প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়িতে অবস্থিত মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিধ্বস্ত হওয়া যুদ্ধবিমানটির ঘটনা, যা ৩৬ জনের প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, সেই ঘটনার এক বছর পূর্তিতে মঙ্গলবার (২১ জুলাই) বিশেষ দিন হাজির হচ্ছে। বিভীষিকাময় দিনের সেই ভয়ংকর স্মৃতিগুলি এখনও বেঁচে থাকা শিক্ষার্থী এবং তাদের পরিবারকে তাড়া করে ফেরে। আকাশে যখন বিমানগুলোর শব্দ শোনা যায় অথবা আগুন দেখা যায়, তারা তখন আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।
যা ঘটেছিল সেদিন ২০২৫ সালের ২১ জুলাই, দিনটি ছিল সোমবার। দুপুরে সোয়া ১টার দিকে, বাংলাদেশের বিমানবাহিনীর এফ-৭ বিজিআই মডেলের যুদ্ধবিমানটি স্কুলের হায়দার আলী ভবনে বিধ্বস্ত হয়। মুহূর্তের মধ্যে সেখানে ঘটে যায় এক মর্মান্তিক দৃশ্য।
দাউদাউ আগুনের মধ্যে ছোট শিশুদের কোমল শরীর পুড়ে যায়। এ ঘটনায় শিক্ষার্থী, শিক্ষক, এবং অভিভাবকসহ অন্তত ৩৬ জন নিহত হয়। আহত হন শত শত মানুষ। আহত এবং নিহতদের অধিকাংশই শিশু ছিল। সেদিন পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির ইসলামও মারা যান।
শোক কাটেনি, ক্ষুব্ধ অভিভাবকরা মাইলস্টোন ট্র্যাজেডিতে যারা তাদের সন্তান হারিয়েছেন, এমন পরিবারগুলো এক বছর পরেও শোক কাটিয়ে উঠতে পারেনি। তাদের মধ্যে শোকের পাশাপাশি ক্ষোভও রয়েছে। বিশেষ করে দুর্ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ না হওয়ায় তারা হতাশাগ্রস্ত।
বিমান বিধ্বস্তে নিহত শিক্ষার্থী তানভীর আহমেদের বাবা রুবেল মিয়া বলেন, সকালবেলা যে সন্তানকে আমি নিজ হাতে স্কুলে দিয়ে এসেছিলাম, দুপুরে তাকে ফিরে পেয়েছি মৃত অবস্থায়। তিনি আরও জানান, ‘আমার দুই ছেলে ছিল। আগে আমি দুই ছেলেকে প্রতিদিন সকালবেলা স্কুলে নিয়ে আসতাম। এখন শুধুমাত্র ছোট ছেলেকে নিয়ে আসি। স্কুলে আসলে, শত শত ছাত্রছাত্রীর মাঝে আমি আমার তানভীরকে খোঁজার চেষ্টা করি, কিন্তু কোথাও পাই না। শুধু তার শেষ দিনের হাসিমুখ এবং স্মৃতিগুলি মনে পড়ে যা মনে আরেকটি ধাক্কা দেয়। আজকে একটি বছর পার হয়ে গেছে, বড় ছেলের সেই হাসি এখনও আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে।’
দুর্ঘটনায় নিহত সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী মাহতাব রহমানের বাবা মিনহাজ রহমান জানিয়েছেন, ‘ছেলেটার পড়ার টেবিলটা এক বছর ধরে একইভাবে পড়ে আছে। বই সরানো হয়নি, খাতা সরানো হয়নি। প্রতিদিন ওর মা বইগুলো মুছে দেয় এবং সেগুলি গুছিয়ে রাখে। মাহতাবকে ছাড়া আমরা কেউ ভালো নেই। আমাদের বাসাটি আগে প্রাণবন্ত ছিল, হাসি-খুশিতে ভরপুর ছিল। এখন এ বাসাটি কবরস্থানের মতো।’
নিহত তাসনিম আফরোজ আয়মানের মা আয়েশা আক্তার মন্তব্য করেছেন, ‘সরকার ২০ লাখ টাকার ক্ষতিপূরণ দিতে চেয়েছিল। আমরা একটি টাকাও পাইনি। টাকা দিয়ে আমি কী করব? সারা দুনিয়া এনে দিলেও কি আমার আয়মান ফিরে আসবে? আমি তো বলেছিলাম, আমি উল্টো টাকা দেই, আমার আয়মানকে এক সেকেন্ডের জন্য আমার বুকের কাছে এনে জড়িয়ে ধরতে দেন।’
‘সরকারের কাছে আমার আর কোনো চাওয়া নেই, শুধুমাত্র একটাই চাওয়া- স্কুলটিকে এখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হোক। এখনো স্কুলের উপর দিয়ে বিমান উড়ছে। রানওয়ে আগে হয়েছে, স্কুল পরে। এটা এখনো ঝুঁকিপূর্ণ। আমার আয়মান চলে গেছে, কিন্তু ওর মতো শত শত আয়মান এখনও ওই স্কুলে পড়ছে। আমি চাই না আর কোনো মায়ের বুক এভাবে খালি হোক,’ তিনি যোগ করেন।
উড্ডয়ন বন্ধ হয়নি, বিমান উড়লেই বাড়ে আতঙ্ক এদিকে, ঝুঁকিপূর্ণ আবাসিক এলাকায় বিমান উড্ডয়ন বজায় রাখতে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন অভিভাবক এবং স্বজনরা। তাদের অভিযোগ, এত বড় দুর্ঘটনার পরও এ এলাকায় বিমান উড্ডয়ন বন্ধ হয়নি।
তানভীরের বাবা রুবেল মিয়া বলেছেন, ‘প্রশিক্ষণ বিমান এখনো তাদের শিডিউল অনুযায়ী প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। এখন আগের থেকে বেশি বিমান প্রশিক্ষণের মহড়া চলছে। আমরা সবসময় আতঙ্কে আছি, সবসময় ভয় পাচ্ছি, না জানি আবার একটি ঘটনা ঘটে যায়।’
যদিও কলেজ কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, দুর্ঘটনার পর ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা জোরদারে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ভবনের ঝুঁকিপূর্ণ অংশ সংস্কার এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের কাজও অগ্রসর হচ্ছে। পাশাপাশি, ভবিষ্যতে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের প্রস্তুত রাখতে নিয়মিত মহড়া আয়োজনের পরিকল্পনার কথাও রয়েছে।
এদিকে, ট্রাজেডির এক বছর উপলক্ষে কলেজ কর্তৃপক্ষ দুই দিনের একটি কর্মসূচির আয়োজন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে স্মরণ অনুষ্ঠান, দোয়া মাহফিল, কোরআনখানি এবং নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় বিশেষ মোনাজাত।
কর্মসূচির অংশ হিসেবে দুর্ঘটনাস্থলটি মঙ্গলবার সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে, বলে জানিয়েছেন কলেজের অধ্যক্ষ জাহাঙ্গীর আলম খান। তিনি জানান, দুর্ঘটনাস্থলে স্কাউট ও রোভার সদস্যরা গার্ড অব অনার দেবেন। নিহত ব্যক্তিদের প্রতি ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হবে। এক মিনিট নীরবতা পালন করা হবে এবং পরে দোয়া অনুষ্ঠিত হবে।
এছাড়া, স্মৃতিচারণার আয়োজন থাকবে এবং নিহত ব্যক্তিদের ছবি, বন্ধুদের লেখা স্মৃতিকথা ও বিভিন্ন বার্তা প্রদর্শন করা হবে। এ আয়োজনে অভিভাবকরাও উপস্থিত থাকবেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন