প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
মানিকগঞ্জের শিবালয়ের আরিচা বন্দর এলাকায় ময়লা ফেলার জন্য কোন নির্দিষ্ট ভাগার বা ডাম্পিং স্টেশন না থাকায় বাসা-বাড়ির ময়লা যত্রতত্র ফেলা হচ্ছে। বিশেষ করে রাস্তার পাশে এবং নদীর পাড়ে অসংখ্য ময়লার ভাগাড় গড়ে উঠেছে। প্রতিদিন আরিচা বন্দর এলাকায় বসবাসরত লোকজন রাতের অন্ধকারে মাছের বিসটাসহ ময়লা আবর্জনা ড্রেনের উপর ও বিভিন্ন রাস্তার পাশে, নদীর ধারে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনে ফেলে দিচ্ছে। এর ফলে মারাত্মক পরিবেশ দূষণ ও নানা ধরনের রোগের সৃষ্টি হচ্ছে।
ময়লার দুর্গন্ধ জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ডেঙ্গু, শ্বাস কষ্ট, নিউমোনিয়া, হাপানি সহ বিভিন্ন রোগের প্রকোপ বাড়ছে। এলাকাবাসীরা রাস্তার ধারে ময়লা না ফেলে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলার দাবি জানাচ্ছে। শিবালয় মডেল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাজী মোহাম্মদ আলাল উদ্দিন আলাল অচিরেই এর একটি সুরাহার আশ্বাস দিয়েছেন।
শিবালয় উপজেলার ৩ নং শিবালয় মডেল ইউনিয়ন পরিষদের ১নং ওয়ার্ডের অন্তর্গত আরিচা নদী বন্দর এলাকা। এখানে বিআইডব্লিউটিসি, বিআইডব্লিউটিএ, ড্রেজার বেইজ, শিবালয় থানা, আবহাওয়া অফিস, স্কুল, কলেজসহ নানা স্থাপনা গড়ে উঠেছে। আবাসিক চাহিদার সাথে সাথে বাসাবাড়ির সংখ্যা বেড়েছে এবং মানুষের বসবাসও বৃদ্ধি পেয়েছে। শিবালয় ১নং ওয়ার্ড বর্তমানে অত্যন্ত ঘণবসতিপূর্ণ এলাকা। এখানে ভোটার সংখ্যা ৬ হাজার এবং তিন হাজার পরিবারের ১২ হাজার লোক বসবাস করে। ১৯৬৩ সালে আরিচায় ফেরি সার্ভিস চালু হওয়ার পর ১৯৮৩ সালে আরিচা নদী বন্দর প্রতিষ্ঠা হয়। এরপর থেকে এখানে চাকুরির সুবাদে ও ব্যবসার উদ্দেশ্যে মানুষ বসতি স্থাপন করতে শুরু করে।
দুঃখজনকভাবে, অত্যন্ত ঘণবসতিপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে আরিচা বন্দর এলাকায় ময়লা ফেলার জন্য নির্দিষ্ট কোন ডাম্পিং স্টেশন বা ময়লার ভাগার গড়ে উঠেনি। ফলে আরিচা বেলায়েত হোসেন উচ্চ বিদ্যালয়ের পূর্ব পাশে, পোস্ট অফিস রোডের মোড়ে আজাদের বাড়ির সামনে এবং বন্দর বাজারের পশ্চিম পাশে যমুনা নদীর তীরে বাজার ঘেঁষে, ভূমি অফিসের সামনে ময়লার ভাগার গড়ে উঠেছে। এখানে প্রতিদিন বিভিন্ন বাসাবাড়ি, হোটেল ও দোকান পাটের নানা ধরনের বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। রাতের অন্ধকারে শিবালয় নতুন পাড়া ড্রেন কাম রাস্তার উপর যেখানে সেখানে বাসা-বাড়ির ময়লা আবর্জনা ফেলা হচ্ছে।
প্রতিদিনের কাজের তাগিদে এই রাস্তা দিয়ে ময়লার ভাগারের পাশ দিয়ে এলাকার লোকজনসহ আশপাশের বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের হাজারো মানুষ যাতায়াত করে। বিশেষ করে শিবালয় নতুন পাড়ায় যেখানে ময়লা ফেলা হচ্ছে, সেখানে মানুষের যাতায়াতের রাস্তা, একটি স্কুল ও একাধিক বাসাবাড়ি রয়েছে। পঁচা-ময়লা আবর্জনার দুর্গন্ধে এখানে যাতায়াত ও বসবাস করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ডেঙ্গুসহ নানা ধরনের রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে এখানকার মানুষ। ময়লার ভাগাড় থেকে ভেসে আসা উৎকট দুর্গন্ধে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটছে এবং জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়েছে। শিশু ও বৃদ্ধদের শ্বাসকষ্টসহ মশাবাহিত রোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, আরিচা বন্দর বাজারের অন্যতম প্রবেশপথ হচ্ছে পোস্ট অফিস রোড। এই রাস্তার পাশেই পচনশীল ও অপচনশীল নানা ধরনের বর্জ্য ফেলে ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। এখান থেকে আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে উৎকট দুর্গন্ধ। পথচারীরা এই দুর্গন্ধ থেকে বাঁচতে নাক-মুখে হাত চেপে ধরে দ্রুত ভাগাড়ের স্থান ত্যাগ করছেন। স্থানীয়রা এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
এছাড়া বন্দর বাজারের পশ্চিমে বাজার ঘেঁষে যমুনা নদীর তীরে ময়লা ফেলতে ফেলতে এখন ভাগারে পরিণত হয়েছে। মাংস ব্যবসায়ীর বা কসাইয়ের গরু জবায়ের বর্জ্য, বাজারের ব্যবসায়ীদের প্রতিদিনের বর্জ্য এবং বাসা-বাড়ির ময়লা-আবর্জনা নদীর পাড়ে নিয়ে ফেলা হচ্ছে। এতে ময়লার দুর্গন্ধে সেখানে চলাচল করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
আরিচা লঞ্চ ঘাটের পাশে নদীর তীরে ব্যবসায়ীরা দোকানপাটের ময়লা-আবর্জনা ফেলে ময়লার ভাগারে পরিণত করেছে। ময়লার দুর্গন্ধে দোকানপাটে বসে থাকা কষ্টকর হয়ে পড়েছে।
স্যালুন ব্যবসায়ী রিপন বলেন, "দিনের অধিকাংশ সময় ময়লার স্তুপ থেকে ভেসে আসা দুর্গন্ধে বসে থাকা অনেক কষ্টকর হয়ে যায়। অনেক সময় কাস্টমার চলে যান। ফলে কাস্টমার কমেছে, বাড়ছে আর্থিক ক্ষতি। এ একটা বিহীত করা দরকার।"
আরিচা বন্দরের ব্যবসায়ী তরুণ ভোজ বলেন, "পুরো বাজারের পঁচা-ময়লা আবর্জনা এখানে এনে ফেলে যায়। এতে পরিবেশ চরমভাবে দুষিত হচ্ছে। মশা-মাছির উপদ্রব বৃদ্ধি পেয়ে রোগ-জীবানুর সৃষ্টি হচ্ছে। হুমকির মুখে পড়েছে জনস্বাস্থ্য। বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন।"
প্রতিদিন পোস্ট অফিস রোড দিয়ে চলাচলকারী ঔষুধ ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, "আরিচা বন্দর বাজারের আশপাশে বসবাসকারীরা প্রতিদিন বিভিন্ন ময়লা-আবর্জনা রাস্তার ধারে ফেলে স্তূপ করায় দুর্গন্ধে বাজারে ঢোকার এই রাস্তাটি দিয়ে প্রবেশ করতে অনেক কষ্ট হয়ে পড়ে। এগুলো যেন দেখার কেউ নেই!"
আরিচা বেলায়েত হোসেন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আবুল হোসেন বলেন, "আরিচা বন্দর এলাকা অত্যন্ত জনগুরুত্বপূর্ণ এলাকা। এখানে একটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়সহ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এছাড়া অনেক লোকের বসবাস। কিন্তু ময়লা ফেলার নির্দিষ্ট কোন জায়গা না থাকাতে যত্রতত্র ফেলা হচ্ছে ময়লা। দুষিত হচ্ছে পরিবেশ। এতে জনস্বাস্থ্য চরম হুমকির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে স্কুলের পাশে ময়লা ফেলায় দুর্গন্ধে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীসহ অসংখ্য মানুষ স্কুলের পাশে গড়ে ওঠা ময়লার স্তুপের পাশ দিয়ে অনেক বিড়ম্বনা নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রত্যাশা, তারা সরকারি অন্য কোনো জায়গায় ময়লা নির্দিষ্ট ডাম্পিং স্টেশন নির্মাণ করে জনসাধারণসহ ছাত্র-ছাত্রীদের স্বস্তি ফিরিয়ে আনার দাবী জানান তিনি।"
মানিকগঞ্জ মেডিক্যাল কলেজের কার্ডিওলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন বলেন, "ময়লার দূষিত দুর্গন্ধে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, হাঁপানি, কাশি ও শ্বাসকষ্টসহ নানা ধরনের রোগ হয়ে থাকে। এ থেকে বেঁচে থাকতে হলে আমাদের প্রয়োজন নিয়মিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করা।"
এব্যাপারে ৩ নং শিবালয় মডেল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাজী মোহাম্মদ আলাল উদ্দিন আলাল বলেন, "ইউনিয়নের মধ্যে ১নং ওয়ার্ড আরিচা বন্দর এলাকায় মানুষের বসবাসের সংখ্যা বেশী। বিশেষ করে শিবালয় নতুন পাড়া অত্যন্ত ঘণবসতিপূর্ণ এলাকা। কিন্তু এখানে ময়লা ফেলার নির্ধারিত কোন জায়গা নেই। বিধায় মানুষ যত্রতত্র ময়লা ফেলে পরিবেশ দুষিত করছে। এতে মশা-মাছির উপদ্রব বৃদ্ধি পেয়ে স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়ছে। ইউনিয়ন পরিষদেরও ওই রকম সক্ষমতা নেই যে, ময়লা ফেলার জন্য একটি নির্দিষ্ট জায়গায় ভাগার বা ডাম্পিং স্টেশন বানিয়ে দেয়ার। তবে স্থানীয় এলাকারবাসির সহযোগিতা নিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সাথে কথা বলে উক্ত সমস্যার সমাধান করবেন বলে তিনি জানিয়েছেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন