তিনটি মূল উপায় রয়েছে: জ্বালানির মূল্যের ওপর কর সাময়িকভাবে কমানো, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবার ও পরিবহন কোম্পানিগুলোকে লক্ষ্য করে বিশেষ সহায়তা প্রদান এবং ইউরোপীয় বাজারে জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানোর পদক্ষেপ নেওয়া। ‘ইনস্টিটিউট অফ ইউরোপ’-এর উপ-পরিচালক ভøাদিসøাভ বেলভ এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, ডিজেল ও পেট্রোলের অস্বাভাবিক উচ্চমূল্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করার ক্ষেত্রে একটি অতিরিক্ত কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
বেলভের মতে, ডিজেলের উচ্চমূল্য পণ্য পরিবহন, কৃষি, নির্মাণ এবং উৎপাদন খাতের বিভিন্ন অংশের খরচ বাড়িয়ে দেয়। পরবর্তীতে সরবরাহ শৃঙ্খলের মাধ্যমে সেই বাড়তি খরচ ভোক্তাপর্যায়ে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, যদি মধ্যমেয়াদে বর্তমান মূল্যস্তর বজায় থাকে, তবে অতিরিক্ত মুদ্রাস্ফীতির চাপ, প্রকৃত আয় ও ভোক্তা চাহিদার পতন এবং ইউরোপীয় উৎপাদকদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এমজিআইএমও-এর ‘ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি পলিসি অ্যান্ড সিকিউরিটি ইনস্টিটিউট’-এর উপ-পরিচালক আলেক জান্ডার ফ্রলভ উল্লেখ করেন যে, মূলত করের কারণেই মোটর জ্বালানির মূল্যের দিক থেকে ইউরোপীয় দেশগুলো বিশ্বে শীর্ষে রয়েছে। তিনি বলেন, ইউক্রেনে হামলার পর বিশ্ববাজারে রাশিয়ার জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি তা আরো জটিল করে তুলেছে। এর ফলে জ্বালানির দাম বেড়েছে এবং ইউরোপ ২০১০-এর দশকের শেষভাগ থেকে যে দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে, তা আরো তীব্র হয়েছে।
ফ্রলভ বলেন, রাশিয়ার সাথে ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিন্ন করা এবং ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ তাদের হাইড্রোকার্বন ব্যবহার পর্যায়ক্রমে বন্ধ করার কৌশলের ফলে জ্বালানি নিরাপত্তার সুরক্ষা বলয়টি আর নেই। বিকল্প বাজারগুলোতে বিকল্প উৎসের সন্ধান করা কেবল দামই বাড়িয়ে দিচ্ছে। তিনি আরো বলেন, ‘ইউরোপ তার আশপাশের অঞ্চলের যেকোনো অস্থিরতার দ্বারা প্রভাবিত হয়; আগে রাশিয়ার সরবরাহ এবং জ্বালানি সাশ্রয়ী পদক্ষেপের সমন্বয়ে সেই প্রভাব সামাল দেয়া সম্ভব হতো’।
‘ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি অ্যান্ড ফাইন্যান্স ফাউন্ডেশন’-এর গবেষণা পরিচালক আলেক্সি বেলোগোরিয়েভ জোর দিয়ে বলেন যে, বিশ্বের সব অঞ্চলেই জ্বালানির মূল্য সংকটের কারণগুলো অভিন্ন হলেও যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে একটি প্রধান কারণ হলো অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য রফতানি থেকে প্রাপ্ত অত্যধিক মুনাফা। এর ফলে অভ্যন্তরীণ বাজারের জন্য নির্ধারিত জ্বালানি রফতানির দিকে চলে যাচ্ছে।
তিনি উল্লেখ করেন, অন্যদিকে ইউরোপ হলো জ্বালানি আমদানিকারক অঞ্চল। অর্থাৎ পরিস্থিতি শুরুর দিক থেকেই এদের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। এ বিশেষজ্ঞ আরো বলেন, ইউরোপীয় দেশগুলো মূলত কয়েক দশক ধরে যাত্রীবাহী যানবাহনে ‘ডিজেল-নির্ভরতা’ (ডিজেলাইজেশন) বৃদ্ধি এবং রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি-সংক্রান্ত সম্পর্ক ছিন্ন করার পরিণাম ভোগ করছে। বেলোগোরিয়েভ জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ—উভয় অঞ্চলেই এ সংকট নিয়ে জনমনে একই ধরনের ধারণা থাকলেও ইউরোপীয় ভোক্তাদের ওপর এর অর্থনৈতিক প্রভাব অনেক বেশি তীব্র।
বাড়ছে মূল্যস্ফীতির চাপ
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ ও জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্নের প্রভাবে ইউরোপে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। ইউরোপীয় কমিশনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি সপ্তাহে ইউরোপীয় ইউনিয়নজুড়ে গাড়িতে জ্বালানি ভরার গড় খরচ দুই দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে।
১৭ সেপ্টেম্বরের হিসাব অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) পেট্রোলের গড় দাম ছিল প্রতি লিটারে ২.৬ ইউরো এবং ইউরোজোনে ২.১২ ইউরো। ২০০৫ সালে ইউরোপীয় কমিশনের বর্তমান ধারার তথ্য সংগ্রহ শুরুর পর এটিই উভয় জ্বালানির সর্বোচ্চ গড় মূল্য। ৫০ লিটারের একটি ট্যাংক পেট্রোলে ভরতে গড়ে প্রায় ১০৩ ইউরো এবং ডিজেলে প্রায় ১০৮ ইউরো খরচ হচ্ছে।
দাম বৃদ্ধির পেছনে মূল কারণ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক তেল সরবরাহে বিঘ্ন, পরিবহন ঝুঁকি এবং পরিশোধন ব্যয় বৃদ্ধিকে উল্লেখ করা হচ্ছে। অপরিশোধিত তেলের দাম কমলেও তা সরাসরি পাম্পের দামে প্রতিফলিত হচ্ছে না। কারণ অপরিশোধিত তেল থেকে পেট্রোল-ডিজেল তৈরির রিফাইনিং মার্জিনও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ইউরোপীয় সেন্ট্রাল ব্যাংকের বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ডিজেলের রিফাইনিং মার্জিন অক্টোবর পর্যন্ত আরো বাড়তে পারে।
দেশভেদে পরিস্থিতির পার্থক্যও স্পষ্ট। ১৪ সেপ্টেম্বর পেট্রোলের দাম মাল্টায় সবচেয়ে কম—প্রতি লিটার ১.৩৪ ইউরো। বিপরীতে ডেনমার্কে তা ২.৫৬ ইউরোতে পৌঁছেছে। ডিজেলের দাম মাল্টায় ১.২১ ইউরো, আর ফিনল্যান্ডে ২.৫১ ইউরো।
ফ্রান্সেও জ্বালানির দাম নতুন রেকর্ড করেছে। রোববার দেশটিতে ডিজেলের গড় দাম প্রতি লিটার ২.৪১ ইউরোতে ওঠে। একই দিন সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত আনলেড-৯৫ পেট্রোলের দাম ২.১৭ ইউরোর ওপরে ছিল। নেদারল্যান্ডসেও পেট্রোলের দাম রেকর্ড উচ্চতায় উঠেছে। ১৭ সেপ্টেম্বর দেশটিতে বড় তেল কোম্পানিগুলোর প্রস্তাবিত গড় পেট্রোলের দাম প্রতি লিটারে ২.৭২৬ ইউরোতে পৌঁছে। ডিজেলের দামও ২.৭৭৭ ইউরোতে ওঠে।
এদিকে শুধু সড়ক পরিবহন নয়, বিমান চলাচলের জ্বালানি নিয়েও ইউরোপে উদ্বেগ বাড়ছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ বছরের চতুর্থ প্রান্তিকে ইউরোপে জেট ফুয়েলের ঘাটতি দৈনিক প্রায় ৫ লাখ ১০ হাজার ব্যারেল হতে পারে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে উদ্বৃত্ত সরবরাহের পূর্বাভাস রয়েছে।
ঘাটতি মোকাবিলায় ইউরোপ নাইজেরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাসহ দূরবর্তী উৎস থেকে জেট ফুয়েল আমদানি বাড়িয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়াও বড় সরবরাহকারী হিসেবে উঠে এসেছে। সেপ্টেম্বরে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ইউরোপে জেট ফুয়েল আমদানি দৈনিক প্রায় ১ লাখ ২৯ হাজার ব্যারেলে পৌঁছেছে, যা ২০২২ সালের অক্টোবরের পর সর্বোচ্চ।
জ্বালানির এ মূল্যবৃদ্ধি ইউরোপের মূল্যস্ফীতির ওপরও চাপ বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে পরিবহন, কৃষি, শিল্প উৎপাদন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পরিবহন ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইউরোপের কয়েকটি দেশে ইতোমধ্যে জ্বালানি ব্যয় কমাতে সরকারি সহায়তা ও করনীতি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। সূত্র: ইউরোপীয় কমিশন, ভেদোমোস্তি, রয়টার্স, এএফপি।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন