প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন নির্দেশনা জারি করেছে, যা শেয়ারহোল্ডার কোম্পানির পক্ষ থেকে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে ‘প্রতিনিধি পরিচালক’ মনোনয়নের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে। এর পাশাপাশি, শেয়ারহোল্ডার কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতার তুলনায় অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিনিয়োগ কমানো, আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা এবং প্রতিনিধি পরিচালকদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-২ এ সংশ্লিষ্ট সার্কুলারটি জারি করা হয়েছে।
সার্কুলারটি দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের চেয়ারম্যান, পরিচালনা পর্ষদ এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক/প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ব্যাংক-কোমপানির মালিকানা কাঠামোয় স্বচ্ছতা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, শেয়ারহোল্ডার কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতার তুলনায় অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিনিয়োগ কমানো, ব্যাংক-কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে শেয়ারহোল্ডার কোম্পানির পক্ষে মনোনীত প্রতিনিধি পরিচালকদের ভূমিকা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং আমানতকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণের লক্ষ্যে এসব নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।
নতুন নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে, কোনো কোম্পানি তার নিট সম্পদ বা নেট ওয়ার্থের পরিমাণের অধিক মূল্যমানের শেয়ার মালিকানা বা ক্রয়মূল্য কোনো একক অথবা একাধিক ব্যাংক-কোম্পানিতে ধারণ করতে পারবে না। অর্থাৎ, কোম্পানির নিজস্ব আর্থিক সক্ষমতার তুলনায় ব্যাংকের শেয়ারে অতিরিক্ত বিনিয়োগের সুযোগ থাকবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এ নির্দেশনার ফলে শেয়ারহোল্ডার কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা এবং ব্যাংক-কোম্পানিতে তাদের শেয়ার মালিকানার মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় রাখার বাধ্যবাধকতা তৈরি হলো। এর মাধ্যমে তুলনামূলকভাবে দুর্বল আর্থিক ভিত্তির কোনো কোম্পানি অতিরিক্ত ব্যাংক শেয়ার ধারণ করে ব্যাংকের মালিকানা কাঠামোয় অস্বাভাবিক প্রভাব বিস্তার করতে না পারে—এমন একটি নিয়ন্ত্রণ কাঠামো প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য রয়েছে।
সার্কুলারে বলা হয়েছে, কোনো কোম্পানি ইতোমধ্যে এক বা একাধিক ব্যাংক-কোম্পানির যে শেয়ার মালিকানা ধারণ করছে, তা নতুন নির্দেশনায় নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করলে সার্কুলার জারির তারিখ থেকে ছয় মাসের মধ্যে ওই অতিরিক্ত শেয়ার নির্ধারিত সীমার মধ্যে নামিয়ে আনতে হবে। অর্থাৎ, নতুন নিয়ম শুধু ভবিষ্যতের শেয়ার কেনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না; বর্তমানে বিদ্যমান অতিরিক্ত মালিকানাকেও নির্ধারিত সীমার মধ্যে আনতে হবে। এজন্য সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে ছয় মাস সময় দেওয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক দ্বারা।
শেয়ারহোল্ডার কোম্পানির পক্ষে কোনো ব্যাংক-কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে মনোনীত ‘প্রতিনিধি পরিচালক’কে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট শেয়ারহোল্ডার কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক অথবা পরিচালক হতে হবে। ফলে, সংশ্লিষ্ট কোম্পানির সঙ্গে সরাসরি মালিকানা ও পরিচালনাগত সম্পর্ক নেই—এমন কাউকে প্রতিনিধি পরিচালক হিসেবে মনোনয়নের সুযোগ থাকছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই শর্তের ফলে ব্যাংকের পর্ষদে কোনো কোম্পানির প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তির সঙ্গে ওই কোম্পানির প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে প্রতিনিধি পরিচালকের দায়বদ্ধতা ও স্বার্থের সম্পর্ক আরও স্পষ্ট হওয়ার কথা। নতুন নির্দেশনায় প্রতিনিধি পরিচালক মনোনয়নের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজের নামে নির্দিষ্ট পরিমাণ শেয়ার মালিকানা থাকার বিষয়টিও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
সার্কুলারে বলা হয়েছে, কোনো শেয়ারহোল্ডার কোম্পানির পক্ষে ব্যাংক-কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে প্রতিনিধি পরিচালক হিসেবে কোনো ব্যক্তিকে মনোনয়নের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজের নামে তালিকাভুক্ত পাবলিক লিমিটেড কোম্পানির ক্ষেত্রে তার পরিশোধিত মূলধনের ন্যূনতম ২ শতাংশ এবং অন্যান্য কোম্পানির ক্ষেত্রে তার পরিশোধিত মূলধনের ন্যূনতম ২০ শতাংশ দায়মুক্ত মালিকানা নিশ্চিত করতে হবে।
এ মালিকানা প্রতিনিধি পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পুরো সময় ধরে বজায় রাখতে হবে। অর্থাৎ, শুধু মনোনয়নের সময় নির্ধারিত শেয়ার থাকলেই হবে না; দায়িত্ব পালনকালে ওই শেয়ার মালিকানা অব্যাহত রাখার বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। ব্যাংক-কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে শেয়ারহোল্ডার কোম্পানির পক্ষে প্রতিনিধি পরিচালক নিয়োগ, পুনর্নিয়োগ অথবা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদন নিতে হবে।
সার্কুলারে বলা হয়েছে, এ ধরনের নিয়োগ, পুনর্নিয়োগ বা পরিবর্তনের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদন গ্রহণের উদ্দেশ্যে আবেদন দাখিলের সময় মনোনীত ব্যক্তির সংশ্লিষ্ট শেয়ারহোল্ডার কোম্পানিতে মালিকানা বা স্বত্ব থাকার সমর্থনে প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্র অবশ্যই সংযুক্ত করতে হবে। এর ফলে প্রতিনিধি পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু কোম্পানির মনোনয়ন যথেষ্ট হবে না; মনোনীত ব্যক্তির সংশ্লিষ্ট কোম্পানিতে প্রকৃত মালিকানা বা স্বত্বের বিষয়টিও যাচাই করবে বাংলাদেশ ব্যাংক।
সার্কুলার জারির অব্যবহিত আগে ব্যাংক-কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে শেয়ারহোল্ডার কোম্পানির পক্ষে নিয়োগপ্রাপ্ত প্রতিনিধি পরিচালকদের পুনর্নিয়োগ বা পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও নতুন সার্কুলারের নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।
অর্থাৎ, পুরোনো ব্যবস্থায় নিয়োগ পাওয়া প্রতিনিধি পরিচালকদের ক্ষেত্রেও ভবিষ্যতে পুনর্নিয়োগ বা পরিবর্তনের সময় নতুন শর্তগুলো প্রযোজ্য হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সার্কুলারে উল্লেখ করেছে, ব্যাংক-কোম্পানির পরিচালকদের অবগতির জন্য এবং প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণের উদ্দেশ্যে পর্ষদ সভায় এ সার্কুলারে বর্ণিত বিষয়গুলো উপস্থাপন করতে হবে। পাশাপাশি ব্যাংক-কোম্পানির অন্যান্য কর্মকর্তা ও শেয়ারহোল্ডারদেরও বিষয়টি অবহিত করার ব্যবস্থা নিতে হবে। ফলে, নতুন নির্দেশনা সম্পর্কে শুধু পরিচালনা পর্ষদ নয়, ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং শেয়ারহোল্ডারদেরও অবহিত করার দায়িত্ব ব্যাংকগুলোর ওপর দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ব্যাংক-কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে এসব নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। সার্কুলারে বলা হয়েছে, নির্দেশনাগুলো অবিলম্বে কার্যকর হবে। নতুন এই কাঠামোর ফলে ব্যাংক-কোম্পানিতে শেয়ারহোল্ডার কোম্পানির মালিকানা এবং পরিচালনা পর্ষদে তাদের প্রতিনিধিত্বের মধ্যে আরও স্পষ্ট সম্পর্ক তৈরি হলো। একই সঙ্গে কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত ব্যাংক শেয়ার ধারণের সুযোগ সীমিত করা হয়েছে।
বিশেষ করে শেয়ারহোল্ডার কোম্পানির পক্ষে প্রতিনিধি পরিচালক মনোনয়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব শেয়ার মালিকানা, কোম্পানির সঙ্গে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদনের শর্ত আরোপের মাধ্যমে পরিচালনা পর্ষদে প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি আরও নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যে আনা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারের মূল লক্ষ্য হিসেবে ব্যাংক-কোমপানির মালিকানা কাঠামোয় স্বচ্ছতা ও স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগের সামঞ্জস্য, প্রতিনিধি পরিচালকদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা এবং আমানতকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন