প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
জুলাই শহীদ পরিবারের সদস্যরা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন, রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন এবং আন্দোলনে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করার দাবির কথা জানিয়েছেন। তারা একইসঙ্গে দেশের মানুষের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি মেধাবী তরুণদের যোগ্যতা কাজে লাগানোর পরিবেশ তৈরির জন্য আহ্বান জানান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই বিষয়গুলো তুলে ধরেন বক্তারা।
শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে গণঅভ্যুত্থান-২০২৪-এর দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাদা দল ও ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইউট্যাব) আয়োজিত আলোচনা সভায় এসব দাবি জানান শহীদ পরিবারের সদস্যরা।
‘ফ্যাসিবাদী সরকার পতনে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ভূমিকা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় শহীদ আবু সাঈদের বড় ভাই আবু হোসেন, শহীদ ওয়াসিমের বাবা শফিউল আলম এবং শহীদ মীর মুগ্ধর ভাই মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ বক্তব্য রাখেন। তাদের বক্তব্যে তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের আত্মত্যাগের লক্ষ্য, প্রত্যাশিত রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে নানা দাবি ও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
শহীদ আবু সাঈদের বড় ভাই আবু হোসেন বলেন, ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই তাঁর ভাইকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে কোটা সংস্কার আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয় এবং ছাত্র-জনতা রাজপথে নেমে স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটায়।
তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৬৯ সালের গণআন্দোলনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শামসুজ্জোহা যেভাবে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দ্বারা শিক্ষার্থীদের পাশে থেকে সাহস, সহযোগিতা ও উদ্দীপনা দেওয়া হয়। এই ভূমিকা স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটাতে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
আবু হোসেন আরও বলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানকে তুলনা করা যাবে না। তবে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগের উদ্দেশ্য ছিল ১৯৭১ সালে অর্জিত স্বাধীনতাকে পুনরুদ্ধার ও সুরক্ষিত করা।
সম্প্রতি জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে কিছু ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের ঘটনায় হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, এই ধরনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে প্রত্যাশিত প্রতিবাদ দেখা যায়নি। তিনি সরকারের কাছে আহ্বান জানান যে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে অবমাননা বা ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
তিনি আরও বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে মানুষের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। সাধারণ মানুষ যেন আগের সময়ের তুলনায় বর্তমান সরকারের আমলে ভালো থাকার কথা বলতে পারে—তবেই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের আত্মত্যাগ পূর্ণতা পাবে।
শহীদ ওয়াসিমের বাবা শফিউল আলম বলেন, “আমাদের ছেলে-মেয়ে কিছু প্রত্যাশা, আশা ও আকাঙ্ক্ষা নিয়ে রাস্তায় নেমেছিল। সেই আকাঙ্ক্ষা যেন কোনোভাবে বিভ্রান্ত না হয় এবং ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা অন্য কোনো স্বার্থের কারণে নষ্ট না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।”
তিনি উল্লেখ করেন, মেধার জন্যই শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নেমেছিল। দেশের প্রতিটি মেধাবী ছেলে-মেয়ে যেন তাদের মেধা ও যোগ্যতা কাজে লাগাতে পারে, সেই ব্যবস্থা করতে হবে।
শহীদদের হত্যার বিচার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর খুব বেশি সময় পার হয়নি। সরকারকে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে এবং সহযোগিতা করতে হবে। সরকারের কোনো ভুল-ত্রুটি থাকলে তা সংশোধনের সুযোগ দেওয়ারও আহ্বান জানান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণের অংশ হিসেবে শহীদ মীর মুগ্ধর ভাই মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ বলেন, শহীদদের আকাঙ্ক্ষাকে মূলত তিনটি বিষয়ে ভাগ করা যায়। এগুলো হলো—ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র কাঠামোর পরিবর্তন, রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন এবং জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার।
তিনি আলোচনা করেন, যদি কোনো একজন তরুণ সংসদ সদস্য পুরো একটি প্রজন্মের হয়ে কথা বলেন, তাহলে প্রশ্ন ওঠে—কোন জাতীয় সম্মেলন বা গণভোটের মাধ্যমে তাকে পুরো প্রজন্মের প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে? আলোচনা, সমালোচনা ও সংশোধনের সুযোগ থাকলেও একটি প্রজন্মের কথা বলে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান চাপিয়ে দেওয়া আরেক ধরনের ফ্যাসিবাদের লক্ষণ।
স্নিগ্ধ বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু বিভিন্ন এলাকায় সিনিয়র রাজনীতিবিদদের বক্তব্য প্রত্যাশিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এমন রাজনৈতিক সংস্কৃতি ফ্যাসিবাদী সরকারের সময় দেখা গেছে। জুলাইয়ের ছাত্র-জনতা এমন রাজনৈতিক সংস্কৃতি চায়নি।
তিনি আরও বলেন, শহীদদের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের দায়িত্ব শুধু সরকার বা সরকারি দলের নয়, বরং বিরোধী দলসহ দেশের সব নাগরিকের সম্মিলিত দায়িত্ব।
“শহীদরা আমাদের ওপর থেকে দেখছেন”—এই বিষয়ে সবার দায়িত্বশীল আচরণের ওপর বলা হয়েছে।
জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে স্নিগ্ধ শহীদ আনাসকে গুলি করা পুলিশ সদস্যের তিন বছরের সাজা এবং সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনের পাঁচ বছরের সাজা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন। এ বিষয়ে সকলকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, “দেশকে বদলাতে হলে প্রথমে নিজেকে বদলাতে হবে। যদি আমরা নিজেদের পরিবর্তন না করি, তাহলে দেশকে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।”
আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী। অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলামও উপস্থিত ছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাদা দলের আহ্বায়ক এবং ইউট্যাবের মহাসচিব অধ্যাপক মো. মোরশেদ হাসান খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন