প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
রংপুরের পীরগঞ্জে কৃষকরা আখ চাষে আগ্রহ হারাতে শুরু করেছেন। গত কয়েক বছরে লাভের অভাবে অনেক কৃষক এই চাষ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। চিনিকল কর্তৃপক্ষের গড়িমসি এবং উৎপাদিত আখ সময়মতো বিক্রি করতে না পারার কারণে চাষিদের মধ্যে আখ চাষ নিয়ে এক ধরনের তিক্ততা সৃষ্টি হয়েছে। একসময় উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক আকারে আখ চাষ হলেও বর্তমানে তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। তবে পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। বর্তমানে চিনি ও গুড়ের বাজার ভালো থাকায় কৃষকরা আবারও আখ চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। বিশেষ করে অধিকাংশ চাষি আখ থেকে গুড় উৎপাদনের দিকে ঝুঁকছেন।
শনিবার (৭ নভেম্বর) সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলার বড় আলমপুর, কুমেদপুর, ভেন্ডাবাড়ী, টুকুরিয়া, চৈত্রকোল, চতরা, কাবিলপুর, রামনাথপুর, রায়পুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় একসময় ব্যাপকভাবে আখ চাষ হতো। এসব এলাকার অনেক কৃষক আখ চাষের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। কিন্তু রংপুর চিনিকলের আওতাধীন মহিমাগঞ্জ চিনিকল কর্তৃপক্ষের আখ ক্রয় নিয়ে নানা অনিয়ম ও গড়িমসির অভিযোগে কৃষকরা ধীরে ধীরে আখ চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করেন।
চাষিদের অভিযোগ, জমিতে আখ উৎপাদনের পর তা চিনিকলে বিক্রি করতে নানা সমস্যার মুখে পড়তে হতো। সময়মতো আখ বিক্রি করতে না পারায় জমিতেই পড়ে থাকত উৎপাদিত আখ। এতে একদিকে উৎপাদন খরচ বাড়ত, অন্যদিকে আখের গুণগত মানও নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকত। ফলে কাঙ্ক্ষিত দাম না পেয়ে লোকসান গুনতে হতো কৃষকদের। এ কারণে অন্যান্য ফসলের তুলনায় আখ চাষে লাভ কম হওয়ায় অনেকেই বিকল্প ফসলের দিকে ঝুঁকেছেন।
উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, একসময় পীরগঞ্জ উপজেলায় প্রায় ১৪ হাজার হেক্টর জমিতে ইক্ষু বা আখ চাষ করা হতো। বর্তমানে তা কমে মাত্র ২৫০ হেক্টরে দাঁড়িয়েছে। একসময়ের আখ চাষের বিস্তৃত এলাকা এখন অনেকটাই সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে গুড়ের বাজার ভালো থাকায় কৃষকরা আখ চাষে নতুন সম্ভাবনা দেখছেন। চাষিরা জানান, নিজেদের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বাড়তি আয়ের আশায় অনেকে আখ চাষ করছেন। কেউ কেউ নিজেরা গুড় তৈরি না করে সরাসরি গুড় তৈরির কারখানার মালিকদের কাছে আখ বিক্রি করছেন। এ ক্ষেত্রে প্রতি মণ আখ ২৫০ টাকা দরে বিক্রির তথ্য জানিয়েছেন চাষিরা। অন্যদিকে আখ মৌসুমে পীরগঞ্জের আখের একটি বড় অংশ নবাবগঞ্জ এলাকার গুড় ব্যবসায়ীরা নগদ টাকায় কিনে নিয়ে যান।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পীরগঞ্জ উপজেলায় প্রায় সাতটি গুড় তৈরির কারখানা রয়েছে। এসব কারখানায় ক্রাশার মেশিনের সাহায্যে আখ মাড়াই করে গুড় তৈরি করা হচ্ছে। ফলে চিনিকলে আখ সরবরাহের পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে গুড় উৎপাদন ও বিক্রির সুযোগ তৈরি হয়েছে। অনেক কৃষক নিজেরাই আখ মাড়াই করে গুড় তৈরি করছেন। পরে বাজারদর ভালো পাওয়ার আশায় সেই গুড় সংরক্ষণ করে রাখছেন।
তাতালপুর গ্রামের আখচাষি দেলোয়ার হোসেন বলেন, গত কয়েক বছর ধরে ইক্ষু বা আখ চাষ নিয়ে কৃষকদের মধ্যে তিক্ততা বিরাজ করছে। অন্যান্য ফসলের সঙ্গে তুলনা করলে আখ চাষে অনেক সময় লোকসান গুনতে হয়েছে। তবে বর্তমানে গুড়ের বাজার ভালো। গুড় উৎপাদনের কারখানার মালিকরা জমি থেকেই নগদ টাকায় আখ কিনছেন। এতে কৃষকরা আগের তুলনায় স্বস্তি পাচ্ছেন।
তিনি আরও বলেন, অনেক কৃষকের নিজস্ব গুড় তৈরির মাড়াই মেশিন রয়েছে। তারা নিজেদের উৎপাদিত আখ মাড়াই করে গুড় তৈরি করছেন এবং পরবর্তী সময়ে বিক্রির জন্য তা মজুত রাখছেন। সব মিলিয়ে বর্তমানে আখ থেকে গুড় উৎপাদন করে কৃষকরা লাভের আশা করছেন।
খালাশপীর এলাকার কৃষক জাকির হোসেন বলেন, লোকসানের দিন শেষ। কৃষক এখন যে ফসলে বেশি লাভ পান, সেই ফসল চাষেই ঝাঁপিয়ে পড়েন। বর্তমানে গুড়ের বাজার ভালো থাকায় অনেক কৃষক নিজেদের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বাড়তি আয়ের আশায় গুড় উৎপাদনের জন্য আখ চাষ করছেন।
কৃষকদের মতে, চিনিকলে আখ বিক্রির অনিশ্চয়তা থাকলেও গুড় উৎপাদন ও সরাসরি বাজারজাত করার সুযোগ থাকায় আখ চাষে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে এ সম্ভাবনা ধরে রাখতে হলে আখের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, উৎপাদিত আখ সময়মতো বিক্রির ব্যবস্থা করা এবং গুড় উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে কৃষকদের সহযোগিতা করা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর উদ্যোগ নিলে পীরগঞ্জে আবারও আখ চাষের পরিধি বাড়তে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয় চাষিরা।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন