প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
মানুষের স্বভাব হলো ভুল করা। কখনো প্রবৃত্তির প্রভাবে, কখনো শয়তানের প্ররোচনায়, আবার কখনো অসতর্কতার কারণে মানুষ পাপের দিকে প্রবাহিত হয়। তবে পাপ হয়ে যাওয়ার মানে এই নয় যে আল্লাহর রহমতের দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। বরং, যখন বান্দা নিজের ভুল বুঝতে পেরে অনুতপ্ত হৃদয়ে আল্লাহর কাছে ফিরে আসে, তখন আল্লাহ তাকে ক্ষমা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ইসলামে এই ফিরে আসার প্রক্রিয়াকে তওবা বলা হয়।
তওবা মুখে ক্ষমা চাওয়ার একটি প্রক্রিয়া নয়; বরং এটি পাপ থেকে বিরত থাকা, নিজের ভুলের জন্য অনুতপ্ত হওয়া এবং ভবিষ্যতে পাপ থেকে দূরে থাকার দৃঢ় সংকল্প করার নাম। পবিত্র কুরআন ও হাদিসে তওবার গুরুত্ব, সঠিক পদ্ধতি এবং ক্ষমা প্রার্থনার বিভিন্ন দোয়া উল্লেখ করা হয়েছে। তাই প্রত্যেক মুসলমানের উচিত খাঁটি তওবার নিয়ম জানা এবং জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে ইস্তিগফার ও তওবার অভ্যাস গড়ে তোলা।
তওবা কী এবং কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
‘তওবা’ শব্দটি আরবি। এর শাব্দিক অর্থ হলো ফিরে আসা বা প্রত্যাবর্তন করা। ইসলামি পরিভাষায়, পাপের পথ পরিত্যাগ করে অনুতপ্ত হৃদয়ে মহান আল্লাহর আনুগত্যের পথে ফিরে আসাকে তওবা বলা হয়।
মানুষের জীবনে তওবার গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ, তওবার মাধ্যমে বান্দা নিজের পাপের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং তার নৈকট্য লাভের সুযোগ পায়। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে মুমিনদের খাঁটি তওবা করার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا تُوبُوا إِلَى اللَّهِ تَوْبَةً نَّصُوحًا
‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে খাঁটি তওবা কর।’ (সুরা আত-তাহরিম: আয়াত ৮)
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন—
إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ২২২)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, তওবা শুধু গুনাহ মাফের উপায় নয়; বরং এটি আল্লাহর ভালোবাসা অর্জনেরও মাধ্যম।
তাহলে, কোনো পাপ হয়ে গেলে হতাশ না হয়ে দ্রুত আল্লাহর কাছে ফিরে আসা উচিত। তওবা করার জন্য বার্ধক্য কিংবা জীবনের শেষ সময়ের অপেক্ষা করা উচিত নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِنَّ اللَّهَ يَقْبَلُ تَوْبَةَ الْعَبْدِ مَا لَمْ يُغَرْغِرْ
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তার বান্দার তওবা কবুল করেন, যতক্ষণ না তার প্রাণ কণ্ঠাগত হয়।’ (তিরমিজি ৩৫৩৭)
অর্থাৎ মৃত্যুর যন্ত্রণার শুরু হওয়ার আগে তওবা করতে হবে। তাই তওবাকে ভবিষ্যতের জন্য ফেলে না রেখে এখনই শুরু করা উচিত।
খাঁটি তওবার জন্য যেসব শর্ত পূরণ করতে হবে
তওবা কবুল হওয়ার জন্য শুধু মুখে ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলাই যথেষ্ট নয়। বরং তওবার সঙ্গে অন্তরের অনুশোচনা এবং বাস্তব জীবনে পরিবর্তনের অঙ্গীকার থাকতে হবে। ইসলামি শরিয়তের আলোকে খাঁটি তওবার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রয়েছে।
১. পাপের জন্য অনুতপ্ত হওয়া
অতীতে যে পাপ বা অন্যায় করা হয়েছে, তা স্মরণ করে অন্তরে লজ্জিত ও অনুতপ্ত হতে হবে। নিজের ভুলের জন্য আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাইতে হবে।
২. পাপ কাজ অবিলম্বে ছেড়ে দেওয়া
যে পাপের জন্য তওবা করা হচ্ছে, সেই পাপ থেকে সঙ্গে সঙ্গে বিরত হতে হবে। পাপের কাজ চালিয়ে গিয়ে শুধু মুখে ক্ষমা চাওয়া প্রকৃত তওবা নয়।
৩. ভবিষ্যতে পাপ না করার দৃঢ় সংকল্প করা
জীবনে আর কখনো ওই পাপের কাছে ফিরে না যাওয়ার বিষয়ে আন্তরিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তওবার সময় এই সংকল্প সত্য হতে হবে।
৪. মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া
কারও সম্পদ আত্মসাৎ, প্রতারণা, ঋণ পরিশোধে অন্যায় কিংবা কারও প্রতি জুলুম করে থাকলে যথাসম্ভব তার অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। প্রয়োজন হলে ক্ষমা চাইতে হবে। শুধু আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলেই বান্দার অধিকার আদায় হয়ে যায় না।
৫. পাপ পুনরায় হয়ে গেলে আবার তওবা করা
কেউ আন্তরিকভাবে তওবা করার পর দুর্বলতার কারণে আবার একই পাপে জড়িয়ে পড়লে হতাশ হওয়া যাবে না। নতুন করে অনুতপ্ত হয়ে তওবা করতে হবে। তবে তওবার সময় পাপ চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা রাখা যাবে না।
তওবা করার সুন্নতসম্মত পদ্ধতি
তওবা করার জন্য নির্দিষ্ট কোনো কঠিন আনুষ্ঠানিকতা নেই। যেকোনো সময়, যেকোনো অবস্থায় বান্দা আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে পারেন। তবে তওবার জন্য অজু করে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করা এবং এরপর ক্ষমা প্রার্থনা করা একটি উত্তম আমল। এ বিষয়ে হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَا مِنْ عَبْدٍ يُذْنِبُ ذَنْبًا فَيُحْسِنُ الطُّهُورَ، ثُمَّ يَقُومُ فَيُصَلِّي رَكْعَتَيْنِ، ثُمَّ يَسْتَغْفِرُ اللَّهَ، إِلَّا غَفَرَ اللَّهُ لَهُ
‘কোনো বান্দা গুনাহ করার পর উত্তমরূপে অজু করে, এরপর দুই রাকাত নামাজ আদায় করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন।’ (আবু দাউদ ১৫২১, তিরমিজি ৪০৬)
এই হাদিসের আলোকে তওবার জন্য দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করা যায়। তবে এ নামাজ তওবার অপরিহার্য শর্ত নয়। নামাজ পড়ার সুযোগ না থাকলেও আন্তরিকভাবে তওবা ও ইস্তিগফার করা যায়। তওবার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো অন্তরের অনুশোচনা, পাপ পরিত্যাগ এবং ভবিষ্যতে পাপ থেকে বেঁচে থাকার আন্তরিক সংকল্প।
তওবা ও ইস্তিগফারের গুরুত্বপূর্ণ দোয়া
রাসুলুল্লাহ (সা.) বিভিন্ন সময়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতেন। হাদিসে বর্ণিত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্তিগফারের দোয়া রয়েছে। সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য দুটি হলো—
দোয়া ১: মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনার বিশেষ দোয়া
أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ الْعَظِيمَ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ
উচ্চারণ: ‘আসতাগফিরুল্লাহাল আজিম আল্লাজি লা ইলাহা ইল্লা হুয়াল হাইয়্যুল কাইয়্যুমু ওয়া আতুবু ইলাইহি।’
অর্থ: আমি মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি, যিনি ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই। তিনি চিরঞ্জীব, চিরস্থায়ী ও সবকিছুর ধারক। আর আমি তার কাছেই তওবা করছি।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি এই দোয়া পড়বে, তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে, যদিও সে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন করে থাকে। (তিরমিজি ৩৫৭৭)
দোয়া ২: নিয়মিত পড়ার সহজ ইস্তিগফার
أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ
উচ্চারণ: ‘আসতাগফিরুল্লাহা ওয়া আতুবু ইলাইহি।’
অর্থ: আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং তার কাছেই তওবা করছি।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চেয়ে বেশি কাউকে এই দোয়া পড়তে দেখেননি। (ইবনে হিব্বান ৯২৮)
এই ছোট্ট দোয়াটি মুখস্থ করা সহজ। তাই চলাফেরা, কাজকর্ম কিংবা অবসর সময়ে বেশি বেশি পড়া যেতে পারে।
নবীজি (সা.) প্রতিদিন শতবার তওবা করতেন
তওবা ও ইস্তিগফারের গুরুত্ব বোঝার জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আমলই যথেষ্ট। তিনি নিষ্পাপ হওয়া সত্ত্বেও নিয়মিত আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতেন এবং উম্মতকেও তওবার নির্দেশ দিয়েছেন। হজরত আল-আঘার আল-মুযানি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
يَا أَيُّهَا النَّاسُ تُوبُوا إِلَى اللَّهِ فَإِنِّي أَتُوبُ فِي الْيَوْمِ إِلَيْهِ مِائَةَ مَرَّةٍ
‘হে মানবজাতি! তোমরা আল্লাহর কাছে তওবা করো। নিশ্চয়ই আমি দিনে তার কাছে একশবার তওবা করি।’ (মুসলিম ২৭০২)
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এই আমল থেকে বোঝা যায়, তওবা শুধু পাপী মানুষের জন্য নয়; বরং প্রত্যেক মুমিনের নিয়মিত আমল হওয়া উচিত। প্রতিদিনের জীবনে ইস্তিগফার ও তওবার অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন।
মানুষের জীবনে পাপের চেয়ে বড় বিপদ হলো পাপ করার পরও অনুতপ্ত না হওয়া এবং আল্লাহর কাছে ফিরে আসার চেষ্টা না করা। কারণ, শয়তান মানুষকে পাপে জড়ানোর পাশাপাশি আল্লাহর রহমত থেকেও নিরাশ করতে চায়। অথচ আল্লাহ তাআলা তার বান্দাদের জন্য তওবার দরজা খোলা রেখেছেন।
তাহলে, জীবনে যত ভুলই হয়ে থাকুক, কখনো আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া যাবে না। অতীতের পাপের জন্য অনুতপ্ত হতে হবে, অন্যায় কাজ পরিত্যাগ করতে হবে এবং ভবিষ্যতে পাপ থেকে বেঁচে থাকার দৃঢ় অঙ্গীকার করতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত ইস্তিগফার, নফল নামাজ ও নেক আমলের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করতে হবে।
মনে রাখতে হবে, তওবার জন্য নির্দিষ্ট বয়স কিংবা বিশেষ সময়ের প্রয়োজন নেই। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তই আল্লাহর কাছে ফিরে আসার সুযোগ। আজ যে মানুষটি আন্তরিকভাবে তওবা করছে, আল্লাহর রহমতে তার অতীতের পাপও ক্ষমা হয়ে যেতে পারে।
অতএব, তওবাকে আগামী দিনের জন্য ফেলে না রেখে আজ থেকেই শুরু করা উচিত। পাপের পথ ছেড়ে আল্লাহর পথে ফিরে আসা প্রয়োজন। কারণ, প্রকৃত সফলতা শুধু পাপমুক্ত জীবন গড়ার মধ্যে নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি নিয়ে তার কাছে ফিরে যাওয়ার মধ্যেই নিহিত।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন