প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
জুলাই সনদের আলোকে ‘স্বাধীন পুলিশ কমিশন’ গঠন না করার কারণে দেশে ‘মবতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে জাস্টিস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি পার্টি (জেডিপি)। দলটির বক্তব্য, পুলিশকে দলীয় প্রভাবমুক্ত ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের কার্যকর ভূমিকা ব্যাহত হচ্ছে।
মব সন্ত্রাস ও লুটপাটের অভিযোগ তুলে, সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও, রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং আশুলিয়ার তাহফিজুল কুরআনিল কারিম ফাজিল মাদ্রাসায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদকে দায়ী করেছে দলটি। তারা দাবি করেছে, জাসদ কার্যালয়ে কর্মসূচির অনুমতি দেওয়া এবং পরে সেখানে যুবদলকে মব করার সুযোগ দেওয়ার কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে সোমবার বিকেলে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে জেডিপির আহ্বায়ক নাঈম আহমাদ এসব কথা বলেন। তিনি উল্লেখ করেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কারের অন্যতম প্রত্যাশা ছিল পুলিশকে দলীয় প্রভাবমুক্ত ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য পুলিশ সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছিল। পরে জুলাই সনদের ৬৯ নম্বর দফায় স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনের বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য হয়েছিল। তাঁর দাবি, এ বিষয়ে কোনো দল নোট অব ডিসেন্ট দেয়নি।
নাঈম আহমাদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সমালোচনা করে বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য ও অবস্থান দেখে তাঁদের আশঙ্কা হচ্ছে, পুলিশকে আবারও দমন-পীড়ন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের কাজে ব্যবহারের চেষ্টা করা হচ্ছে কি না। তিনি দাবি করেন, পুলিশ সদস্যরাও দলীয় আনুগত্যের পরিবর্তে পেশাদার ও আন্তর্জাতিক মানের বাহিনী হিসেবে কাজ করতে চান।
জাসদ কার্যালয়ে কর্মসূচি আয়োজনের অনুমতি প্রসঙ্গে নাঈম আহমাদ বলেন, পুলিশ লিখিত অনুমতি দেওয়ার পর সেখানে অভিযান চালানো ন্যায্য নয়। তাঁর অভিযোগ, পুলিশের নাকের ডগায় যুবদলকে সেখানে মব করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এতে পুলিশ সদস্যদের নৈতিক শক্তি ও আত্মবিশ্বাস আরও দুর্বল হচ্ছে।
জেডিপির আহ্বায়ক প্রশ্ন তোলেন, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হলে দলটির অন্যতম প্রধান সহযোগী হিসেবে জাসদ কেন নিষিদ্ধ নয়। তিনি আরও জানতে চান, পুলিশ কেন জাসদকে কর্মসূচি পালনের লিখিত অনুমতি দিয়েছিল।
পুলিশ সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে নাঈম আহমাদ বলেন, বাংলাদেশের পুলিশব্যবস্থার বর্তমান কাঠামোর শিকড় ঔপনিবেশিক আমলে। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের পর ব্রিটিশ সরকার ১৮৬১ সালের পুলিশ আইনের ভিত্তিতে এ অঞ্চলে পুলিশব্যবস্থা গড়ে তোলে। তাঁর ভাষ্য, ওই ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য ছিল জনগণের সেবা নয়, ঔপনিবেশিক কর্তৃত্ব ও শোষণ বজায় রাখা।
তিনি বলেন, ১৮৬১ সালের পুলিশ আইন এখনো বহাল রয়েছে। যদিও বিভিন্ন সময়ে কিছু সংশোধন হয়েছে, তবে এর মূল দর্শন ও কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আসেনি। ফলে পুলিশকে জনগণের সেবক হওয়ার পরিবর্তে সরকারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ রয়ে গেছে।
নাঈম আহমাদ পুলিশ কর্মকর্তাদের পদায়ন, পদোন্নতি ও পুরস্কারের সংস্কৃতির অভিযোগও করেন। তিনি দাবি করেন, অতীতে সরকারি নির্দেশ বিনা প্রশ্নে পালনকারী এবং গুরুতর অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত অনেক কর্মকর্তা পুরস্কার, পদোন্নতি ও পছন্দের পদায়ন পেয়েছেন। বিপরীতে ভিন্নমত পোষণকারীদের শাস্তিমূলক পদায়ন কিংবা পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।
আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ টেনে নাঈম আহমাদ বলেন, আদালতের রায়ের পর হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত একজনের ‘আমি শুধু সরকারের নির্দেশ পালন করেছি’ ধরনের বক্তব্য এমন একটি কাঠামোর প্রতিফলন, যেখানে সরকারি নির্দেশ অন্ধভাবে পালন করাকেই পেশাদারিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়।
পুলিশ সংস্কারের প্রশ্নে বিএনপি সরকার আওয়ামী লীগের পদাঙ্ক অনুসরণ করছে বলেও অভিযোগ করেন জেডিপির আহ্বায়ক। তিনি বলেন, ২০০৭ সালে স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনের প্রস্তাবসহ নতুন পুলিশ অধ্যাদেশের একটি খসড়া তৈরি করা হয়েছিল। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরও সেই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি।
নাঈম আহমাদ বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশ সংস্কারের দাবি আবারও জোরালো হয়। এর ধারাবাহিকতায় অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের ৯ ডিসেম্বর পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ জারি করে। তবে পরবর্তী সময়ে তা কার্যকর আইনে পরিণত না হওয়ায় অধ্যাদেশটির কার্যকারিতা লোপ পায়।
তাঁর অভিযোগ, ক্ষমতায় এসে বিএনপি সরকারও পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশকে কার্যকর আইন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেনি। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনাতেও পুলিশ সংস্কারবিষয়ক সুপারিশ নিয়ে রাজনৈতিক দল ও অংশীজনদের সঙ্গে যথেষ্ট আলোচনা হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
নাঈম আহমাদ বলেন, একটি কার্যকর স্বাধীন পুলিশ কমিশন থাকলে পুলিশকে কোনো দলের ‘লাঠিয়াল বাহিনী’ হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ কমে যাবে। পুলিশ সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশের ভিত্তিতে আইন প্রণয়নের দাবি জানায় জেডিপি। নাঈম আহমাদ বলেন, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ কোনো সংশোধন ছাড়াই আইন হিসেবে পাস করতে হবে এবং পুলিশের আইনি দর্শন ও কাঠামোয় আমূল পরিবর্তন আনতে হবে।
তিনি আগামী সংসদ অধিবেশনে পুলিশ কমিশন গঠনের আইন পাসে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। অন্যথায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পাশাপাশি সরকারের দিকেও জনগণের আঙুল উঠবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে জেডিপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আব্দুল আলিম, প্রধান সংগঠক মো. আহছান উল্লাহ, যুগ্ম আহ্বায়ক মুত্তাকী বিন মনির, যুগ্ম সদস্য সচিব মাহতাব হোসেন সাব্বির, ইয়াসিন আরাফাত রাজ, মো. মুহিব্বুল্লাহ, জাতীয় ছাত্রমঞ্চের প্রধান সংগঠক সালমান শরীফসহ দলটির নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন