প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাস্তুচ্যুত হয়ে শহরের বস্তিতে আশ্রয় নেওয়া দরিদ্র জনগণের পুনর্বাসন, স্থায়ী আবাসন, মৌলিক নাগরিক সেবা এবং ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা এবং জলবায়ু উদ্বাস্তু পরিবারের সদস্যরা। এই দাবির জন্য নগর দরিদ্রদের কেন্দ্র করে অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর পরিকল্পনা, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার জন্য বিশেষ বাজেট বরাদ্দ এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতি তহবিল (লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড) থেকে তাদের অধিকার নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
সোমবার (২ নভেম্বর) ঢাকার জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে অনুষ্ঠিত এক নাগরিক সংলাপে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্রমাগত বাস্তুচ্যুত হয়ে শহরে আশ্রয় নেওয়া দরিদ্র জনগণের বহুমুখী সংকট, তাদের জীবনসংগ্রাম এবং ভবিষ্যৎ সুরক্ষার ৮ দফা দাবি তুলে ধরা হয়।
‘জলবায়ু পরিবর্তন ও নগর দরিদ্রের সংকট’ শীর্ষক এই সংলাপটি যৌথভাবে আয়োজন করে বাংলাদেশ রিসোর্স সেন্টার ফর ইন্ডিজিনাস নলেজ (বারসিক) এবং চিলড্রেন'স ওয়াচ ফাউন্ডেশন (সিডব্লিউএফ)।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাদারীপুর-৩ আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য আনিসুর রহমান খোকন। সংলাপে সভাপতিত্ব করেন বারসিক-এর পরিচালক মো. কামরুজ্জামান এবং ধারণাপত্র পাঠ করেন সিডব্লিউএফ-এর চেয়ারম্যান শাহ ইসরাত আজমেরী। সঞ্চালনায় ছিলেন বারসিকের সমন্বয়ক মো. জাহাঙ্গীর আলম।
সংলাপে ঢাকা, রাজশাহী ও সাতক্ষীরা অঞ্চলের বিভিন্ন বস্তিতে আশ্রয় নেওয়া প্রান্তিক জলবায়ু-উদ্বাস্তু পরিবারের প্রতিনিধি ও কমিউনিটি নেতারা উপস্থিত হয়ে তাদের নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরেন।
গবেষণায় উঠে আসা তথ্যে দেখা যায়, উপকূলীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড় (সিডর, আইলা, আম্পান, রেমল), তীব্র লবণাক্ততা, নদীভাঙন এবং উত্তরাঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদী খরা ও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার কারণে প্রায় ৭০% বস্তিবাসী গ্রাম থেকে শহরে আসতে বাধ্য হয়েছেন। ভোলার লালমোহন ও চরফ্যাশন, বরিশাল, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং সাতক্ষীরার শ্যামনগর-কয়রা অঞ্চল থেকে বাস্তুচ্যুত এসব মানুষের শহরের বস্তিতে টিকে থাকার সংগ্রাম অত্যন্ত অমানবিক।
সংলাপে প্রান্তিক মানুষের প্রতিনিধিত্বকারী বক্তারা জানান, গ্রাম ছাড়ার পর তারা কেবল বাসস্থানই হারাননি, হারিয়েছেন তাদের বহু বছরের প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। শত কষ্ট সয়ে শহরে এসে তারা জরাজীর্ণ ঘর, অনিরাপদ পানি, অপরিশোধিত স্যানিটেশন, তীব্র তাপপ্রবাহে হিটস্ট্রোক, বর্ষায় ড্রেনের বর্জ্যমিশ্রিত পানিতে চর্মরোগ ও ডেঙ্গুর মতো স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ভুগছেন। পাশাপাশি, দিনমজুর ও রিকশাচালকদের অনিয়মিত আয়, অপরাধের ভয়াবহতা এবং সমাজ ও নাগরিক পরিবেশের তুচ্ছতাচ্ছিল্য তাদের আত্মসম্মান ও মানসিক শান্তি কেড়ে নিয়েছে।
অনুষ্ঠানে জলবায়ু-বাস্তুচ্যুত নগর দরিদ্র জনগণের পক্ষ থেকে ৮ দফা প্রধান দাবি ও সুপারিশ উত্থাপন করা হয়: ১. সমেত নগর পরিকল্পনা: শহরকে ধনী-দরিদ্র সবার উপযোগী করতে নগর প্রান্তিক মানুষকে কেন্দ্রে রেখে উন্নয়ন পরিকল্পনা করা। ২. বিশেষ বাজেট বরাদ্দ: নিম্ন আয়ের মানুষের জলবায়ু অভিযোজন ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভাকে শক্তিশালী করে পৃথক বাজেট দেওয়া। ৩. আশ্রয় ও পুনর্বাসন: জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুতদের নিজ এলাকায় বা নিকটস্থ শহরে আবাসন ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা। ৪. বস্তির ঘরের মানোন্নয়ন: বস্তির জরাজীর্ণ অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করা। ৫. মৌলিক নাগরিক সেবা: শহরের দরিদ্র জনগণের জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা করা। ৬. আবহাওয়ার আগাম সতর্কবার্তা: তীব্র তাপপ্রবাহ, বন্যা ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত নিয়ে বস্তিবাসীদের আগাম পূর্বাভাস ও সচেতনতা বৃদ্ধি করা। ৭. স্থায়ী আবাসন ও উচ্ছেদ বন্ধ: উচ্ছেদহীন ও ভয়হীনভাবে বসবাসের জন্য জলবায়ু-উদ্বাস্তু পরিবারগুলোর স্থায়ী আবাসনের নিশ্চয়তা দেয়া। ৮. ক্ষয়ক্ষতি ফান্ড: জলবায়ু পরিবর্তনজনিত 'লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড' (ক্ষয়ক্ষতি তহবিল) থেকে বস্তিবাসীদের অধিকার ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মাননীয় সংসদ সদস্য আনিসুর রহমান খোকন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার হয়ে গ্রামে কর্মসংস্থান ও ভিটেমাটি হারানো মানুষগুলো যখন বেঁচে থাকার শেষ চেষ্টা হিসেবে শহরে আসেন, তখন তাদের প্রতি নাগরিক সমাজের সহমর্মিতা ও রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা নিশ্চিত করা আবশ্যক। কপ৩১ পরবর্তী এই সময়ে আমাদের নগর নীতিতে জলবায়ু অভিগমন বা ক্লাইমেট মাইগ্রেশনের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
সংলাপে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ, পরিবেশকর্মী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নিয়ে জোর তাগিদ দিয়ে বলেন যে, নগরের উন্নয়ন কেবল অবকাঠামোগত হলে চলবে না; তা হতে হবে মানবিক ও টেকসই।
সংলাপে আরও বক্তব্য দেন, বুড়িগঙ্গা বাঁচাও আন্দোলনের কনভেনর মিহির বিশ্বাস, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) ট্রেজারার আমিনুল রসুল, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা: লেলিন চৌধুরী, কোয়ালিশন ফর আরবান পুওর (কাপ)-এর নির্বাহী পরিচালক খন্দকার রেবেকা সান-ইয়াত প্রমুখ।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন