প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
একটি জীবনের দীর্ঘ পথচলা। সেই পথের প্রতিটি বাঁকে জমে থাকে অভিজ্ঞতার গল্প, ত্যাগের স্মৃতি আর পরিবার-সমাজের জন্য রেখে যাওয়া নীরব অবদান। একসময় যাঁদের হাত ধরে সন্তানরা হাঁটতে শেখে, যাঁদের ঘাম ও মমতায় গড়ে ওঠে একটি পরিবার; সময়ের স্রোতে তাঁরাই একদিন বয়সের এই ভারে ধীর হয়ে আসেন। তবে বয়স তাঁদের অবদানকে ছোট করে না; বরং জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞাই হয়ে ওঠে পরবর্তী প্রজন্মের সবচেয়ে বড় সম্পদ।
এই মানবিক উপলব্ধিকে সামনে রেখে “দীর্ঘ জীবনের জন্য নতুন ভাবনা” এ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে কিশোরগঞ্জে পালিত হয়েছে ৩৬তম আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস। প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধা, সম্মান ও দায়িত্ববোধের বার্তা নিয়ে বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) সকালে জেলা প্রশাসন, জেলা সমাজসেবা কার্যালয় ও জেলা প্রবীণ হিতৈষী সংঘের উদ্যোগে বর্ণাঢ্য র্যালি ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সকাল ১০টায় জেলা সরকারি শিশু পরিবার (বালিকা) ও ডায়াবেটিক হাসপাতালের বিপরীত এলাকা থেকে র্যালিটি বের হয়ে শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়ে শেষ হয়। র্যালিতে প্রবীণ ব্যক্তি, সরকারি কর্মকর্তা, সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। র্যালি থেকে প্রবীণদের অধিকার, মর্যাদা, নিরাপত্তা ও সামাজিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।
পরে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে জেলা প্রবীণ হিতৈষী সংঘের সভাপতি অধ্যক্ষ (অব.) ডা. মো. আতাউল সারোয়ারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সোহানা নাসরিন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি প্রবীণদের পাশে প্রশাসনের থাকার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, ‘প্রবীণদের কল্যাণে সরকার বিভিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তবে প্রবীণদের প্রতি দায়িত্ববোধ কেবল রাষ্ট্র বা প্রশাসনের নয়; এর শুরু হতে হবে পরিবার থেকেই। ছোটবেলা থেকেই সন্তানদের শেখাতে হবে; বয়োজ্যেষ্ঠদের সঙ্গে কীভাবে সম্মানের সঙ্গে কথা বলতে হয়, কীভাবে তাঁদের প্রয়োজন ও অনুভূতিকে গুরুত্ব দিতে হয়।’
জেলা প্রশাসকের ভাষায়, কাউকে সম্মান করে সম্বোধন করাও এক ধরনের সামাজিক মূল্যবোধ ও মানবিক শিক্ষা। সেই শিক্ষা পরিবারে গড়ে উঠলে প্রবীণদের প্রতি অবহেলা অনেকটাই কমে আসবে এবং প্রজন্মের সঙ্গে প্রজন্মের সম্পর্ক আরও মানবিক হয়ে উঠবে।
তিনি আরও বলেন, ‘প্রবীণদের জন্য সমাজ, রাষ্ট্র ও প্রশাসন রয়েছে। তাই কোনো প্রবীণ নাগরিক নিজেকে কখনো একা ভাববেন না। সন্তানরা যথাযথভাবে দেখাশোনা না করলে প্রবীণরা সরাসরি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের পাশে দাঁড়ানোর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
জেলা প্রশাসকের এই বক্তব্যে যেন উঠে আসে বয়সের ভারে নত হয়ে পড়া মানুষগুলোর প্রতি রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের এক মানবিক অঙ্গীকার। পরিবারে অবহেলার শিকার কোনো প্রবীণকে একা পড়ে থাকতে হবে না; প্রশাসন তার পাশে দাঁড়াবে, এমন আশ্বাস দেন তিনি।
প্রবীণদের দৈনন্দিন সেবার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরে জেলা প্রশাসক বলেন, কিশোরগঞ্জ জেলার ব্যাংকগুলোতে প্রবীণদের জন্য পৃথক ও অগ্রাধিকারভিত্তিক সেবা চালুর বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবায় ইনডোর ও আউটডোরে পৃথকভাবে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবা নিয়েও আশার কথা শোনান জেলা প্রশাসক। তিনি বলেন, প্রবীণদের জন্য হেলথ কার্ড চালুর বিষয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা হচ্ছে। তবে প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার চিন্তা সরকার অনেক আগেই গ্রহণ করেছে এবং সে অনুযায়ী কাজও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
তিনি প্রবীণদের জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানকে সমাজের সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, একটি সমাজ কতটা মানবিক, তা শুধু তার উন্নয়ন কিংবা অবকাঠামো দিয়ে নয়; সেই সমাজ তার প্রবীণ মানুষদের কতটা সম্মান, নিরাপত্তা ও মর্যাদা দিতে পারে, তার মধ্য দিয়েও প্রকাশ পায়।
আলোচনা সভায় জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন, অর্থ ও প্রতিষ্ঠান) মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান স্বাগত বক্তব্য দেন। আরও বক্তব্য রাখেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. ইশতিয়াক ইমন, সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মেডিকেল অফিসার ডা. প্রল্লব কুমার দেবনাথ, জেলা প্রবীণ হিতৈষী সংঘের সাধারণ সম্পাদক মো. ফিরোজ উদ্দীন ভূঞা, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাজী মেহের উদ্দিন, নির্বাহী সদস্য এস এম হাফিজুর রহমান, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ কিশোরগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আতিয়া রহমান এবং প্রফেসর আব্দুল গণি।
বক্তারা বলেন, প্রবীণরা কোনোভাবেই পরিবার বা সমাজের বোঝা নন। তাঁদের দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান, মূল্যবোধ ও ত্যাগ পরবর্তী প্রজন্মের জন্য অমূল্য সম্পদ। তাই তাঁদের প্রতি সহানুভূতির চেয়ে বেশি প্রয়োজন সম্মান, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করা। এ জন্য পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
দিবসটির আয়োজন যেন শেষ পর্যন্ত একটি সহজ অথচ গভীর সত্যই মনে করিয়ে দিল; বয়স মানুষের জীবনের একটি সংখ্যা মাত্র, মর্যাদার মাপকাঠি নয়। যে হাত একদিন সন্তানকে ধরে হাঁটতে শিখিয়েছে, যে মানুষটি নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে পরিবারকে দাঁড় করিয়েছেন, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সেই মানুষটির হাত শক্ত করে ধরে রাখাই একটি মানবিক সমাজের পরিচয়।
সভায় জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রতিনিধি, প্রবীণ ব্যক্তি, সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন