প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
লাইফস্টাইলের হাতে লরেন্স বিষ্ণোইয়ের জীবন নিয়ে সিনেমা নির্মাণ করা হবে, এমনটাই মনে করছেন অনেকে। চিত্রনাট্যকারকে বিশেষ পরিশ্রম করতে হবে না। কারণ, শুধু লরেন্স বিষ্ণোইয়ের জীবনকথা অনুসরণ করলেই চলবে, আলাদা কিছু করার প্রয়োজন নেই। তার জীবন সিনেমার গল্পের মতো না হলেও, কখনো কখনো সিনেমার চেয়েও উত্তেজনাপূর্ণ। তবে অন্যান্য অপরাধীদের মতো লরেন্স বিষ্ণোইয়ের অপরাধী হওয়ার পেছনে দারিদ্র্য বা প্রতিশোধের কোনও কাহিনী নেই। তিনি কিছু হতে চাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, অপরাধ জগতের ‘গ্ল্যামার’ তাকে অন্ধকার জগতে টেনে এনেছে।
পাঞ্জাবের ফিরোজপুর জেলার একটি গ্রামে জন্ম নেওয়া লরেন্স ছাত্রজীবনেই অপরাধ চক্রের সঙ্গে যুক্ত হন। ধীরে ধীরে পাঞ্জাব থেকে তিনি ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে তার অপরাধ সাম্রাজ্য বিস্তৃত করতে থাকেন। শুধু ভারত নয়, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইউরোপেও লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের বিশাল নেটওয়ার্ক রয়েছে। মাত্র ৩৩ বছর বয়সেই তিনি আন্তর্জাতিক গ্যাংস্টার হিসেবে পরিচিত।
লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের কানাডায় নেতৃত্ব দেন তার ছাত্রজীবনের সঙ্গী গোল্ডি ব্রার, এবং ইউরোপে নেতৃত্বের দায়িত্বে রয়েছেন রোহিত গোদারার।
অতিশীঘ্র বলা যায়, লরেন্স ২০১৫ সাল থেকেই বন্দি জীবনযাপন করছেন, তার হলফনামা অনুযায়ী তিনি কারাগারে বসেই আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্রের নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। তার বিরুদ্ধে হত্যা ও মাদক চোরাচালানের ৩০টির বেশি মামলা বর্তমানে বিচারাধীন।
লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে সারা বিশ্বে বিভিন্ন দেশের যৌথ অভিযানে এখনও লরেন্স বিষ্ণোইকে নিয়ে আলোচনা চলছে। এই অভিযানের নাম ‘অপারেশন হার্ড বল’। এই অভিযানে ৫০টির অধিক স্থানে একযোগে অভিযান পরিচালনা করে অন্তত ২৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক এই অভিযানে এক হাজার কেজির বেশি কোকেন ও হেরোইন এবং প্রচুর পরিমাণ নগদ অর্থ সহ ১২টি অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র জব্দ করা হয়েছে।
বলিউডের সুপারস্টার সালমান খানকে হত্যার হুমকি দিয়ে লরেন্স বিষ্ণোই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মিডিয়ার আলোচনায় আসেন। ১৯৯৮ সালে রাজস্থানের যোধপুরে তাঁর ‘হাম সাথ সাথ হ্যায়’ সিনেমার শুটিং চলাকালীন সালমান খানকে বিরুদ্ধে ‘কৃষ্ণসার হরিণ’ শিকারের অভিযোগ ওঠে। বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের মানুষ প্রকৃতি এবং বন্যপ্রাণী রক্ষাকে তাদের ধর্মীয় কর্তব্য মনে করেন। কৃষ্ণসার হরিণকে তারা পবিত্র জ্ঞান করে এবং তাদের ধ্যানে গুরু জাম্বেশ্বরের পুনর্জন্ম হিসেবে চিনে থাকেন। তাই হরিণ হত্যার ঘটনা পুরো বিষ্ণোই সম্প্রদায়কে গভীরভাবে ক্ষিগ্ন করে। ২০১৮ সালে যোধপুর আদালত সালমান খানকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দিলেও পরে তিনি জামিনে মুক্ত হতে সক্ষম হন। ঘটনা যখন ঘটে, লরেন্স তখন শিশু ছিলেন, কিন্তু ঘটনাটি তাঁর মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। ২০১৮ সালের যোধপুর আদালতের হাজিরায় তিনি প্রথমবার ঘোষিত করেন, ‘আমরা যোধপুরেই সালমান খানকে হত্যা করব। তখন তিনিই বুঝবেন আমরা আসলে কে।’
কিন্তু লরেন্স হুমকির সঙ্গেই থেমে থাকেননি। এরপর ধারাবাহিকভাবে তাকে প্রাণনাশের উদ্দেশ্যে হুমকি দিতে থাকেন। ২০২২ সালে সালমানের বাবা সেলিম খান প্রাতঃভ্রমণ করেন যখন একটি চিরকুট পান যাতে বাবা এবং ছেলে উভয়কেই হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। ২০২৩ সালেও গোল্ডি ব্রারের পক্ষ থেকে সালমানকে একটি হুমকিযুক্ত ইমেইল পাঠানো হয়। ২০২৪ সালের ১৪ এপ্রিল ভোরের দিকে মুম্বাইয়ের বান্দ্রা এলাকায় সালমানের বিলাসবহুল ‘গ্যালাক্সি অ্যাপার্টমেন্ট’-এর বাইরের দিকে মোটরবাইক চড়ে আসা দুজন শ্যুটার ভবনের দেয়াল ও সালমানের বারান্দায় অন্তত ৫ রাউন্ড গুলি ছুঁড়ে দেয়। ঘটনার সময় সালমান খান এবং তার পরিবারের সদস্যরা ঘরেই ঘুমাচ্ছিলেন, তবে সৌভাগ্যবশত কেউ আহত হননি। হামলার কয়েক ঘণ্টা পরেই লরেন্স বিষ্ণোইয়ের ভাই আনমোল বিষ্ণোই ফেসবুকে ওই হামলার দায় স্বীকার করে এটিকে সালমানের জন্য ‘শেষ সতর্কতা’ হিসেবে অভিহিত করেন। পরে পুলিশ ওই দুই শ্যুটারকে গ্রেপ্তার করে।
তারা বিবৃতি দেয়, কারাগার থেকে লরেন্স বিষ্ণোই নিজেই তাদের গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। যদিও সালমান খানকে হত্যা করতে ব্যর্থ হয়েছেন, লরেন্স গ্যাং ২০২৪ সালে তার ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক নেতা বাবা সিদ্দিকীকে হত্যা করে।
১৯৯৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি পাঞ্জাবের একটি অর্থবান পরিবারে লরেন্স বিষ্ণোইয়ের জন্ম। ১০০ একরেরও বেশি জমি দ্বারা ঘেরা একটি প্রশস্ত বাংলোতে বসবাস করে বিষ্ণোই পরিবার। লরেন্সের বাবা পুলিশের চাকরি করেন, তবে পারিবারিক সম্পত্তির দেখভাল করতে চাকরি ছেড়ে দেন। তার ছেলেবেলা ছিল প্রাচুর্যপূর্ণ। স্থানীয় একটি কনভেন্ট স্কুলে তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয়। ২০০৮ সালে স্কুল শেষ করার পর চণ্ডীগড়ের একটি কলেজে ভর্তি হন, এবং ২০১১ সালে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন। ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর, একবার ছাত্র সংসদ নির্বাচনে হারার পর তিনি অপরাধ জগতের সঙ্গে যুক্ত হন। লরেন্স পাঠ্যক্রম চলাকালেই বেআইনি কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন।
২০১৫ সাল থেকে কারাগারে থাকলেও, লরেন্সের বিরুদ্ধে রয়েছে ২০২২ সালে পাঞ্জাবি গায়ক সিধু মুস ওয়ালাকে হত্যা এবং ২০২৩ সালে কানাডায় শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা হরদীপ সিং নিজ্জার হত্যার অভিযোগ। ২০২৪ সালে রাজনীতিবিদ বাবা সিদ্দিকী হত্যার নির্দেশ দিয়ে অভিযুক্ত হয়েছেন। এমনকি কারাগারের ভেতর থেকেও তিনি গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকারও দিচ্ছেন। ২০২২ সালে গুজরাটের উপকূলে জখৌ বন্দরের কাছে একটি পাকিস্তানি নৌকা থেকে প্রায় ১৯৪ কোটি রুপি মূল্যমানের ৪০ কেজি হেরোইন জব্দের মামলার অংশও তিনি। এই কারণে ২০২৩ সালে তিহার জেল থেকে লরেন্সকে গু্জারাটের আহমেদাবাদের সবরমতী কেন্দ্রীয় জেলে স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে তিনি এখানকার একটি উচ্চ নিরাপত্তার ওয়ার্ডে অবস্থান করছেন। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে তার বিরুদ্ধে মামলা থাকলেও নিরাপত্তার কারণে তাকে অন্য কারাগারে স্থানান্তর কিংবা সরাসরি আদালতে হাজির করা হয় না।
সিনেমায় যেমন সালমান খান স্বকীয় স্টাইলের জন্য পরিচিত, বাস্তবেও লরেন্স তেমনই স্টাইলিস্ট। পরিপাটি করে ছাঁটা দাড়ি, হুডি দিয়ে প্রায় ঢাকা তার দুই সতর্ক চোখ, তাকে অপরাধ জগতে আলাদা স্টাইল যোগ করেছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন