প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো টেলিভিশন চ্যানেল চালু করলে এখন মূলত তিন ধরনের বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে। প্রথমটি হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের ফাস্ট ফুড বা মুখরোচক খাবারের, দ্বিতীয়টি হলো ভয়ানক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াযুক্ত স্বাস্থ্যসেবা পণ্যের, আর তৃতীয় প্রকারের বিজ্ঞাপন কেবল ডেভিড বেকহ্যামের।
চলতি ফুটবল বিশ্বকাপের সময়ে আমেরিকার আকাশ-বাতাস যেন এখন সম্পূর্ণ বেকহ্যামময় হয়ে গেছে। মাঠে না নেমেও, ৫২ বছর বয়সী সাবেক ইংলিশ মিডফিল্ডার এই বিশ্বকাপে একক ব্যক্তি হিসেবে সবচেয়ে বেশি আয় করতে চলেছেন।
বিশ্বকাপের শেষভাগের রোমাঞ্চ যখন তুঙ্গে, তখন মাঠের বাইরে বেকহ্যাম একটি অনন্য রূপকথা সৃষ্টি করছেন। এবারের টুর্নামেন্ট থেকে বিজ্ঞাপন ও অন্যান্য চুক্তি মিলিয়ে তাঁর সম্ভাব্য আয় প্রায় আড়াই কোটি মার্কিন ডলার ছুঁতে চলেছে। যুক্তরাজ্যের মানুষ হয়তো পরিপূর্ণভাবে বোঝতে পারছে না যে, আমেরিকার বিনোদন ও বাণিজ্য অর্থনীতিতে বেকহ্যামের প্রভাব কতটা ব্যাপক। পপ সম্রাট অ্যান্ডি ওয়ারহল একবার বলেছিলেন, ‘অর্থ উপার্জন করা একটি শিল্প।’ বেকহ্যাম যেন সেই শিল্পকেই বাস্তবে রূপ দিয়েই নিজেকে একটি আস্ত ‘বিজ্ঞাপন মেশিনে’ পরিণত করেছেন।
স্টেডিয়ামের বড় পর্দা থেকে টেলিভিশনের বিজ্ঞাপন; সব জায়গাতেই তাঁর উপস্থিতি দেখা যায়। কখনো তিনি চিপস খাচ্ছেন, কখনো গাড়ি চালাচ্ছেন, আবার কখনো কোনো দামি ঘড়ির বিজ্ঞাপনে হাসছেন। ফোর্বস সাময়িকী সতর্ক করে বলেছে, বেকহ্যামের জনপ্রিয়তা বর্তমানে প্রায় অতি-সম্পৃক্ততার পর্যায়ে পৌঁছেছে।
আমেরিকায় ব্রিটিশ তারকাদের সফল হওয়ার ইতিহাস নতুন নয়। তবে বেকহ্যাম দ্য বিটলস-এর মতো গান গেয়ে বা জে কে রাউলিংয়ের মতো বই লিখে তাঁকে রাজত্ব করছেন না। ফুটবলার হিসেবে তাঁর মাঠের দক্ষতা অনবদ্য হলেও আমেরিকাবাসী তাঁর সেই নিখুঁত ফ্রি-কিক বা কর্নারের জাদুকে স্মরণ করতে পারেনি। তিনি সফল হয়েছেন নিছক ‘বিখ্যাত হওয়ার অসাধারণ যোগ্যতা’ দিয়ে।
সম্প্রতি তিনি লস অ্যাঞ্জেলেসে অভিনেতা টম ক্রুজের পাশে দাঁড়িয়ে হলিউড ওয়াক অব ফেমে নিজের তারকা উন্মোচন করেছেন। আমেরিকার রাজনৈতিক বিভাজন, হট্টগোল ও চিৎকার-চেঁচামেচিতে ভরা জনজীবনে বেকহ্যাম যেন এক শান্ত, মার্জিত ও নির্ভরতার প্রতীক। তিনি যেন আমেরিকার সেই কাঙ্ক্ষিত অভিভাবক, যার কাছ থেকে সবাই একটু প্রশংসা বা স্বীকৃতি চান।
বেকহ্যামের এই আমেরিকান সাম্রাজ্যের গড়ে ওঠার পিছনে কেবল গ্ল্যামার নয়, তার সুদূরপ্রসারী ব্যবসায়িক বুদ্ধি কাজ করেছে। মার্কিন মুলুকে তাঁর দৃঢ় ভিত তৈরি হয়েছে ‘ইন্টার মিয়ামি’ ফ্র্যাঞ্চাইজির সহ-মালিকানা অর্জনের মাধ্যমে। আর এই যাত্রায় তাঁর চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছেন কিউবান-আমেরিকান ধনকুবের মাস ভ্রাতৃদ্বয়—হোর্হে ও হোসে মাস সান্তোস। তাঁদের বাবা হোর্হে মাস সিনিয়র কিউবার ফিদেল কাস্ত্রো বিরোধী আন্দোলনের এক প্রভাবশালী, সশস্ত্র ও আপসহীন ব্যক্তিত্ব ছিলেন। ম্যামির রাজনীতি ও প্রশাসনে ক্ষমতাধর এই মাস পরিবারের সাক্ষাত পেয়ে ফুটবলকে ব্যবসার মোক্ষম হাতিয়ারে পরিণত করেছেন বেকহ্যাম। বর্তমানে ইন্টার মিয়ামি ক্লাবের বাজারমূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৫০ কোটি মার্কিন ডলারে, যার নতুন স্টেডিয়াম ‘ফ্রিডম পার্ক এরিনা’ এখন উদ্বোধনের অপেক্ষায়।
তবে, বেকহ্যামের এই বাণিজ্যিক সাফল্যের ঘটনার পিছনে ২০২৩ সালে আসা লিওনেল মেসির নামও আসে। মেসি ইন্টার মিয়ামিতে যোগ দেওয়ার ফলে, বেকহ্যামের বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য এক টানে বহু গুণ বেড়ে গেছে। এখন মিয়ামির উইনউড এলাকায় মেসির বিশাল এক ম্যুরাল রয়েছে যা পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ হয়ে উঠেছে, এবং এর একটি অংশে বেকহ্যাম নিজে ক্রেনে চড়ে রঙ করেছিলেন। মেসির জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে ইন্টার মিয়ামির জার্সি বর্তমানে বিশ্বের চতুর্থ সর্বোচ্চ বিক্রিত ফুটবল জার্সিতে পরিণত হয়েছে।
এখন চলতি বিশ্বকাপে মিয়ামিতে যখন ইংল্যান্ড ও নরওয়ের মধ্যকার একটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ অনুষ্ঠিত হতে চলেছে, তখন নেপথ্যের আসল নায়ক হিসেবে আলোকে কেড়ে নিয়ে যাচ্ছেন বেকহ্যামই। দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে নিজের ব্র্যান্ডকে গড়ে তোলা আজ সফলতার চূড়ায় এসে পৌঁছেছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন