প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
কক্সবাজার শহরের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কস্তুরাঘাট এলাকায় বাঁকখালী নদীর তীর ও নবনির্মিত কক্সবাজার-খুরুশকুল ব্রিজসংলগ্ন স্থান থেকে ময়লার ভাগাড় দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি শহরে আধুনিক ও পরিবেশসম্মত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালুর দাবিতে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এ মানববন্ধনটি কক্সবাজার পৌরসভা প্রাঙ্গণে ৩ নম্বর ওয়ার্ডের আট মহল্লা সমাজ কমিটির উদ্যোগে আয়োজন করা হয়। মানববন্ধনের পর জেলা প্রশাসক ও কক্সবাজার পৌরসভার প্রশাসকের কাছে পৃথক স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। একই সঙ্গে কক্সবাজার সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার প্রতিনিধির সঙ্গে মতবিনিময় করে শহরকে মাদকমুক্ত করার দাবি জানানো হয়।
মানববন্ধনের সভাপতিত্ব করেন আট মহল্লা সমাজ কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম। বক্তৃতা দেন সাবেক জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও কবি-ছড়াকার মো. নাছির উদ্দিন, কক্সবাজার দোকান মালিক সমিতি ফেডারেশনের সহসভাপতি ও পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন এবং আট মহল্লা সমাজ কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও কক্সবাজার জেলা জামায়াতের নেতা আমিনুল ইসলাম হাসান।
বক্তারা উল্লেখ করেন, বদর মোকাম মসজিদ রোড থেকে পূর্বে বড়বাজার জামে মসজিদ সড়ক, দক্ষিণে প্রধান সড়ক এবং উত্তরে বাঁকখালী নদী—এ সীমানা নিয়ে গঠিত ৩ নম্বর ওয়ার্ডটি শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকা। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে ময়লা-আবর্জনা, পানি সংকট, মাদক ও অপরাধসহ নানা নাগরিক সমস্যায় এ এলাকার বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।
মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেন, কস্তুরাঘাট ও খুরুশকুল ব্রিজসংলগ্ন বাঁকখালী নদীর তীরে দীর্ঘদিন ধরে শহরের বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। এর ফলে সেখানে বিশাল ময়লার স্তূপ তৈরি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বর্জ্য ফেলার কারণে নদীর তীর ও নদীর অংশবিশেষ ভরাটের পাশাপাশি পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, কস্তুরাঘাট এলাকায় ৪০ থেকে ৪৫ ফুট উঁচু বর্জ্যের স্তূপ গড়ে উঠেছে। সেখানে কয়েকটি পরিবারের বসতঘরও ময়লার স্তূপের মধ্যে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। পৌরসভার পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের বরাত অনুযায়ী, প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ ট্রাক বর্জ্য সেখানে ফেলা হয়।
পরিবেশবাদীদের হিসাব অনুযায়ী, কক্সবাজার শহরে প্রতিদিন ৯৭ টনের বেশি বর্জ্য উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে প্রায় ৭০ টন কস্তুরাঘাট এলাকায় ফেলার অভিযোগ রয়েছে। বছরের পর বছর বর্জ্য ফেলায় সেখানে ৪০ থেকে ৫০ ফুট উঁচু বর্জ্যের স্তূপ নয় পাহার তৈরি হয়েছে।
বক্তারা বলেন, পর্যটননগরীর প্রাণকেন্দ্রে এ ধরনের বর্জ্যের পাহাড় কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এতে একদিকে বাঁকখালী নদী দূষিত হচ্ছে, অন্যদিকে বর্জ্য পচে দুর্গন্ধ ছড়ানো, মশা-মাছি ও পোকামাকড়ের উপদ্রব এবং বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছে শহরের বাসিন্দারা।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, ময়লার ভাগাড়ের বিষাক্ত দুর্গন্ধ ও ধোঁয়ার কারণে ৩ নম্বর ওয়ার্ডের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। শিশু, নারী ও বয়স্করা শ্বাসকষ্ট, কাশি, চর্মরোগসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন। বর্জ্য থেকে নির্গত দূষিত তরল ও ময়লা পানি মাটিতে মিশে ভূগর্ভস্থ পানির মানও নষ্ট করছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
এলাকার ভূগর্ভস্থ পানি দূষিত, দুর্গন্ধযুক্ত ও লবণাক্ত হয়ে পড়ায় দীর্ঘদিন ধরে শত শত পরিবার পৌরসভার সরবরাহ করা পানির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু নিয়মিত পানি সরবরাহ না পাওয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে অনেক পরিবার দুর্ভোগে পড়েছে। কোথাও কোথাও বাধ্য হয়ে দূষিত ও লবণাক্ত পানি ব্যবহার করতে হচ্ছে বলে মানববন্ধনে অভিযোগ করা হয়।
এদিকে কক্সবাজার শহরের দীর্ঘদিনের বর্জ্য সংকট নিরসনে আধুনিক ও সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজলের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সদর উপজেলায় আধুনিক ও সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে স্থানীয় সরকার বিভাগকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে প্রকাশিত তথ্যে জানা গেছে। ৭ সেপ্টেম্বর জারি করা চিঠিতে প্রকল্পের অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানোর কথাও বলা হয়েছে।
প্রস্তাবিত এ ব্যবস্থায় বর্জ্য সংগ্রহ, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও চূড়ান্ত ব্যবস্থাপনায় আধুনিক পদ্ধতি চালুর কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে কক্সবাজার পৌরসভার আধুনিকায়ন ও নগরসেবা উন্নয়নের বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ডাম্পিং স্টেশন স্থাপনের বিষয়টিও রয়েছে।
কক্সবাজার পৌরসভার একটি সাম্প্রতিক উন্নয়ন পরিকল্পনায়ও ডাম্পিং স্টেশনসহ আধুনিক নগরসেবা উন্নয়নের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন আরবান রেজিলিয়েন্ট অ্যান্ড টেকনিক্যাল ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের (RUTDP) আওতায় ডাম্পিং স্টেশন, সড়ক-ফুটপাত, ড্রেন, পাবলিক টয়লেট, বাজার ও বাসটার্মিনালসহ বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকার দেশের যেসব পৌরসভায় এখনো আধুনিক ডাম্পিং ইয়ার্ড নেই, সেসব এলাকায় খাসজমি চিহ্নিত করে ডাম্পিং ইয়ার্ড নির্মাণের উদ্যোগও নিয়েছে। এ জন্য জেলা প্রশাসকদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
বক্তারা বলেন, শুধু বর্তমান ময়লার ভাগাড় অন্যত্র সরিয়ে নিলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। বর্জ্য পৃথকীকরণ, পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য আলাদা করা, জৈব বর্জ্য থেকে সার উৎপাদন, প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার এবং বর্জ্য পরিবহনের আধুনিক ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
তারা বলেন, কক্সবাজার পর্যটননির্ভর শহর। প্রতিদিন দেশ-বিদেশের বিপুলসংখ্যক পর্যটক এখানে আসেন। ফলে শহরের গুরুত্বপূর্ণ নদীতীর ও জনবসতিপূর্ণ এলাকায় ময়লার পাহাড় পর্যটননগরীর ভাবমূর্তির জন্যও মারাত্মক ক্ষতিকর।
বক্তারা আরও বলেন, শহরের বিভিন্ন এলাকায় ময়লার স্তূপ জমে থাকায় বর্ষাকালে ড্রেন ও নালা বন্ধ হয়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। তাই বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে শুধু পরিচ্ছন্নতার বিষয় হিসেবে না দেখে জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ, পর্যটন ও নগর পরিকল্পনার সমন্বিত বিষয় হিসেবে দেখতে হবে।
মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেন, ৩ নম্বর ওয়ার্ডটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকা হওয়ায় বিভিন্ন স্থান থেকে লোকজন এসে এখানে মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছে। এর ফলে সামাজিক শৃঙ্খলা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। চুরি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধও বেড়েছে বলে তারা দাবি করেন।
শহরের ময়লার ভাগাড়ের আশপাশে অপরাধপ্রবণতা রোধে নিয়মিত পুলিশি নজরদারি ও অভিযান জোরদারের দাবি জানানো হয়।
বক্তারা বলেন, এর আগেও কস্তুরাঘাটের ময়লার ডিপো সরানোর দাবিতে মানববন্ধন ও স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছিল। পৌরসভার মেয়র ও প্রশাসনের পক্ষ থেকেও ডিপো সরানোর আশ্বাস দেওয়া হলেও কার্যকরভাবে তা বাস্তবায়ন হয়নি।
তারা অবিলম্বে বাঁকখালী নদীর তীর থেকে ময়লার ভাগাড় সরিয়ে নির্ধারিত ও পরিবেশসম্মত স্থানে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র স্থাপনের দাবি জানান। একই সঙ্গে নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত, মাদক ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং বাঁকখালী নদীকে দূষণমুক্ত করার কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।
বক্তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, নভেম্বরের মধ্যে ময়লার ডিপো সরানোর দৃশ্যমান উদ্যোগ নেওয়া না হলে আরও বৃহত্তর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
পরে আট মহল্লা সমাজ কমিটির পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসক ও কক্সবাজার পৌরসভার প্রশাসকের কাছে পৃথক স্মারকলিপি দেওয়া হয়। বক্তারা জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে ওঠা কস্তুরাঘাটের ময়লার ভাগাড় দ্রুত অপসারণ এবং দীর্ঘমেয়াদি আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়নে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন