প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
খুলনা শিপইয়ার্ড বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জন্য ৩টি এলসিটি নির্মাণের কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করেছে। সম্প্রতি, এ বহরের তৃতীয় ও শেষ নৌযানটির নির্মাণকাজ শেষ করে রূপসা নদীতে ভাসানোর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন সহকারী নৌবাহিনী প্রধান (ম্যাটেরিয়াল) রিয়ার অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ মাকসুদ আলম-বিএন। অনুষ্ঠানে খুলনা শিপইয়ার্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং নৌবাহিনী ও শিপইয়ার্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন।
প্রায় ২৪৫ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৪৫ ফুট প্রস্থের এই সমর নৌযানটি সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীর উভচর (এম্ফিবিয়াস) অভিযানে ৩শ’রও বেশি সামরিক সদস্য পরিবহনের পাশাপাশি ৬টি ট্যাংক, ১২টি সাঁজোয়া যান (এপিসি) অথবা ১৮টি সামরিক যান বহন করতে সক্ষম। নৌযানটি সেনা ও নৌবাহিনীর উভচর অভিযানে বিশেষ বাহিনী পরিবহনসহ উপকূলীয় দ্বীপাঞ্চলে ভারী সমর সরঞ্জাম স্থানান্তরেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে শিপইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ আশা করছে।
কানাডার ডিজাইন হাউসের নকশায় এএইচ স্টিল মেটেরিয়ালে নির্মিত এই সমর নৌযানটিতে ৩,০০৪ অশ্বশক্তির আমেরিকার দুটি ক্যাটারপিলার মূল ইঞ্জিন সংযুক্ত করা হয়েছে। জানা গেছে, এই সমর নৌযানটি ১,৫০৫ টন পানি অপসারণ করে ঘণ্টায় প্রায় ২৮ কিলোমিটার গতিতে চলতে সক্ষম। অত্যাধুনিক এই সমর নৌযানটিতে ফ্রান্সের ৩৪০ কেভিএ ক্ষমতার দুটি জেনারেটরও স্থাপন করা হয়েছে।
এ সমর নৌযান ৩টি নির্মাণের জন্য সামরিক ক্রয় পরিদপ্তরের সঙ্গে খুলনা শিপইয়ার্ডে ২০২২ সালের ১ জুন চুক্তি স্বাক্ষর হয়। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী চলতি বছরের ৩১ জুন নৌযান ৩টির নির্মাণ সম্পন্ন করার সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারিত ছিল। খুলনা শিপইয়ার্ড নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এসব সমর নৌযানের নির্মাণ সম্পন্ন করে ইতোমধ্যে ২টি এলপিসি সরবরাহের পর গত শনিবার তৃতীয় ও শেষটির লঞ্চিংয়ের মাধ্যমে নির্মাণকাজ সম্পন্ন করেছে।
নৌবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন খুলনা শিপইয়ার্ড ইতোমধ্যে যুদ্ধজাহাজসহ ৮ শতাধিক বিভিন্ন ধরনের নৌযান নির্মাণ করেছে এবং ড্রেজারসহ প্রায় ৩ হাজার নৌযানের মেরামত কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করেছে। দেশের মাটিতে প্রথম যুদ্ধজাহাজ হিসেবে ৫টি প্যাট্রোল ক্রাফট এবং ২টি লার্জ প্যাট্রোল ক্রাফট নির্মাণের পাশাপাশি চীনা কারিগরি ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘সিএসওসি’র সহযোগিতায় আরও ৫টি প্যাট্রোল ক্রাফট নির্মাণ করেছে খুলনা শিপইয়ার্ড। বর্তমানে ইয়ার্ডটিতে বিআইডব্লিউটিএ’র জন্য ৪টি ড্রেজার নির্মাণকাজও শেষ পর্যায়ে রয়েছে। অতীতের ধারাবাহিকতায় প্রতিষ্ঠানটি মোংলা, পায়রা ও চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের জন্য একাধিক নৌযানের নির্মাণ কাজ অব্যাহত রেখেছে।
১৯৯৯ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশ নৌবাহিনী খুলনা শিপইয়ার্ডের দায়িত্ব গ্রহণের পর, প্রায় ১৮০ কোটি টাকার দায়দেনা ও লোকসানের বোঝা নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি সততা ও দক্ষতার কারণে কখনো লোকসানের মুখে পড়েনি। এমনকি করোনাকালীন দুর্যোগের সময়ও প্রতিষ্ঠানটি মুনাফা অর্জন করেছে। খুলনা অঞ্চলের শ্রেষ্ঠ করদাতার সম্মানও প্রতিষ্ঠানটি একাধিকবার অর্জন করেছে।
১৯৫৭ সালে তৎকালীন পশ্চিম জার্মানির সহায়তায় পূর্ব পাকিস্তান শিল্প উন্নয়ন করপোরেশন-এর মালিকানায় খুলনা শিপইয়ার্ডের যাত্রা শুরু হয়। প্রাথমিকভাবে জার্মান ও যুক্তরাজ্যের যৌথ ব্যবস্থাপনায় প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পরিচালিত হলেও স্বাধীনতার পর বিএসইসির ব্যবস্থাপনায় কিছু সময় লাভজনকভাবে পরিচালিত হয়। পরবর্তীতে অব্যাহত লোকসানে শিপইয়ার্ডটি বন্ধ ঘোষণা করে বিরাষ্ট্রীয়করণের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। কয়েকবার বিক্রির চেষ্টা করেও তা সম্ভব হয়নি। ১৯৯৯ সালে সরকার প্রতিষ্ঠানটি নৌবাহিনীর কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
চীনা কারিগরি সহায়তায় খুলনা শিপইয়ার্ডে ইতোমধ্যে একটি অত্যাধুনিক রাবার ফ্যাক্টরি গড়ে তোলা হয়েছে। এই ফ্যাক্টরির মাধ্যমে রাবার আইটেম তৈরির জন্য নিজস্ব ডিজাইন হাউস, মোল্ড ফেব্রিকেশনের জন্য অত্যাধুনিক সিএনসি মেশিন, প্রোডাকশনের জন্য রোলিং, নিডার এক্সট্রুডার মেশিন, ফেব্রিক্সযুক্ত রাবার শিট প্রস্তুতের জন্য ক্যালেন্ডার মেশিন, মেটালযুক্ত রাবার আইটেম প্রসেসিংয়ের জন্য ব্লাস্টিং মেশিন, ভালকানাইজিংয়ের জন্য উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন হাইড্রোলিক প্রেসসহ সব ধরনের যন্ত্রপাতি সংযোজন করা হয়েছে। এছাড়া সেমি ফিনিশড রাবার প্রোডাক্ট ও ফিনিশড প্রোডাক্টসমূহের সর্বোচ্চ গুণগত মান নিশ্চিতকরণে বিভিন্ন ধরনের টেস্ট ইকুইপমেন্টসহ পূর্ণাঙ্গ একটি ‘রাবার টেস্ট ল্যাব’ও স্থাপন করা হয়েছে। ফলে এ ফ্যাক্টরিটি ইতোমধ্যে বিশ্বমানের একটি মেরিন রাবার উৎপাদন প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে মোংলা বন্দরের জেটির জন্য সফলতার সাথে ‘রাবার ফেন্ডার’ উৎপাদন ও সংযোজন করেছে।
খুলনা শিপইয়ার্ড দেড় হাজার কোটি টাকারও বেশি সম্পূর্ণ দেশীয় তহবিলে শরীয়তপুরের নড়িয়া ও বরিশালের কীর্তনখোলা নদীর ভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের দুটি প্রকল্প সফলতার সাথে বাস্তবায়ন করেছে। পাশাপাশি সমাজসেবা অধিদপ্তরের জন্যও শিশু পরিবারের নির্মাণকাজ সম্পন্ন করছে প্রতিষ্ঠানটি। রাজবাড়ীতে পদ্মা নদীর ভাঙন রোধ এবং কুষ্টিয়ার গড়াই নদী খনন কাজও সফলতার সাথে সম্পন্ন করেছে খুলনা শিপইয়ার্ড।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন