প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
তহবিলের সংকোচন ও ক্রমবর্ধমান চাপের কারণে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ মানবিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এতে সহায়তা অনুদানের পরিমাণ কমে আসার পাশাপাশি হাজার হাজার ত্রাণকর্মী চাকরি হারিয়েছেন। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) মানবিক সাহায্য ও ত্রাণ কার্যক্রমের কার্যকারিতা মূল্যায়নকারী গবেষণা প্রতিবেদনের প্রকাশিত প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, সরকারগুলো কেবল বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষায় ব্যর্থ হচ্ছে না, বরং তাদের বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়ার জন্যও ক্রমশ দায়ী হয়ে উঠছে।
পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত বছর ৬ কোটি ৪০ লাখ (৬৪ মিলিয়ন) কম মানুষ সহায়তা পেয়েছে। ‘স্টেট অফ দ্য হিউম্যানিটারিয়ান সিস্টেম ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সহায়তা অনুদান ৩০ শতাংশ কমেছে এবং হাজার হাজার ত্রাণকর্মী চাকরি হারিয়েছেন। এর ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে গঠিত হওয়ার পর থেকে মানবিক সহায়তা ব্যবস্থাটি তার ইতিহাসের অন্যতম বড় সংকোচনের মুখে পড়েছে।
২০২৫ সালে কেবল তাৎক্ষণিক জীবন-ঝুঁকির মুখে থাকা মানুষদের সহায়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে; অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা মোকাবিলা এবং সংকট থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা বৃদ্ধির কার্যক্রম ব্যাপকভাবে সংকুচিত করা হয়েছে।
ডোহার্টি জানান, ধারণা করা হচ্ছে ২০২৫ সালে মানবিক সহায়তা খাতে কর্মরত জনবলের ২৩ শতাংশ পর্যন্ত ছাঁটাই হয়েছে। তিনি আরও বলেন, বিশেষায়িত সেবা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে এবং সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
সবচেয়ে বড় আকারের বাজেট ছাঁটাই করেছে ইউএসএইড, যারা ২০২৫ সালে তাদের সহায়তা তহবিল ৫৫ শতাংশ কমিয়েছে। তবে অন্যান্য শীর্ষ দাতা সংস্থাও সহায়তা কমিয়েছে; শীর্ষ ২০টি দাতা সংস্থার মধ্যে ১৩টিই গত বছর তাদের অনুদান হ্রাস করেছে। প্রতিবেদনে সহায়তা ব্যয়ের ক্ষেত্রে সরকারগুলোর ক্রমবর্ধমান চাপের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, বৈচিত্র্য, সমতা ও অন্তর্ভুক্তি নীতির ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত কর্মসূচিগুলোর জন্য অর্থ বরাদ্দ স্থগিত করার মতো মার্কিন পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
সহায়তা তহবিল হ্রাসের ফলে যারা সহায়তা পেয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে মাথাপিছু সহায়তার পরিমাণ ২০২১ সালের ১৭৮ ডলার থেকে কমে ২০২৫ সালে ৯০ ডলারে নেমে এসেছে। অথচ বাস্তবে মাথাপিছু প্রয়োজনীয় সহায়তার পরিমাণ বেড়ে ২৫৫ ডলারে দাঁড়িয়েছিল। পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলার একটি কারণ ছিল, সরকারগুলো কেবল বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষার দায়িত্ব পালনেই ব্যর্থ হয়নি, বরং প্রায়শই তারা মানুষকে প্রকৃত অর্থেই বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে। স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর চালানো আক্রমণের ৬৪ শতাংশের জন্যই রাষ্ট্রগুলো দায়ী ছিল।
এছাড়া বিমান হামলার মাধ্যমে ত্রাণকর্মীদের ওপর যে সহিংসতা চালানো হয়েছে, তার জন্যও অনেকাংশে তারাই দায়ী ছিল। ইয়েমেন ছিল সহায়তা বা ত্রাণ বরাদ্দ হ্রাসের ফলে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। সেখানে পুষ্টি পরিস্থিতির অবনতি ঘটে এবং টিকাদান কর্মসূচি স্থগিত থাকায় ডিপথেরিয়া রোগীর সংখ্যা বেড়ে যায়।
ইয়েমেনে ‘অ্যাকশন ফর হিউম্যানিটি’-র কান্ট্রি ডিরেক্টর মোহাম্মদ বাহাশওয়ান বলেন, সহায়তার পরিমাণ কমে যাওয়ায় পরিবারগুলোর সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। তিনি বলেন, সমস্যাগুলো বিচ্ছিন্নভাবে আসে না। এমন হতে পারে, কোনো পরিবার তাদের আয়ের উৎস হারিয়েছে, খাবারের সংস্থান করতে পারছে না, তাদের কোনো শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে। অথচ স্বাস্থ্যসেবা পেতে তাদের অনেক দূর যেতে হচ্ছে কিংবা এমন খরচ বহন করতে হচ্ছে যা তাদের সাধ্যের বাইরে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সবচেয়ে অসহায় মানুষদের সহায়তায় মানবিক সহায়তা কার্যক্রম জোরদার করার নজির রয়েছে যার নেতৃত্বে প্রায়শই স্থানীয় সহায়তা সংস্থা ও প্রবাসীদের বিভিন্ন নেটওয়ার্ক ভূমিকা রেখেছে। তবে এতে আরও বলা হয়, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা এই নেটওয়ার্কগুলোর সাথে যথাযথ সমন্বয় করেনি এবং সহায়তা বরাদ্দ হ্রাসের ফলে স্থানীয় সহায়তা সংস্থা ও কর্মীরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
ভিয়েনাভিত্তিক সংস্থা ‘গ্রাউন্ড ট্রুথ সল্যুশনস’-এর প্রধান নির্বাহী মেগ স্যাটলার সহায়তা প্রয়োজনীয় মানুষের ওপর নিয়মিত জরিপ পরিচালনা করে। তিনি বলেন, স্থানীয়করণের ওপর আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কারণ, আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা ব্যবস্থা পরিস্থিতির সাথে দ্রুত মানিয়ে নিতে পারেনি কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া বাজেট সংকোচন ও শর্তাবলির বিরুদ্ধে জোরালো অবস্থান নেয়নি।
তিনি বলেন, আমরা নিশ্চিতভাবেই এমন মানুষের সাথে কথা বলেছি যারা সহায়তার এই সংকোচন বা কাটছাঁটের প্রভাব সরাসরি অনুভব করছেন। এটি বিশেষ করে তাদের জন্য চরম দুর্ভোগ বয়ে আনছে যাদের ক্ষেত্রে সহায়তাকে এখন কেবল ‘জীবন রক্ষাকারী’ হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। এর ফলে তারা সন্তানদের স্কুলে পাঠানো বা ব্যবসা শুরুর জন্য সঞ্চয় করার মতো কাজগুলো করতে পারছেন না। অথচ এই কাজগুলোই ভবিষ্যতে তাদের সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে সাহায্য করত।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন