প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ঢাকা থেকে ফেরা মাত্রই ভিক্ষুক সেজে ঘরে ঢুকে হামলা, জনরোষ এড়াতে পুলিশের 'মিথ্যা আশ্বাস'—২০০৪ সালের সেই রক্তাক্ত ২৫ অক্টোবরের নেপথ্যে কি তবে দলীয় কোন্দল ও টেন্ডার আধিপত্য?
২০০৪ সালের ২৫ অক্টোবর (রমজান মাস)। রাজধানী ঢাকা থেকে দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর সফর শেষে বরিশালের দক্ষিণ আলেকান্দার নিজ বাসভবনে ফেরেন ১৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও মহানগর যুবদলের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবুল আলম মেহেদী। ঢাকার সফরক্লান্তি দূর করতে তিনি কেবলই গোসলে ঢোকার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, অন্যদিকে পরিবারে চলছিল মাগরিবের আজান ও ইফতারের আয়োজন। ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘটে এক অলৌকিক ও নৃশংস নাটকের রূপায়ন, যা আজও বরিশালবাসীর স্মৃতিতে এক বিভীষিকাময় অধ্যায় হয়ে আছে।
অভিযোগ রয়েছে, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)-৬ এর বরিশাল চাঁদমারিস্থ অস্থায়ী ক্যাম্পের একটি দল পরিকল্পিতভাবে ছদ্মবেশে মেহেদীর বাসভবনে প্রবেশ করে। স্থানীয় সূত্রের তথ্যমতে, রোজা রাখার কথা বলে এবং ভিক্ষুক সেজে কয়েকজন ব্যক্তি প্রথমে বাসায় ঢোকে। মেহেদী তাদের মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে ইফতার করানোর নির্দেশ দেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই বোঝা যায়, এরা অন্য কেউ নন—র্যাব-৬ এর ছদ্মবেশী সদস্য। তারা দ্রুত খবর পাঠায় এবং মুহূর্তের মধ্যেই পুরো বাড়িটি ঘেরাও করে ফেলে র্যাবের একটি বড় দল।
অভিযোগ উঠেছে, কোনো রকম আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে এবং কোনো প্রতিক্রিয়া দেখানোর আগেই র্যাব সদস্যরা মেহেদীর ওপর চড়াও হয়। তৎকালীন সিও লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোস্তফা কামাল এবং প্রধান অপারেশনস অফিসার স্কোয়াড্রন লিডার কে এম সাজ্জাদ হোসেনের নির্দেশে র্যাব-৬ এর একটি দল মেহেদীর ওপর প্রচণ্ড শারীরিক নির্যাতন চালায়। এতে তার দুই হাতের কবজি থেকে ডেনা ভেঙে যায়। পরবর্তীতে ফায়ারিং স্কোয়াডের মতো একতরফা গুলি চালিয়ে তার মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। ঘটনার পর তৎকালীন সময়ে র্যাব আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি করে যে, আভিযানিক দলের সঙ্গে গোলাগুলিতে অর্থাৎ 'বন্দুকযুদ্ধে' মেহেদী নিহত হয়েছেন।
মেহেদীকে নির্মমভাবে হত্যার খবর ছড়িয়ে পড়তেই ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের হাজার হাজার সাধারণ মানুষ তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়ে এবং পুরো বাড়ি ঘেরাও করে র্যাব টিমকে অবরুদ্ধ করে ফেলে। পরিস্থিতির গাম্ভীর্য ও উত্তাপ বুঝতে পেরে র্যাব থানা ও পুলিশ লাইনস থেকে অতিরিক্ত পুলিশ ফোর্স তলব করে। জনরোষ নিয়ন্ত্রণে আনতে না পেরে তখন পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে এক কৌশলী প্রতারণার আশ্রয় নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে বলা হয়, "মেহেদী গুরুতর আহত হয়েছেন, তাকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিতে হবে।" এরপর একটি অ্যাম্বুলেন্সে তাকে এমনভাবে বসিয়ে ও তুলনামূলক স্বাভাবিক ভঙ্গিতে তুলে নেওয়া হয়, যাতে সাধারণ মানুষ বুঝতে না পারে যে প্রিয় কাউন্সিলর ইতোমধ্যে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। অ্যাম্বুলেন্সটি দ্রুত স্থান ত্যাগ করে মেহেদীর লাশ বরিশাল মর্গে রেখে আসে। ততক্ষণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা নিরাপদে ঘটনাস্থল ত্যাগ করতে সক্ষম হয়।
মেহেদীর নাম ভাঙিয়ে অপরাধের সাম্রাজ্য: নেপথ্যে রুবেল ও রফিক সিন্ডিকেট
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। মাহাবুবুল আলম মেহেদীর বিরুদ্ধে সেসময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিভিন্ন মাধ্যমে যত অভিযোগ তোলা হয়েছিল, তার একটি বড় অংশ সম্পর্কে তিনি নিজেও সম্পূর্ণ অবিদিত ছিলেন।
একটি বিশেষ সূত্রের দাবি অনুযায়ী, মেহেদীর সাথে সব সময় দুই ছায়াসঙ্গী অবস্থান করতেন—যাদের একজন 'রফিক' এবং অন্যজন 'নাককাটা রুবেল'। মূলত তারা দুইজন মেহেদীর ক্ষমতার প্রভাব ও নাম ভাঙিয়ে বরিশাল শহরের বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি প্রদর্শন, চাঁদাবাজি এবং মোটরসাইকেল শোডাউন করে আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করত। অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, এই দুজন কেবল চাঁদাবাজিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না; তাদের বিরুদ্ধে ধর্ষণের মতো চরম ঘৃণ্য ও নৃশংস অপরাধের গুরুতর অভিযোগও রয়েছে।
মেহেদীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং আস্থাভাজন হওয়ায় সাধারণ মানুষ কিংবা ভুক্তভোগীদের পক্ষে তাদের বিরুদ্ধে কোনো নালিশ নিয়ে মেহেদীর কাছে পৌঁছানো সম্ভব হতো না। তাদের ভয়ে মুখ খোলার সাহস পেতেন না কেউই। অনুসন্ধানী একাধিক সূত্রের মতে, রফিক ও নাককাটা রুবেলের এসব অপকর্মকেই পুঁজি করে পরবর্তীতে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক নেতারা চতুরতার সাথে নিজ ফায়দা লুটেন এবং একজন উদীয়মান ও সাহসী যুবদল নেতাকে বলির পাঠা বানিয়ে পরিকল্পিতভাবে র্যাবের হাতে তুলে দেওয়া হয় বলে ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের দাবি।
কথিত বন্দুকযুদ্ধে মেহেদীর মর্মান্তিক মৃত্যুর পর এই দুই অনুসারী নিজেদের গুটিয়ে নেয়। ঘটনাচক্রে 'নাককাটা রুবেল' ও 'রফিক' দীর্ঘ প্রায় এক যুগ (১২ বছর) বরিশাল ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যায়। পরবর্তীতে জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নাককাটা রুবেলকে পুনরায় বরিশালে দেখা যায় এবং সে তার পুরোনো প্রভাব ফিরে পাওয়ার চেষ্টা চালায়। তবে বর্তমানে আদালতে তার বিরুদ্ধে একটি ফৌজদারি মামলা বিচারাধীন থাকায় সে পুনরায় বরিশাল থেকে আত্মগোপন করেছে বলে জানা গেছে।
হত্যাকাণ্ডের পর দীর্ঘদিন পার হলেও ২০২২ সালে মাহাবুবুল আলম মেহেদীর বড় ভাই শফিকুল আলম গুলজার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক আলোড়ন সৃষ্টকারী তথ্যের অবতারণা করেন। তিনি সরাসরি দাবি করেন, মেহেদীর এই নির্মম মৃত্যুর পেছনে মূল কলকাঠি নেড়েছিলেন তৎকালীন স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় বিএনপি নেতারা।
তার দেওয়া তথ্যমতে, তৎকালীন এমপি মজিবুর রহমান সারোয়ার, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, বরিশাল মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান খসরু এবং তার ভাই এ টি এম শহিদুল্লাহ কবিরের রাজনৈতিক চক্রান্তের শিকার হয়েই মেহেদীকে প্রাণ দিতে হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, দক্ষিণ আলেকান্দার একক প্রভাবশালী ও অত্যন্ত জনপ্রিয় তরুণ নেতা ছিলেন মেহেদী। স্থানীয় রাজনীতি ও টেন্ডার নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে তৎকালীন এমপির অনুগামীদের সাথে তার তৈরি হয়েছিল চরম দূরত্ব। তৎকালীন এমপির বাধানিষেধ তোয়াক্কা না করে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহসই যেন তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। বরিশাল শহরের সরকারি দপ্তরের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক আধিপত্য নিয়ে শীর্ষ নেতাদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছিলেন তিনি।
একটি বিশ্বাসযোগ্য সূত্র দাবি করে, বরিশাল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের বৃত্তি প্রদান অনুষ্ঠানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া যখন বরিশালে আসেন, তখন বরিশাল সার্কিট হাউসে বসে তৎকালীন এমপি মজিবুর রহমান সারোয়ার মেহেদীর বিরুদ্ধে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কাছে নালিশ জানান এবং তাকে 'সন্ত্রাসী ও ক্যাডার পালনকারী' বলে অভিহিত করেন। কিন্তু নির্ভীক মেহেদী তাৎক্ষণিক প্রধানমন্ত্রীর সামনেই উত্তর দিয়ে বলেন, "আপনার ভাইয়েরাই চাঁদাবাজি করে বরিশালে ফেনসিডিলসহ মাদকের সিন্ডিকেট চালু রেখেছে।" বেগম খালেদা জিয়ার সাথে মেহেদীর বিশেষ স্নেহপূর্ণ সম্পর্ক থাকায় প্রধানমন্ত্রী সেদিন কোনো নেতিবাচক মন্তব্য না করে বিষয়টি এড়িয়ে যান। তবে এই ঘটনা স্থানীয় শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে মেহেদীর মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার তথ্য ও ২০০৪ সালের সার্বিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেসময়ে তথাকথিত 'বন্দুকযুদ্ধ' বা 'ক্রসফায়ার'-এর নামে অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে, যা মূলত আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার শামিল। এলিট ফোর্স র্যাবের মূল কাজ ছিল শীর্ষ অপরাধীদের গ্রেফতার করে আইনের হাতে সোপর্দ করা। কিন্তু রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল এবং ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার হাতিয়ার হিসেবে র্যাবকে ব্যবহার করার একাধিক অভিযোগ উঠে এসেছে।
স্থানীয়ভাবে ‘গরিবের রবিনহুড’ হিসেবে পরিচিত মেহেদী যদি কোনো প্রভাবশালী বা এলিট শ্রেণীর বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়ে থাকেন, তাও ছিল সাধারণ মানুষের কল্যাণে—এমনটাই দাবি অনুসারীদের।
'তালাশ বিডি'র চলমান অনুসন্ধান
একটি উদীয়মান নেতৃত্বকে ষড়যন্ত্রের বেড়াজালে ফেলে বন্দুকযুদ্ধের নাটক সাজিয়ে হত্যা করা হলেও তার রেখে যাওয়া স্মৃতি ও প্রশ্নগুলো আজও মুছে যায়নি।
২০০৪ সালের সেই রক্তাক্ত ২৫ অক্টোবরের ঘটনার প্রকৃত সত্য বের করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ 'তালাশ বিডি'। এই ঘটনার মূল নেপথ্য রহস্য উন্মোচনে র্যাব-৬ এর তৎকালীন সিও লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোস্তফা কামাল এবং প্রধান অপারেশনস অফিসার স্কোয়াড্রন লিডার কে এম সাজ্জাদ হোসেন-এর তৎকালীন ভূমিকা পুনর্মূল্যায়ন করা জরুরি। তারা বর্তমানে অবসর জীবনযাপন করছেন, বিদেশে আছেন নাকি অন্য কোথাও অবস্থান করছেন—তা অনুসন্ধানের আওতায় আনছে তালাশ বিডির বিশেষ প্রতিনিধি দল।
খুব শীঘ্রই তাদের সাক্ষাৎকার, বক্তব্য এবং সংগৃহীত নতুন তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে এই রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের আসল রূপ বরিশালবাসীর সামনে তুলে ধরা হবে। তালাশ বিডির বিশেষ অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে...
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন