প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
পশ্চিম ইউরোপের ফুটবলে অ্যাওয়ে ম্যাচ সাধারণত কয়েকশো মাইলের পরিচিত পথ। তবে স্পেনের ফুটবলে এই হিসাব পরিবর্তিত হয় যখন গন্তব্য হয় ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জ। এটি আটলান্টিক মহাসাগরের এক দূরবর্তী দ্বীপমালা, যা মূল ভূখণ্ড থেকে হাজার মাইল দূরে অবস্থিত। শান্ত-সুন্দর তেনেরিফ দ্বীপটি বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম আগ্নেয়গিরি মাউন্ট তেইদের ছায়ায় ঘেরা। প্রতি বছর লাখ লাখ পর্যটক সেখানে সমুদ্র এবং রোদ উপভোগ করতে যান। কিন্তু ফুটবলপ্রেমীদের জন্য ‘সিডি তেনেরিফে’ নামটি কেবল একটি ফুটবল ক্লাবের নাম নয়, বরং এটি একটি মহাকাব্যিক নাটকের নাম। এটি বার্সেলোনা সমর্থকদের জন্য স্বর্গীয় আনন্দের উৎস, অন্যদিকে রিয়াল মাদ্রিদ ভক্তদের মনে সৃষ্টি করে এক অধরা যন্ত্রণার কালো স্মৃতি।
এই পুঁচকে দলটি ইতিহাসের বেশিরভাগ সময় সেকেন্ড ডিভিশনে কাটিয়েছে এবং মাত্র ১২ মৌসুম লাল লিগায় খেলেছে। তবুও, তারা কীভাবে যেন স্প্যানিশ ফুটবলের রাজকীয় ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ‘কিংমেকার’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফুটবল বিধাতা পরপর দুই মৌসুমে এমন এক নাটকের চিত্রনাট্য রচনা করেছিলেন, যা কোনো উপন্যাসের কল্পনাকেও হার মানায়।
ব্ল্যাঙ্কোদের আধিপত্য এবং ক্রুইফের ‘ড্রিম টিম’ বিপ্লব
আশির দশকের শেষের দিকে স্প্যানিশ ফুটবলে রিয়াল মাদ্রিদের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। বুত্রাগুয়েনো, স্যানচিস, মিচেল, মার্তিন বাসকেসদের নিয়ে গঠিত ‘লা কুইনতা দেল বুইত্রে’ এবং হুগো সানচেসের বুলেট ড্রাইভের সামনে দাঁড়িয়ে রিয়াল মাদ্রিদ টানা পাঁচটি লা লিগা শিরোপা জিতেছিল। ইউরোপের মঞ্চেও তারা ছিল অপরাজেয় শক্তি। আর তাদের বিশাল ছায়াতলে বার্সেলোনা বারবার দ্বিতীয় স্থানে সন্তুষ্ট ছিল।
কিন্তু ১৯৮৮ সালের গ্রীষ্মে ন্যু ক্যাম্পে আগমন ঘটে এক ফুটবল প্রেরিতের। তার নাম ইয়োহান ক্রুইফ। এই ডাচ জাদুকর বার্সেলোনার ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তন করতে এসেছিলেন। প্রথম দুই মৌসুমে দলকে গুছিয়ে রোনাল্ড কোমান, পেপ গার্দিওলা এবং বুলগেরিয়ান তুফান রিস্টো স্টইচকভকে এক সুতোয় গাঁথলেন ক্রুইফ। এর ফলে বিখ্যাত ‘ড্রিম টিম’ জন্ম নিল। ১৯৯০-৯১ মৌসুমে অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদকে ১০ পয়েন্টে পেছনে ফেলে বার্সেলোনা শিরোপা পুনরুদ্ধার করল। রিয়ালের পাঁচ বছরের দীর্ঘ রাজত্ব ভেঙে গেল।
কিন্তু আসল নাটক অপেক্ষা করছিল পরবর্তী দুই মৌসুমে।
১৯৯১-৯২ মৌসুম: রিয়ালকে তেনেরিফের প্রথম বজ্রপাত
১৯৯১-৯২ মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদের দায়িত্বে এলেন লিও বেনহ্যাকার। দলে যোগ দিলেন রবার্ট প্রোদিনেচকি এবং তরুণ লুইস এনরিকে। শুরুতেই একের পর এক জয়ে উড়তে শুরু করল রিয়াল মাদ্রিদ। অন্যদিকে বার্সেলোনা প্রথম পাঁচ ম্যাচের তিনটিতেই হেরে পয়েন্ট টেবিলের পেছনে চলে গেল। ডিসেম্বরের শুরুতে রিয়াল মাদ্রিদ ৮ পয়েন্টে এগিয়ে গিয়ে যেন শিরোপায় এক হাত দিয়ে বসেছিল।
কিন্তু বসন্তের বাতাসে ফুটবল খেলা বদলাতে শুরু করল। মার্চে এসে রিয়ালের ফর্ম হঠাৎই পড়ে যায়, আর ক্রুইফের বার্সেলোনা একের পর এক জয়ে দূরত্ব কমাতে শুরু করে। এপ্রিল মাসে তেনেরিফেতে ১-২ গোলে হেরে বার্সা আবার ধাক্কা খায়। তবে মে মাসের শেষে সমীকরণ দাঁড়ায় ১ পয়েন্টে এগিয়ে শীর্ষে রিয়াল মাদ্রিদ।
৬ জুন, ১৯৯২ : সেই ঐতিহাসিক ম্যাচ
শেষ দিনে বার্সেলোনার ম্যাচ ঘরের মাঠে তুলনামূলক দুর্বল অ্যাথলেটিক বিলবাওর বিরুদ্ধে। অন্যদিকে রিয়াল মাদ্রিদের গন্তব্য ছিল সেই হাজার মাইল দূরের তেনেরিফে, যেখানে তাদের কোচ ছিলেন সাবেক কিংবদন্তি হোর্হে ভালদানো। তেনেরিফে তখন টিকে থাকার লড়াই চলছিল।
ম্যাচের ৮ মিনিটে ফার্নান্দো হিয়েরোর দুর্দান্ত হেড এবং চার মিনিট পর ঘেওরগে হাজির ৩০ গজ দূর থেকে নেওয়া এক রকেট ফ্রি-কিকে রিয়াল ০-২ গোলে এগিয়ে যায়। রিয়াল সমর্থকেরা তখন শ্যাম্পেন খোলার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
কিন্তু ৩৬ মিনিটে তেনেরিফের এস্তেবারান্স এক একক প্রচেষ্টায় ব্যবধান ১-২ করেন। ঠিক একই মুহূর্তে ন্যু ক্যাম্পে স্টইচকভ গোল করে বার্সাকে এগিয়ে নেন। খেলা হয়ে ওঠে আরও শ্বাসরুদ্ধকর। বিরতির পরপরই স্টইচকভ নিজের দ্বিতীয় গোল করলে বার্সার জয় নিশ্চিত হয়ে যায়। এখন সব নজর আটলান্টিকের ওপারের সেই ছোট্ট দ্বীপে।
রিয়ালের দুর্ভাগ্য শুরু হলো একে একে। প্রথমে একটি বৈধ গোল অফসাইডের অজুহাতে বাতিল হলো। এরপর রিয়ালের ডিফেন্ডার ভিয়ারোইয়া লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়লেন এবং ১০ জনের দলে পরিণত হলো মাদ্রিদ। তবুও জয় যখন হাতছানি দিচ্ছে, ৭৩ মিনিটে বুত্রাগুয়েনো ওয়ান-অন-ওয়ানে গোলরক্ষক মানোলোকে পেয়েও গোল করতে ব্যর্থ হন। এরপর ঘটল সেই অবিশ্বাস্য তাণ্ডব!
ম্যাচের ৭৭ মিনিটে তেনেরিফের ফিলিপের একটি নিচু ক্রস নিজেদের জালে জড়িয়ে দেন রিয়াল ডিফেন্ডার রিকার্দো রোচা। আত্মঘাতী গোলে ম্যাচ তখন ২-২! রিয়াল প্লেয়ারদের চোখেমুখে তখন আতঙ্ক। এক মিনিট কাটতে না কাটতেই তেনেরিফের একটি উঁচু ব্যাকপাস সামলাতে গিয়ে পা পিছলে যায় রিয়াল গোলরক্ষক বুয়োর। বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে তিনি তুলে দেন চার মিনিট আগে বদলি হিসেবে নামা তেনেরিফে স্ট্রাইকার পিয়েরের পায়ে! খালি জালে বল ঠেলে দিতে বিন্দুমাত্র ভুল করেননি পিয়ের।
মাত্র দুই মিনিটের ব্যবধানে ২-০ থেকে ৩-২! স্তব্ধ হয়ে যায় পুরো মাদ্রিদ, আর হাজার মাইল দূরে ন্যু ক্যাম্পে ৫০ হাজার দর্শক আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠে। পাঁচ মিনিটের ইনজুরি সময় শেষে বাঁশি বাজতেই ইতিহাস লেখা হয়ে যায়—রিয়ালকে ৩-২ গোলে হারিয়ে বার্সেলোনাকে লা লিগা উপহার দেয় তেনেরিফে!
১৯৯২-৯৩ মৌসুম: নাটকের দ্বিতীয় পর্ব এবং একই নিয়তি
এক বছর পর। নতুন মৌসুমে নতুন আশায় বুক বাঁধে রিয়াল মাদ্রিদ। বেনহ্যাকারের জায়গায় আসেন বেনিতো ফ্লোরো, দলে যোগ দেন দুর্দান্ত স্ট্রাইকার ইভান জামোরানো। ১৯৯৩ সালের পুরোটা সময় লিগে অপরাজিত ছিল রিয়াল (২২ ম্যাচে ১৫ জয়)। ১৯ জুন, ১৯৯৩—লিগের শেষ দিনে আবারও রিয়াল ১ পয়েন্টে এগিয়ে বার্সেলোনার চেয়ে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, শেষ দিনে রিয়ালের গন্তব্য ছিল আবারও সেই তেনেরিফে!
মাদ্রিদ থেকে তেনেরিফে যাওয়ার পথে রিয়ালের চার্টার্ড বিমানের এসি নষ্ট হয়ে যায়। ১৫ ঘণ্টার সেই নরকযন্ত্রণার সফর পেরিয়ে অসুস্থ শরীরে দ্বীপে পৌঁছায় তারা। প্রকৃতি যেন আগেই জঘন্য সমাপ্তির সংকেত দিয়ে রেখেছিল।
১৯ জুন, ১৯৯৩: ইতিহাস পুনরাবৃত্তি ও রিয়ালের কালো রাত
ম্যাচ শুরুর মাত্র ১১ মিনিটের মাথায় কর্নার থেকে অস্কার দেসের্তিয়ার হেডে রিয়াল ১-০ গোলে পিছিয়ে পড়ে। টিভিতে যখন এই গোলের রিশট দেখানো হচ্ছিল, ব্যাকগ্রাউন্ডে ধারাভাষ্যকারের চিৎকার শোনা গেল—ন্যু ক্যাম্পে রিয়াল সোসিয়েদাদের বিরুদ্ধে গোল করেছেন সেই রিস্টো স্টইচকভ!
৩৮ ও ৪০ মিনিটে রিয়ালের দুটি পেনাল্টি দাবি নাকচ করে দেন রেফারি। ৪২ মিনিটে চ্যানোর দর্শনীয় হেডে তেনেরিফে ২-০ গোলে এগিয়ে গেলে রিয়ালের খেলোয়াড়দের মাথার ওপর যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। দ্বিতীয়ার্ধে মরিয়া হয়ে গোল শোধের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয় তারা। ম্যাচের ৮০ মিনিটে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন ইভান জামোরানো।
ছয় মিনিটের ইনজুরি সময় শেষে চূড়ান্ত বাঁশি বাজতেই ইতিহাসের নির্মমতম পুনরাবৃত্তি ঘটে। ২-০ গোলের পরাজয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে রিয়াল, আর ঘরের মাঠে ১-০ গোলে জিতে টানা তৃতীয়বারের মতো লা লিগা চ্যাম্পিয়ন হয় ইয়োহান ক্রুইফের স্বপ্নের বার্সেলোনা!
পরপর দুই মৌসুমে শেষ দিনে তেনেরিফেতে গিয়ে রিয়াল মাদ্রিদের শিরোপা হারানোর এই ঘটনা বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসের অন্যতম বড় অলৌকিক ঘটনা। এই দুই অঘটন ঘটিয়ে তেনেরিফে কেবল নিজেদের ইউরোপা লিগে (তৎকালীন ইউয়েফা কাপ) খেলার যোগ্যতাই অর্জন করেনি, বরং স্প্যানিশ ফুটবলের ইতিহাসের পাতায় চিরদিনের জন্য নিজেদের নাম খোদাই করে নিয়েছে।
পরবর্তীতে ১৯৯৪-৯৫ মৌসুমে হোর্হে ভালদানো নিজেই রিয়াল মাদ্রিদের ম্যানেজার হয়ে আসেন এবং তেনেরিফের অভিশাপ কাটিয়ে রিয়ালকে শিরোপা এনে দেন। ইয়োহান ক্রুইফও ১৯৯৬ সালে চারটি লা লিগা ও একটি ইউরোপিয়ান কাপ জিতে বিদায় নেন ন্যু ক্যাম্প থেকে।
তেনেরিফে ক্লাবটি হয়তো আজ স্পেনের দ্বিতীয় বিভাগে ধুঁকছে, তাদের ক্যাবিনেটে হয়তো ঝলমলে ট্রফির পাহাড় নেই। তবে নব্বইয়ের দশকের শুরুতে খেলাধুলার সেই রোমাঞ্চকর দিনগুলোতে তারা যা করে দেখিয়েছিল, তার জন্য একটি কথা প্রচলিত আছে—‘একজন তেনেরিফে সমর্থককে অন্তত বার্সেলোনা শহরে কখনো নিজের পকেটের টাকায় বিয়ার কিনে খেতে হবে না!’
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন