প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২২ দিনের আহরণ নিষেধাজ্ঞার সময় বরিশালসহ উপকূলীয় অঞ্চলে এবার জেলেদের মধ্যে ইলিশ আহরণের প্রতি অতিমাত্রায় আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। সরকার দক্ষিণ উপকূলের ১৬৮টি উপজেলার ৬ লাখ ৪৬ হাজার ২৯০টি জেলে পরিবারের জন্য ২৫ কেজি করে মোট ১৬,১৫৭.২৫ টন চাল বিনামূল্যে বিতরণ সম্পন্ন করেছে। বরিশাল অঞ্চলের ৩,৫৮,৫১৬ জেলে পরিবারের মধ্যে ৮,৯৬২.৯ টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের উৎপাদিত ও আহরিত ইলিশের ৬৮ ভাগ বরিশালের অভ্যন্তরীণ ও উপকূলীয় নদ-নদী থেকে আহরণ করা হচ্ছে। এই কারণে বরিশালকে ‘ইলিশের রাজধানী’ হিসেবে অভিহিত করা হয়ে থাকে।
গত ৮ অক্টোবর মধ্যরাত থেকে আগামী ২৮ অক্টোবর মধ্যরাত পর্যন্ত উপকূলের ৭,১৩৪ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় সব ধরনের মৎস্য আহরণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে, এবং সারা দেশে এই মাছের আহরণ, পরিবহন ও বিপণন নিষিদ্ধ রয়েছে। সরকারি এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে জেলা পুলিশ, নৌ পুলিশ এবং কোস্টগার্ডসহ নৌবাহিনী কাজ করছে। বরিশালসহ উপকূলীয় এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়ে মৎস্য বিভাগ নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে।
নিষেধাজ্ঞার প্রথম সপ্তাহেই প্রায় ৪শ মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে আইন অমান্য করায় ৩শ জেলে ও মৎস্যজীবীকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ৫ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে এবং প্রায় ২০ কোটি টাকার ১.২৫ কোটি মিটার নিষিদ্ধ জাল বাজেয়াপ্ত করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত ও মৎস্য অধিদপ্তরের অভিযানিক দল। সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করায় ইতোমধ্যে প্রায় সাড়ে ৪শ মামলা দায়ের করা হয়েছে। অভিযানিক দল বিভিন্ন নদী ও আড়ত থেকে প্রায় ৫০ টন ইলিশ আটক করে তা এতিমখানা ও লিল্লাহ বোর্ডিংয়ে বিতরণ করেছে বলে মৎস্য অধিদপ্তর জানিয়েছে।
এছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং প্রশাসনের সঙ্গে মৎস্য অধিদপ্তরের পরিদর্শন দল ইতোমধ্যে ২ হাজারেরও বেশি অভিযান পরিচালনা করেছে। প্রায় ৫শ মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র, আড়াই হাজার মাছঘাট, ৬ হাজারের মতো মাছের আড়ত ও আরও সাড়ে ৬ হাজার বাজার পরিদর্শন করা হয়েছে। তবে অভিযানিক দলের নজর এড়িয়ে বিভিন্ন এলাকায় চোরাই মাছ শিকার ও বিপণন অব্যাহত রয়েছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং প্রশাসনের সহায়তায় নিয়মিত নজরদারি ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে। নিষেধাজ্ঞার শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এই কার্যক্রম চলবে বলেও জানানো হয়েছে। তবে সফলতা অর্জনের জন্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসহ সকল মহলের সহযোগিতা কামনা করেছে মৎস্য অধিদপ্তর।
সম্প্রতি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন মাছের মোকাম পরিদর্শন করেছেন। তিনি বরিশালে জেলে ও মৎস্যজীবীদের সঙ্গে আলোচনা সভায় নদ-নদীর প্রবাহ হ্রাস, নাব্যতা সংকট ও নদী দূষণের বিষয়গুলো স্বীকার করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ইলিশের বংশ বিস্তারে নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে চলমান ২২ দিনের আহরণ নিষেধাজ্ঞা যথাযথভাবে পালনে তিনি জেলে ও মৎস্যজীবীদের সহযোগিতা কামনা করেছেন।
উল্লেখ্য, ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদন প্রায় ১৩ ভাগ হ্রাস পেয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ইলিশের সহনীয় আহরণ ও উৎপাদন ৫,৭১,৩৪২ টন থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৫,০০,২৮৮ টনে হ্রাস পায়। মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, ২০২৪ সালে ২২ দিনের আহরণ নিষেধাজ্ঞাকালীন প্রজনন মৌসুমে বরিশালসহ অভ্যন্তরীণ ও উপকূলীয় নদ-নদীতে মা ইলিশের দল ৮,৮৪,৮০২ কেজি ডিম ছাড়লেও ২০২৫ সালে তা ৭,৯১,৫৬৪ কেজিতে হ্রাস পায়। ফলে ২০২৪ সালে জাটকার উৎপাদন ৪৪,২৪০ কোটি থেকে ২০২৫ সালে ৩৯,৫৭৮ কোটিতে হ্রাস পায়। গত বছরের ২২ দিনের আহরণ নিষেধাজ্ঞাকালীন সময়ে বরিশাল অঞ্চলসহ সারা দেশের বিচরণক্ষেত্রসমূহে ইলিশের প্রজনন সফলতার হার ৪৯.২৭% বলে তথ্য পাওয়া গেছে। আগের কয়েকটি বছরে প্রজনন সফলতার হার ৫২-৫৪% পর্যন্ত ছিল। মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সরেজমিন অনুসন্ধানে গত বছর বরিশাল অঞ্চলে প্রজনন সফলতার এই হার সর্বাধিক ছিল বলে জানা গেছে।
ইলিশের জীবনচক্রে স্বাদু পানি থেকে সমুদ্রের নোনা পানিতে এবং সেখান থেকে পুনরায় স্বাদু পানিতে অভিপ্রায়ণ করে। মৎস্য বিজ্ঞানীদের মতে, উপকূলের ৭ হাজার ১৩৪ বর্গ কিলোমিটারের মূল প্রজনন ক্ষেত্রে মুক্ত ভাসমান অবস্থায় ডিম থেকে ফুটে বের হয়ে ইলিশের লার্ভা, স্বাদু পানি ও নোনা পানির নার্সারি ক্ষেত্রসমূহে বিচরণ করে খাবার খেয়ে বড় হতে থাকে। নার্সারি ক্ষেত্রসমূহে ৭-১০ সপ্তাহ ভেসে বেড়ানোর পর জাটকা হিসেবে সমুদ্রে চলে যায় পরিপক্কতা অর্জনে। বঙ্গোপসাগরের বিভিন্ন এলাকায় ১২-১৮ মাস অবস্থানের পর পরিপক্ক হয়ে পূর্ণাঙ্গ ইলিশ হিসেবে প্রজননের লক্ষ্যে আবার স্বাদু পানির নার্সারি ক্ষেত্রে ফিরে এসে ডিম ছাড়ে।
মৎস্য বিজ্ঞানীদের মতে, বাংলাদেশের ইকোসিস্টেমে সারা বছরই ৩০ ভাগ ইলিশ ডিম বহন করে এবং পরিপক্ক হয়ে ডিম ছাড়ে। প্রতিদিন স্রোতের বিপরীতে ৭১ কিলোমিটার পর্যন্ত ছুটে চলা অভিপ্রয়াণী ইলিশ অত্যন্ত সংবেদনশীল মাছ। তার অভিপ্রয়ণের পথ বাধাগ্রস্ত হলে এবং পানি দূষণসহ উষ্ণতা বৃদ্ধি পেলে সে তার গতিপথ পরিবর্তন করে সহনীয় আবাস ও বিচরণস্থল খুঁজে নেয়। এসব কারণেই ইতোপূর্বের বিচরণস্থল পরিবর্তন করে গত বছর বরিশাল অঞ্চলকেই ইলিশের প্রধান প্রজননস্থল হিসেবে বেছে নেওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়।
২০০৫ সালেই প্রথম ‘হিলসা ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট অ্যাকশন প্ল্যান’-এর আওতায় প্রধান প্রজনন মৌসুমে ১০ দিন ইলিশের আহরণ বন্ধ রাখা হয়। পরবর্তীতে মৎস্য বিজ্ঞানীদের সুপারিশে ২০১১ সালে তা ১১ দিন এবং ২০১৫ সালে ১৫ দিন ও ২০১৬ সাল থেকে ২২ দিনে উন্নীত করা হয়েছে।
আগামী ২৮ অক্টোবর মধ্যরাতে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পর ১ নভেম্বর থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সারা দেশে জাটকা আহরণে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন