প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
খাগড়াছড়ি-দীঘিনালা-সাজেক-বাঘাইছড়ি সড়কে চলমান অবরোধ গতকাল রোববার দশম দিনে প্রবেশ করেছে। শুক্রবার প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে আন্দোলনকারী দুটি সংগঠন এই দিন অবরোধ শিথিল করার ঘোষণা দেয়। এই সুযোগে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার মারিশ্যা এলাকার বাসিন্দা মিতালী চাকমা অসুস্থ মাকে নিয়ে ঢাকার যাওয়ার প্রস্তুতি নেন।
গতকাল সকাল সাড়ে ৮টার দিকে খাগড়াছড়ি জেলা শহরের ন্যান্সিবাজার এলাকায় দীঘিনালা-খাগড়াছড়ি স্টেশনে তাঁকে দেখা যায়। তবে আগের রাতেই আরেক পক্ষ পাল্টা অবরোধের ঘোষণা দেওয়ায় তিনি বিপাকে পড়েন।
মিতালী চাকমার মতো হাজারো মানুষ এদিন দুর্ভোগের শিকার হন। তাদের মধ্যে একজন মো. মুনির, যিনি দীঘিনালা সরকারি ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক। কলেজের পরীক্ষা-সংক্রান্ত কাজে তাঁর যাওয়া জরুরি ছিল। কিন্তু যানবাহন না পাওয়ায় তাঁকে বাসায় ফিরতে হয়। কিছু ভাড়াটিয়া যাত্রীবাহী মোটরবাইক চালক যাত্রী নিতে চাইলেও অন্য পরিবহনের চালক-শ্রমিকরা তাদের বাধা দেন।
পাঁচ দফা দাবিতে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও কারবারি অ্যাসোসিয়েশন ২২ অক্টোবর থেকে সড়ক অবরোধ করে আসছে। শুক্রবার সংগঠন দুটির নেতা বাবুধন চাকমা ও নতুনজয় চাকমার সই করা বিজ্ঞপ্তিতে রোববারের জন্য অবরোধ শিথিলের ঘোষণা দেওয়া হয়। এতে উল্লেখ করা হয়, সাজেক এলাকার সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদা ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের মাসব্যাপী কঠিন চীবর দানোৎসবের কথা বিবেচনা করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে বিবৃতিতে জানানো হয়, সোমবার থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য সড়ক অবরোধ কর্মসূচি চলবে। এর মধ্যেই রোববার সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত নতুন করে অবরোধের ডাক দেয় পার্বত্য চট্টগ্রাম রক্ষা কমিটি নামে একটি শ্রমিক সংগঠন। সংগঠনের সদস্য সচিব বিন্দুলাল চাকমার সই করা বিজ্ঞপ্তি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় লোকজনের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দেয়।
এ বিষয়ে পরিবহন শ্রমিক জসীম উদ্দিন বলেন, “দুটি সংগঠন পর্যটনের ভরা মৌসুমে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের জন্য পুরো পরিবহন সেক্টরকেই জিম্মি করে ফেলেছে। নিজেদের খেয়ালখুশিমতো সড়ক অবরোধ ডাকবে আর তুলবে; এটা হতে পারে না। এক দিনের শিথিল মানি না। তাই আমরাও পাল্টা সর্বাত্মক সাজেক অবরোধের পথ ধরেছি।”
অপর পরিবহন শ্রমিক জহিরঞ্জন ত্রিপুরা বলেন, “আমরা দিনে এনে দিনে খাওয়া মানুষ। মনে করেছিলাম আজ অনেক দিন পর যাত্রী নিয়ে দীঘিনালা-সাজেক যাব, কিছু আয় হবে। এখন তো আবারও সব বন্ধ।”
খাগড়াছড়ির পরিবহন নেতা মীর হোসেন ও আয়ুস কান্তি চাকমার ভাষ্য, এই অচলাবস্থা নিরসনে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে আলোচনার প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। তাদের মতে, এর স্থায়ী সমাধান না হলে চলমান পর্যটন মৌসুমে সব ধরনের ব্যবসা ভেস্তে যাবে। হাজার হাজার মানুষের জীবিকা ভয়াবহ সংকটে পড়বে।
উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে ২৬ অক্টোবর আন্দোলনকারীদের সঙ্গে উজোবাজারে আলোচনা করেন খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভূঁইয়া, রাঙামাটির সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ান ও প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা। তারা আন্দোলনকারীদের পাঁচ দফা দাবির মধ্যে চার দফা দাবি মেনে নেন। তবে একটি দাবি নিয়ে মতানৈক্য থাকায় আলোচনা অমীমাংসিতভাবে শেষ হয়। এ নিয়ে নতুন করে আলোচনার কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
আবারও ঘণ্টাব্যাপী গোলাগুলি
এদিন সাজেকে গত শনিবার পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) ও ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) মধ্যে পৌনে এক ঘণ্টা গোলাগুলি হয়। এদিন দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে সোয়া ১টা পর্যন্ত মাচলং এলাকার দুর্গম কলাবুনিয়া ও ভাঙ্গামুড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এতে হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই গতকাল রোববার আবারও দুপক্ষের মধ্যে ঘণ্টাব্যাপী গোলাগুলি হয়েছে। এদিন বিকেল ৪টা থেকে ৫টা পর্যন্ত গঙ্গারামের জুরজুড়ি ছড়ার পার্শ্ববর্তী লাঙ্গলমারা এলাকায় এই গোলাগুলি হয়। তবে হতাহতের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এদিকে পরপর দুদিন গোলাগুলির ঘটনায় আতঙ্কিত বেশ কিছু বাসিন্দা এলাকা ছেড়ে গেছেন।
এ বিষয়ে ইউপিডিএফের মুখপাত্র অংগ্য মারমা বলেছেন, ইউপিডিএফের বন্দুকযুদ্ধে জড়িত থাকার প্রশ্নই আসে না। তাদের কোনো সশস্ত্র সংগঠন নেই, এটি গণতান্ত্রিক সংগঠন। সাজেকে যে আন্দোলন চলছে, তা ভিন্ন খাতে নেওয়ার জন্য এমন অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
জেএসএসের কেন্দ্রীয় তথ্য ও প্রচার বিভাগের সহসম্পাদক সজীব চাকমাও দাবি করেন, তাঁর দলের কোনো সশস্ত্র গ্রুপ নেই। যে কারণে জেএসএসও এই বন্দুকযুদ্ধে জড়িত নয়। তাঁর ভাষ্য, ইউপিডিএফের সশস্ত্র তৎপরতার বিরুদ্ধে স্থানীয় জনসাধারণ প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন।
সাজেক ইউপির ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য পরিচয় চাকমা জানান, জুরজুড়ি ছড়া ও লাঙ্গলমারা সীমানা এলাকায় গতকাল ঘণ্টাব্যাপী গোলাগুলি হয়েছে। এ ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
সাজেক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তোফাজ্জল হোসেন বলেন, লাঙ্গলমারা এলাকায় দুই গ্রুপের মধ্যে ঘণ্টাব্যাপী গোলাগুলির তথ্য পেয়েছেন। তবে এ গোলাগুলি থেমে গেছে। তিনি আরও বলেন, খাগড়াছড়িতে একটি সংগঠনের ডাকা অবরোধের কারণে সাজেক সড়কে ছোটখাটো যানবাহন চলাচল করেছে। তবে বড় ধরনের যানবাহন চলাচল করেনি।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন