প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
সুন্দরবনে দস্যু বাহিনীর আত্মসমর্পণের পরেও দস্যু তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। ফের জেলে অপহরণের ঘটনা ঘটায় সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূলীয় এলাকায় নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। মাত্র দুই দিনের মধ্যে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকা থেকে অন্তত ২১ জেলেকে অস্ত্রের মুখে অপহরণের অভিযোগ উঠেছে। অপহরণের চার দিন পেরিয়ে গেলেও তাঁদের উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। অপহৃত জেলেদের অবস্থান ও পরিস্থিতি সম্পর্কে কোনো তথ্য নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ফলে উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন অপহৃত জেলেদের পরিবার ও মহাজনরা। অন্যদিকে, নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন সুন্দরবনে মাছ ধরতে যাওয়া অন্যান্য জেলেরা।
স্থানীয় জেলেদের এবং বন বিভাগের সূত্রে জানা যায়, গত শুক্রবার ও শনিবার (২৫ ও ২৬ সেপ্টেম্বর) রাতে পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জের নারিকেলবাড়িয়া, আমরাবাড়িয়া, ভদ্রা ও ভাঙ্গা এলাকায় মাছ ধরার সময় সশস্ত্র দস্যুরা জেলেদের ওপর হামলা চালায়। বনদস্যু মজনু, করিম শরীফ ও বড় জাহাঙ্গীর বাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন নৌকা থেকে অন্তত ২১ জেলেকে অপহরণ করে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ সময় একটি মাছ ধরার ট্রলার, পাঁচটি মোবাইল ফোনসহ অন্যান্য মালামালও লুট করে নেয় তারা।
বাগেরহাট সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোহাম্মদ রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, শনিবার রাতে সাগরসংলগ্ন ভাঙ্গা, আমবাড়িয়া ও নারিকেলবাড়িয়া এলাকায় মাছ ধরার সময় অজ্ঞাতপরিচয় সশস্ত্র ব্যক্তিরা জেলেবহরে হামলা চালায়। এ সময় বিভিন্ন নৌকা থেকে ১৫ জেলেকে জোরপূর্বক একটি ট্রলারে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর আগে শুক্রবার সুন্দরবনের আরো কয়েকটি এলাকা থেকে ছয় জেলেকে অপহরণ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
তিনি বলেন, অপহৃত ২১ জেলের মধ্যে ১২ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তাঁদের বাড়ি খুলনা, বরগুনার পাথরঘাটা ও তালতলী এবং মোংলার বিভিন্ন এলাকায়। তাঁরা বন বিভাগের অনুমতিপত্র নিয়েই সুন্দরবনের খাল ও নদীতে মাছ ধরছিলেন।
কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোন জানায়, অপহৃত জেলেদের উদ্ধারে অভিযান চলছে। সুন্দরবনের আকাশে আধুনিক ড্রোন ব্যবহার করে জেলে ও দস্যুদের অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা করা হচ্ছে। পাশাপাশি নৌপথে কোস্ট গার্ডের একাধিক দল চিরুনি অভিযান পরিচালনা করছে।
তবে অপহরণের পর থেকে কোনো জেলে বা মহাজন দস্যুদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পাচ্ছেন না। পরিচয় প্রকাশ পেলে পেশা ও জীবনের জন্য হুমকি আসতে পারে—এমন আশঙ্কায় তাঁরা গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে রাজি নন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে অপহৃত জেলেদের একাধিক মহাজন জানান, জেলেদের মুক্ত করতে তাঁরা দস্যুদের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ করছেন। মুক্তিপণ হিসেবে কত টাকা দাবি করা হয়েছে, নিরাপত্তাজনিত কারণে তা জানাতে রাজি হননি তাঁরা। তাঁদের ভাষ্য, দস্যুদের সঙ্গে মুক্তিপণ নিয়ে দর-কষাকষি চলছে। কাঙ্ক্ষিত মুক্তিপণ পেলেই জেলেদের ছেড়ে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে দস্যুরা। দ্রুত মুক্তিপণ পরিশোধের জন্য মহাজনদের ওপর চাপও দেওয়া হচ্ছে।
সুন্দরবনে দস্যুদের দৌরাত্ম্য কমাতে গত কয়েক বছরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর উদ্যোগে একাধিক দস্যু বাহিনী অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণ করেছে। আত্মসমর্পণকারীদের পুনর্বাসনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এর পরও সুন্দরবনের প্রত্যন্ত এলাকায় নতুন করে জেলে অপহরণ ও মুক্তিপণ দাবির ঘটনায় দস্যু তৎপরতা পুরোপুরি বন্ধ হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। নতুন করে সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতায় সুন্দরবনে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের মধ্যে আবারও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই দস্যু আতঙ্কে বনে যেতে ভয় পাচ্ছেন। সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করে নিরাপদে মাছ ধরার নিশ্চয়তা চান তাঁরা।
পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. শরীফুল ইসলাম বলেন, অপহৃত জেলেদের এখনো কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। তাঁদের উদ্ধারে কোস্ট গার্ডের অভিযান চলছে। সুন্দরবনে অবস্থানরত জেলেদের রাতে দলবদ্ধভাবে এবং সংশ্লিষ্ট বন অফিসের কাছাকাছি থাকতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি সব স্টেশন ও টহল ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও বনরক্ষীদের জেলেদের নিরাপত্তায় টহল বাড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোনের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মাহাবুব হোসেন বলেন, সরকারের নির্দেশনায় সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করতে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে কোস্ট গার্ড। এরই অংশ হিসেবে অপহৃত ২১ জেলেকে উদ্ধারে অভিযান চলছে। দস্যুদের অবস্থান শনাক্তে আধুনিক ড্রোন ব্যবহার করা হচ্ছে। পাশাপাশি নৌপথেও চিরুনি অভিযান চলছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে জেলেদের উদ্ধার করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
তিনি আরো জানান, সুন্দরবনের সব দস্যুবাহিনীকে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানানো হয়েছে। আত্মসমর্পণকারীদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার নিশ্চয়তার পাশাপাশি পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও করা হবে। অন্যথায় দস্যুদের কঠিন পরিণতি ভোগ করতে হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন