প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বরগুনা জেলা পরিষদের ডাকবাংলোয় মা ও তাঁর দুই শিশুকন্যার রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশ চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে। তদন্তকারী সংস্থা চার লাখ টাকার বেশি ঋণ, সংসারের আর্থিক অনটন ও কিস্তি পরিশোধের দুশ্চিন্তাকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছে। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, ইতি রানী বিশ্বাস (৩৪) প্রথমে তাঁর দুই মেয়েকে হত্যা করেন এবং পরে নিজে আত্মহত্যা করেন। তবে মামলার বাদী স্বামী দুলাল চন্দ্র বিশ্বাসের দাবি, তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তানকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। এই কারণে তিনটি মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশের তদন্তের ফলাফল ও পরিবারের দাবির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠেছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বিকেল পাঁচটার দিকে সংবাদ সম্মেলনে বরগুনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মুকিত হাসান খান তদন্তের বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরেন। পুলিশ জানায়, মামলার আলামত, সাক্ষ্যপ্রমাণ, ডাকবাংলোর সিসিটিভি ফুটেজ এবং ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। শিগগিরই আদালতে মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে বলেও জানান তিনি।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ৩ মার্চ বরগুনা জেলা পরিষদের ডাকবাংলোর তৃতীয় তলার দুটি কক্ষ থেকে ইতি রানী ও তাঁর দুই মেয়ে আরাধ্যা বিশ্বাস (১২) এবং অনুরাধা বিশ্বাসের (৩) মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ইতি রানী বরগুনা পৌরসভার কালীবাড়ি এলাকার বাসিন্দা এবং ডাকবাংলোর পরিচ্ছন্নতাকর্মী ছিলেন। ঘটনার দিন সকালে তিনি দুই মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে কর্মস্থলে যান। পরে সেখানকার দুটি কক্ষ থেকে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় ইতি রানীর স্বামী দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে বরগুনা সদর থানায় হত্যা মামলা করেন।
তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে ডাকবাংলোর সিসিটিভি ফুটেজ সামনে এসেছে। পুলিশ জানায়, ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ঘটনার দিন সকাল আনুমানিক ১০টা ৪৫ মিনিটে ইতি রানী দুই মেয়েকে নিয়ে ডাকবাংলোয় প্রবেশ করেন। এরপর তাঁরা তৃতীয় তলায় যান। সকাল ১০টা ৫০ মিনিট ৪৭ সেকেন্ডে বড় মেয়ে আরাধ্যাকে তিন নম্বর কক্ষে প্রবেশ করতে দেখা যায়। কিছুক্ষণ পর ছোট মেয়ে অনুরাধাকে চার নম্বর কক্ষে রেখে ইতি রানী তিন নম্বর কক্ষে প্রবেশ করেন।
ফুটেজ অনুযায়ী, প্রায় ২২ মিনিট পর সকাল ১১টা ১৩ মিনিট ২৩ সেকেন্ডে ইতি রানী তিন নম্বর কক্ষ থেকে বের হন। তিন সেকেন্ড পর, সকাল ১১টা ১৩ মিনিট ২৬ সেকেন্ডে তাঁকে চার নম্বর কক্ষে প্রবেশ করতে দেখা যায়। এরপর ওই কক্ষগুলো থেকে তাঁদের কাউকে জীবিত অবস্থায় বের হতে দেখা যায়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এই সময়ের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করে তদন্তকারীদের ধারণা, ইতি রানী কোমল পানীয় অথবা খাবার পানির সঙ্গে চেতনানাশক ওষুধ মিশিয়ে দুই মেয়েকে পান করিয়ে থাকতে পারেন। এরপর শ্বাসরোধে তাদের হত্যা করে নিজেও চেতনানাশক ওষুধ সেবন করে আত্মহত্যা করে থাকতে পারেন বলে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে প্রতীয়মান হয়েছে।
ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইতি রানীর মৃত্যু হয়েছে বেঞ্জোডায়াজেপিন-জাতীয় রাসায়নিকের বিষক্রিয়ায় এবং চিকিৎসকদের মতে, তা আত্মহত্যাজনিত। অন্যদিকে, দুই শিশু আরাধ্যা ও অনুরাধার মৃত্যুর ক্ষেত্রে একই ধরনের রাসায়নিকের বিষক্রিয়ার পাশাপাশি আঘাতজনিত শ্বাসরোধের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। চিকিৎসকদের মতামতে তাদের মৃত্যু হত্যাজনিত বলে উল্লেখ রয়েছে। তিনজনের কারও ক্ষেত্রে ধর্ষণের আলামত পাওয়া যায়নি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্তে উঠে আসা আর্থিক হিসাব বলছে, পরিবারটির মোট ঋণের পরিমাণ ছিল চার লাখ সাত হাজার ৭২৩ টাকা। পুলিশের তথ্যমতে, ইতি রানী পাঁচটি এনজিও থেকে মোট দুই লাখ ২৭ হাজার ৭২৩ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। তাঁর স্বামী দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস একটি এনজিও থেকে নিয়েছিলেন ৮০ হাজার টাকা। এ ছাড়া অনিল রায় ও বাবুল রায়ের কাছ থেকে ধার নেওয়া হয়েছিল এক লাখ টাকা। সব মিলিয়ে ঋণের অঙ্ক দাঁড়ায় চার লাখ সাত হাজার ৭২৩ টাকা।
পুলিশের তদন্তে আরও উঠে এসেছে, দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস সুপারি ব্যবসার পাশাপাশি দর্জির কাজ করতেন। তাঁর ছোট টেইলারিং দোকান ও সীমিত পরিসরের সুপারি ব্যবসা থেকে পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। প্রায় ৩০ বছর আগে নদীভাঙনে তাঁদের পুরোনো বসতভিটা বিলীন হয়ে যায়। এরপর থেকে তাঁরা সরকারি জায়গায় বসবাস করছিলেন বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংসারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি এবং স্বামীকে সহযোগিতা করার উদ্দেশ্যে মৃত্যুর প্রায় দুই মাস আগে মাসিক তিন হাজার টাকা বেতনে জেলা পরিষদের ডাকবাংলোয় পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে যোগ দেন ইতি রানী। কিন্তু ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ ও সংসারের অনটন নিয়ে তিনি মানসিক দুশ্চিন্তায় ভুগছিলেন বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা গেছে। পুলিশের ধারণা, এই আর্থিক সংকট তাঁর হতাশার অন্যতম কারণ হয়ে থাকতে পারে।
তবে পুলিশের এই ব্যাখ্যা মেনে নিতে নারাজ মামলার বাদী দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস। তাঁর দাবি, ঋণের কারণে ইতি রানী দুই সন্তানকে হত্যা করে আত্মহত্যা করবেন, এমন ঘটনা তিনি বিশ্বাস করেন না। তাঁর অভিযোগ, স্ত্রী ও দুই সন্তানকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। তিনি বলেন, 'ময়নাতদন্তের রিপোর্ট আমরা এখনো হাতে পাইনি। তাতে কী লেখা এসেছে, তাও জানি না। ঋণের কারণে আমার স্ত্রী দুই সন্তানকে মেরে ফেলবে, তা হতে পারে না। আমার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু ও ন্যায়বিচার চাই।'
ঘটনার পর থেকেই স্থানীয়দের মধ্যে এ নিয়ে নানা প্রশ্ন ও ক্ষোভ তৈরি হয়। পরিবার ও স্থানীয়দের একাংশ শুরু থেকেই ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে দেখার পরিবর্তে হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ তুলে সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানান। এ দাবিতে মরদেহ নিয়ে বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধের ঘটনাও ঘটে। ফলে তদন্তের ফলাফল প্রকাশের পরও পরিবারের অভিযোগ এবং ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা নিয়ে জনমনে আগ্রহ রয়ে গেছে।
একটি পরিবারের তিন সদস্যের মৃত্যু, চার লাখ টাকার বেশি ঋণের হিসাব, সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়া কয়েক মিনিটের ঘটনাপ্রবাহ এবং ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন- সব মিলিয়ে মামলাটি পেয়েছে নতুন মাত্রা। পুলিশের তদন্তে যে চিত্র উঠে এসেছে, তাতে ঋণের চাপকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, বাদীর অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে পরিকল্পিত হত্যার আশঙ্কা। এখন আদালতে দাখিল হতে যাওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদন এবং পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়ায় মামলার অভিযোগ, আলামত ও সাক্ষ্যপ্রমাণ কীভাবে মূল্যায়িত হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে এই রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় আইনি সিদ্ধান্ত।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন