প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় শহর লাহোরে গত ১৩ বছর ধরে তিন চাকার মোটরচালিত রিকশা চালিয়ে আসছেন রশিদ আলী। তার কর্মদিবস শুরু হয় প্রতিদিন ভোর ৬টায়। কখনো কখনো কাজ করতে করতে মধ্যরাতও পেরিয়ে যায়।
এত দীর্ঘ সময় কাজ করার পর তিনি আগে দিনে প্রায় ৬ ডলার ৫০ সেন্ট আয় করতে পারতেন। এই আয় দিয়ে পরিবারের ন্যূনতম প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হতো। কিন্তু সম্প্রতি তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ায় তার আয় কমে গেছে। এখন দিনভর কাজ করেও আগের আয়ের অর্ধেকও ঘরে তুলতে পারছেন না তিনি।
৩৩ বছর বয়সী রশিদ আলী পাকিস্তানের হাজারো চালকের একজন, যারা যানবাহন চালাতে এলপিজি ব্যবহার করেন। এলপিজি সাধারণত সিলিন্ডারে বিক্রি হয় এবং মূলত রান্না ও ঘর গরম করার কাজে ব্যবহৃত হয়। আওয়ামী রিকশা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মজিদ ঘৌরি এলপিজিকে ‘গরিবের জ্বালানি’ বলে অভিহিত করেছেন।
তিনি জানান, তাদের সংগঠনের সদস্যদের প্রায় ৪৩ হাজার অটোরিকশা এবং ৮ হাজারের মতো ‘চিংকি’ রয়েছে। চিংকি হলো মোটরসাইকেলচালিত তিন চাকার যান, যা নির্দিষ্ট রুটে যাত্রী পরিবহন করে। এসব যানবাহনের প্রায় ৭০ শতাংশ এলপিজি দিয়ে চলে।
ব্যবসায়ীরা জানান, গত ১৭ অক্টোবর থেকে এলপিজির দাম ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ওই দিন ইরান সীমান্তের দুটি পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গ্যাস আমদানি কার্যক্রম ব্যাহত হয়। গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা শুরুর পর এটিই দেশটির সর্বশেষ জ্বালানি সংকট।
এলপিজির দাম বেড়ে যাওয়ায় রশিদ আলীর দৈনিক আয় কমে সর্বোচ্চ ৩ ডলারে নেমে এসেছে। এতে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে তার পরিবার। এমনকি খাবারের পরিমাণও কমাতে হয়েছে। এখন তারা দিনে মাত্র দুই বেলা খাবার খান।
আলী বলেন, ‘আগে এলপিজির দাম কম থাকলে মোটামুটি ভালো আয় করতে পারতাম। এখন ৭০০ থেকে ৮০০ রুপি দিয়ে কি আর সংসার চালানো সম্ভব?’
পাকিস্তান এলপিজি অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, সীমান্ত বন্ধ হওয়ার আগে প্রতিদিন ইরান থেকে প্রায় ৭ হাজার মেট্রিক টন এলপিজি আমদানি করত পাকিস্তান। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, সীমান্ত বন্ধ হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই ১২ কেজির একটি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ৫৬ শতাংশ বেড়ে ৭ হাজার পাকিস্তানি রুপিতে পৌঁছেছে। অর্থাৎ খোলা বাজারে প্রতি কেজি এলপিজির দাম দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৮৩ রুপি।
ইরানের সীমান্তবর্তী পাকিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশ বেলুচিস্তান সরকার সীমান্ত বন্ধের সিদ্ধান্তের পেছনে নিরাপত্তা ও চোরাচালানের বিষয়টি উল্লেখ করেছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এর জন্য কারিগরি সমস্যাকে দায়ী করেছে।
পরে ইরানের রাষ্ট্রদূত জানান, এলপিজি রপ্তানিসহ কোনো বিষয়েই ইরান নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেনি। বরং পাকিস্তানের আমদানি-সংক্রান্ত নথিপত্রে পরিবর্তন আনার কারণেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। রশিদ আলী প্রতিদিন রিকশা ভাড়া বাবদ ৬০০ রুপি দেন। এ ছাড়া দিনে চার থেকে পাঁচবার তাকে গ্যাস কিনতে হয়। প্রতিবার গ্যাস নিতে খরচ হয় ৩০০ থেকে ৪০০ রুপি।
দৈনন্দিন এসব খরচের পাশাপাশি প্রতি মাসে ১১ হাজার রুপি বাড়িভাড়া দিতে হয় তাকে। এ ছাড়া দুই ছোট সন্তানের ভরণপোষণের দায়িত্বও তার কাঁধে। ফলে এলপিজির দাম বেড়ে যাওয়ায় সংসারের খরচ চালাতে চরম সংকটে পড়েছেন।
রশিদ আলীর সংকট আরো বাড়িয়েছে যাত্রীদের বেশি ভাড়া দিতে না চাওয়ার প্রবণতা। জ্বালানির দাম বাড়লেও যাত্রীরা আগের ভাড়াই দিতে চান। ফলে বাড়তি খরচের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন চালকেরা।
আলী বলেন, ‘যে দূরত্বের জন্য ২০০ বা ২৫০ রুপি ভাড়া নেওয়া উচিত, যাত্রীরা সেখানে ৮০, ১০০ কিংবা ১৫০ রুপি দিতে চান।’ যাত্রী মোহাম্মদ রমজান জানান, শহরের ভেতরে যাতায়াতের জন্য এক চালক তার কাছে ৫০০ রুপি ভাড়া চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি এর অর্ধেক দিতে চেয়েছিলেন। চালক তাতে রাজি না হওয়ায় তিনি সেখান থেকে চলে যান।
এদিকে পাকিস্তানে গত অক্টোবরে মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে ৯ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছে। জ্বালানি ও গমের দাম বাড়ার বিষয়টি উল্লেখ করে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত সপ্তাহে সুদের হার বাড়িয়ে ১২ শতাংশ করেছে।
গত ৩ এপ্রিল পাকিস্তানে পেট্রোলের দাম রেকর্ড ৪৫৮ রুপি প্রতি লিটারে পৌঁছায়। যুদ্ধ শুরুর আগের সময়ের তুলনায় দাম এখনো প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি। দুপুরে বাড়ি ফিরে আলী জানান, তার দুই ছেলের দুপুরের খাবার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সংসারের টানাপোড়েনে তাদের খাবারের ব্যবস্থা করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
তাই রাতে আবার রিকশা নিয়ে বের হবেন তিনি। গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করে যদি কিছু বাড়তি আয় করা যায়, সেই আশায়। তার আশা, অন্তত রাতে ফেরার সময় দুই সন্তানের জন্য কিছু খাবার কিনে নিয়ে যেতে পারবেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন