প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
জীবন সব সময় একরকম চলে না। কখনো সচ্ছলতা আসে, আবার কখনো অভাব-অনটন মানুষকে ঘিরে ধরে। কখনো ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা সম্ভাবনা থাকে, আবার কখনো অনিশ্চয়তা ও দুশ্চিন্তা মানুষের ভেতর থেকে দুর্বল করে দেয়। কারো জীবনে কর্মহীনতা, কারো জীবনে ঋণের বোঝা, আবার কারো জীবনে সংসারের ব্যয়ভার বহন করতে না পারার কষ্ট। আবার কিছু মানুষের জীবনে সব কিছু থাকলেও যেন কিছুই নেই।
এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই হতাশ হয়ে পড়ে। কেউ কেউ নিজের ভাগ্যকে দোষারোপ করে, এমনকি আল্লাহর রহমত সম্পর্কেও নিরাশ হয়ে যায়। কিন্তু একজন মুমিনের দৃষ্টিভঙ্গি এমন হওয়া উচিত নয়। কারণ পবিত্র কোরআন ও হাদিস নিয়ে গবেষণা করলে মুমিন জানতে পারে, জীবনে সচ্ছলতা আল্লাহর নিয়ামত ও পরীক্ষা, তেমনি অভাব-অনটন ও অনিশ্চয়তাও এক ধরনের পরীক্ষা।
এই পরীক্ষার কথা মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘আর আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং জান-মাল ও ফলফলাদির স্বল্পতার মাধ্যমে। আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও। (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৫৫)
এ আয়াতে মহান আল্লাহ অভাব-অনটন, ক্ষুধা, সম্পদহানি ও ভয়কে পরীক্ষার উপকরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ কারো জীবনে সাময়িক আর্থিক সংকট কিংবা অনিশ্চয়তা দেখা দিলে মনে করা যাবে না যে আল্লাহ তাকে ছেড়ে দিয়েছেন কিংবা তার প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছেন। বরং এগুলো আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা।
এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য বান্দার উচিত, তার ঈমান, ধৈর্য, আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা এবং নৈতিক অবস্থান অটুট রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা। কারণ এই পরীক্ষার ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে মহান আল্লাহ তাতে কৃতকার্য হওয়ার পথও বাতলে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও।’
অতএব, নিজে এ রকম পরিস্থিতিতে পড়লে অবশ্যই ধৈর্য ধরতে হবে এবং মহান আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে তা থেকে উত্তরণের চেষ্টা করতে হবে। আর অন্য কেউ এ রকম পরিস্থিতিতে পড়লে তাকে আল্লাহর অপ্রিয় বান্দা বলে তিরস্কার করা যাবে না। মানুষের সব বিপদকে নির্দিষ্টভাবে আল্লাহর শাস্তি বলে অভিহিত করার সুযোগ নেই। কোন বিপদ আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা, কোনটি মানুষের ভুলের পরিণতি, আবার কোনটি দুনিয়ার স্বাভাবিক কার্যকারণের অংশ—তা একমাত্র আল্লাহই ভালো জানেন।
তাহলে এসব পরিস্থিতিতে আল্লাহর ওপর ভরসার পাশাপাশি তাকওয়া অবলম্বন করতে হবে। তাকওয়াবিরোধী কোনো কাজে জড়ানো যাবে না। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন এবং তিনি তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দেবেন যা সে কল্পনাও করতে পারবে না। আর যে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট।’ (সুরা : তালাক, আয়াত : ২-৩)
এ আয়াত মুমিনকে আশার আলো দেখায়। মানুষের চোখে যখন সব পথ বন্ধ মনে হয়, তখনও আল্লাহর সাহায্যের পথ বন্ধ হয়ে যায় না। তিনি এমন উৎস থেকেও রিজিকের ব্যবস্থা করতে পারেন, যা মানুষের কল্পনার বাইরে। তাই সংকটের মুহূর্তেও মুমিনের উচিত, হতাশ না হয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে অবিচল থাকা, হারাম থেকে বেঁচে থাকা। কারণ এগুলো রিজিকে বরকত ও সংকট থেকে উত্তরণের গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘যারা তাদের ওপর বিপদ এলে বলে, আমরা তো আল্লাহরই। আর নিশ্চয় আমরা তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তনকারী। তাদের ওপরই রয়েছে তাদের রবের পক্ষ থেকে মাগফিরাত ও রহমত এবং তারাই হেদায়েতপ্রাপ্ত।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৫৬-১৫৭)
অর্থাৎ বিপদে পড়ে যে ব্যক্তি নিজের অসহায়ত্ব উপলব্ধি করে আল্লাহর কাছে ফিরে যায়, ধৈর্য ধারণ করে এবং তাঁর কাছেই সাহায্য চায়, সে আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহের আশা করতে পারে। মুমিনের জীবনদর্শন এমন হওয়া উচিত যে তার সচ্ছলতা এলে অহংকার না করে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করবে। আবার অভাব এলে হতাশ না হয়ে ধৈর্য ধারণ করবে। এভাবে মুমিন জীবনের প্রতিটি পরিস্থিতিই আখিরাতের পুঁজি হিসেবে গণ্য হতে থাকে।
হাদিস শরিফে এসেছে, সুহায়ব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মুমিনের অবস্থা বিস্ময়কর। সব কাজই তার জন্য কল্যাণকর। মুমিন ছাড়া অন্য কেউ এ বৈশিষ্ট্য লাভ করতে পারে না। তারা সুখ-শান্তি লাভ করলে শুকরগুজার করে আর অসচ্ছলতা বা দুঃখ-মুসিবতে আক্রান্ত হলে সবর করে, প্রতিটিই তার জন্য কল্যাণকর।’ (মুসলিম, হাদিস : ৭৩৯০)
অতএব, আমাদের উচিত, জীবনের প্রতিটি পরিস্থিতিকে আখিরাতের কল্যাণের মাধ্যম বানাতে সচেষ্ট হওয়া। অভাব-অনটন ও অনিশ্চয়তা মুমিনের জীবনের শেষ কথা নয়; বরং এসব পরিস্থিতি তার ঈমান, ধৈর্য এবং আল্লাহর ওপর নির্ভরতার পরিচয় দেওয়ার সুযোগ। মহান আল্লাহ সবাইকে অভাব-অনটন ও অনিশ্চয়তা থেকে হেফাজত করুন। আমিন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন