প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
শরীয়তপুরের জাজিরায় নদীর তীর রক্ষায় নির্মীয়মাণ বাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছে। বৃহস্পতিবার তোলা এই ছবিতে দেখা যাচ্ছে ভাঙনের ক্ষতি। পদ্মায় পানি ও স্রোত বেড়ে যাওয়ার কারণে শরীয়তপুরের জাজিরায় নদীর তীর রক্ষা বাঁধের তিনটি জায়গায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। গত সাত দিনের মধ্যে বাঁধের প্রায় ২০০ মিটার অংশ নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ইতোমধ্যে ২৫টি পরিবার তাদের বসবাসের ঘর সরিয়ে নিয়েছে। ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে আরো প্রায় ৩০০ পরিবারের বসতবাড়ি। এতে নদীতীরে বসবাস করা মানুষদের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
শরীয়তপুরের পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবোর) তথ্য অনুযায়ী, পদ্মা সেতুর নাওডোবা থেকে জাজিরা ইউনিয়নের পাথালিয়াকান্দি পর্যন্ত নদীর দক্ষিণ তীরে মোট ১০ দশমিক ৬৭ কিলোমিটার তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে।
৩৯টি প্যাকেজে নেওয়া প্রকল্পটির আনুমানিক ব্যয় এক হাজার ১৩০ কোটি টাকা। এর আগে, ২০২৪ সালের মার্চে পূর্ব নাওডোবা ইউনিয়নের জিরো পয়েন্ট থেকে পাথালিয়াকান্দি পর্যন্ত ৮ দশমিক ৬৭ কিলোমিটার অংশে বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে পদ্মা সেতু প্রকল্পের তীর রক্ষা বাঁধের একটি অংশে ভাঙন দেখা দেওয়ার পর, প্রকল্পের আওতায় আরো দুই কিলোমিটার এলাকা যুক্ত করা হয়।
সূত্র জানায়, ভাঙনের ফলে পালেরচর ইউনিয়নের কাথুরিয়া ও ফরাজীকান্দি এবং নাওডোবা ইউনিয়নের পৈলান মোল্যারকান্দি ও আলম খারকান্দি এলাকার ক্ষতি ঘটেছে।
নদীতে চলে গেছে সাতটি দোকান। পাশাপশি কাথুরিয়া-মাঝিরঘাট সড়কের প্রায় ৫০ মিটার অংশও বিলীন হয়ে গেছে। পরিস্থিতি দেখতে পাউবোর তিন কর্মকর্তা কাথুরিয়া এলাকায় পরিদর্শন করেছেন।
পাউবো কর্মকর্তাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, হঠাৎ করে ভাঙন তীব্র হয়েছে এবং বাঁধের সংলগ্ন প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকা ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। ওই কর্মকর্তারা জানান, ভাঙন ঠেকাতে সেখানে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলার কাজ চলছে।
তীররক্ষা প্রকল্পের প্রায় পাঁচ কিলোমিটার অংশের ৬০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। অবশিষ্ট ৫ দশমিক ৬৭ কিলোমিটার এলাকায় নদীর অংশে বালুভর্তি জিও ব্যাগ স্থাপনের কাজ চলছিল। বর্ষা মৌসুমের কারণে বর্তমানে নদীতে সেই কাজ বন্ধ রয়েছে। তবে প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় ব্লক তৈরির কাজ এখনও অব্যাহত রয়েছে।
স্থানীয়রা বলছেন, নদীভাঙন বাড়তে থাকায় অনেকেই আগেভাগেই ঘরবাড়ি ও দোকানের মালামাল সরিয়ে নিচ্ছে। কেউ কেউ তাদের বসতভিটার গাছপালাও কেটে অন্যত্র নিয়ে যাচ্ছে। কাথুরিয়া এলাকার বিদ্যুতের তিনটি খুঁটি তারসহ নদীতে পড়ে গেছে, যার ফলে ওই এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহও বন্ধ হয়ে গেছে। এ ছাড়া ভাঙনের কারণে কাথুরিয়া-মাঝিরঘাট সড়কে যান চলাচলও ব্যাহত হয়েছে।
এদিকে, গত সোমবার ও মঙ্গলবার কাথুরিয়া-মাঝিরঘাট সড়কের প্রায় ৫০ মিটার অংশ নদীতে চলে গেছে। এর ফলে সড়কটিতে অটোরিকশা, ভ্যান ও মোটরসাইকেল চলাচল বন্ধ হয়ে গিয়েছে।
ভাঙনের শিকার স্থানীয় পেয়ারি বেগম (৬০) জানাচ্ছেন, তিনি চার দশকে ছয়বার নদীভাঙনের শিকার হয়েছেন। অনেক কষ্টে কেনা ১০ কাঠা জমিও এবার পদ্মায় চলে গেছে। গত রবিবার সকাল থেকে ভাঙন শুরু হলে তার চোখের সামনেই সমস্ত কিছু হারাতে হয়েছে।
পেয়ারি বেগমের অভিযোগ হচ্ছে, স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ না করে বারবার বালুর বস্তা ফেলে অস্থায়ীভাবে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। বর্তমানে অন্যের জায়গায় আশ্রয় নিয়ে ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
ওই এলাকার ভ্যানচালক ইস্কান্দার মোল্লা (৪৮) জানান, ভাঙনের খবর পেয়ে দ্রুত বাড়িতে ফিরে স্ত্রী ও পাঁচ মেয়েকে নিয়ে ঘরবাড়ির মালামাল সরিয়ে নিচ্ছেন। তার প্রায় আট কাঠা জমি ভাঙনের মুখে পড়েছে। তার ভাষ্য, ‘স্থায়ী বেড়িবাঁধ থাকলে হয়তো আজ বসতভিটা হারানোর পরিস্থিতিতে পড়তে হতো না। এখন কীভাবে যে দিন কাটছে আমরাই জানি।’
এ ব্যাপারে পাউবোর শরীয়তপুর কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী খান মোহাম্মদ ওয়ালিউজ্জামান বলেছেন, গত বছর প্রকল্পের কয়েকটি এলাকায় ভাঙন দেখা দেওয়ার পর সেসব অংশের নকশায় পরিবর্তন আনা হয়েছিল। নকশা অনুমোদনের পর বর্ষার আগেই সেখানে কাজও শুরু করা হয়েছিল।
নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, এবার পদ্মায় পানি ও স্রোত বেড়ে যাওয়ায় নির্মীয়মাণ বাঁধের কিছু অংশে নতুন করে ভাঙন দেখা দিয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে ভাঙনপ্রবণ অংশে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন