প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
কবি, অনুবাদক ও সাংবাদিক রথো রাফি মারা গেছেন। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) রাত ৮টার দিকে রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। মৃত্যুর সময় তার বয়স ছিল ৫১ বছর।
এহতেশাম, তার ভাই, মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করেছেন।
রথো রাফি গত সোমবার থেকে হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ফুসফুস ও কিডনির জটিলতায় ভুগছিলেন।
বাংলা কবিতায় রথো রাফি ছিলেন এক স্বতন্ত্র কণ্ঠ—নিরাভরণ, মিতভাষী অথচ নিজস্ব কাব্যভাষা নির্মাণে সচেষ্ট। কবিতা ও অনুবাদে তিনি গড়ে তুলেছিলেন আলাদা এক জগৎ। তার অকাল প্রয়াণে বাংলা সাহিত্য হারাল এমন এক কবিকে, যিনি দীর্ঘ সময় বই প্রকাশের আড়ালে থেকেও সমকালীন কবিতার পরিসরে নিজের অবস্থান তৈরি করেছিলেন। তিনি রেখে গেছেন একমাত্র কাব্যগ্রন্থ অক্ষর ও বালির পৃথিবী, বিশ্বসাহিত্যের বিভিন্ন কবির কবিতার অনুবাদ এবং তার নিবিড় পাঠকসমাজ।
১৯৭৫ সালের ৩১ মার্চ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলায় রথো রাফির জন্ম হয়। পেশায় সাংবাদিক হলেও তার প্রধান পরিচয় ছিল কবি হিসেবে। রসায়নশাস্ত্রে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিলেও কবিতা এবং বিশ্বসাহিত্যের অনুবাদ তার মনন ও সৃজনশীলতার বড় অংশজুড়ে ছিল। নব্বইয়ের দশকে কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর তিনি দীর্ঘ সময় ছোটকাগজ আন্দোলন ও প্রতিষ্ঠানবিরোধী সাহিত্যিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি প্রতিষ্ঠানবিরোধী ছোটকাগজ গাণ্ডীব-এর নিয়মিত লেখক ছিলেন। সাময়িকীটির ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু সময়েও সেই সম্পর্ক অটুট ছিল।
রথো রাফির সাহিত্যিক জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল বই প্রকাশে অনীহা। দীর্ঘ সময় কোনো কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ না করেও তিনি সমকালীন কবিতায় নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান গড়ে তোলেন। অবশেষে ২০২০ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত হয় তার প্রথম ও একমাত্র কাব্যগ্রন্থ অক্ষর ও বালির পৃথিবী। ৪৩২ পৃষ্ঠার বইটিতে সংকলিত হয়েছে দুই শতাধিক কবিতা, যেগুলো তিনি ১৯৯৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত দুই দশকে লিখেছিলেন।
তার কবিতার বিষয়বৈচিত্র্যও ছিল বিস্তৃত। মানুষের জন্ম ও মৃত্যুর দর্শন থেকে শুরু করে কৃষ্ণের বাঁশি কিংবা যিশুর ক্রুশযাত্রা—বিভিন্ন ধর্মীয়, দার্শনিক ও সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ তার কবিতায় উঠে এসেছে নিজস্ব ভাষা ও বোধের মধ্য দিয়ে। প্রচলিত আবেগের প্রকাশের বাইরে গিয়ে কবিতায় চিন্তার গভীরতা নির্মাণের চেষ্টা ছিল তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
কবিতার পাশাপাশি অনুবাদক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন রথো রাফি। তিনি এরিখ ফ্রাইড, চার্লস বুকোস্কি, মুহাম্মদ আল-মাঘুত ও ইয়ারোস্লাভ সাইফার্টের মতো আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত কবিদের কবিতা বাংলায় অনুবাদ করেছেন। মূল কবিতার আবেগ, ভাবনা ও দার্শনিক অনুষঙ্গ বাংলা ভাষায় তুলে ধরার ক্ষেত্রে তার অনুবাদে ছিল নিজস্বতা। এসব কাজের মাধ্যমে বাংলা ভাষার পাঠকদের কাছে বিশ্বকবিতার বিভিন্ন ধারা ও কণ্ঠ পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি।
রথো রাফির কবিতাভাবনার কেন্দ্রে ছিল বৌদ্ধিক অন্বেষণ। তার বিশ্বাস ছিল, কবিতায় কেবল আবেগতাড়িত সাড়া নয়, বুদ্ধিবৃত্তিক অর্জনও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই দৃষ্টিভঙ্গি, নিজস্ব ভাষাভঙ্গি এবং প্রকাশনার প্রতি অনীহা তাকে সমকালীন কবিদের ভিড়ে আলাদা করে রেখেছিল। তার মৃত্যুতে বাংলা কবিতার এমন এক স্বর থেমে গেল, যার পরিচয় গড়ে উঠেছিল প্রচারের চেয়ে সৃষ্টির গভীরতায়।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন