প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
দেশে অবৈধ মাদকের বিস্তার এখন আর শুধুমাত্র ভয়ানক অবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি মহামারির পর্যায়ে পৌঁছেছে। মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে মাদক সেবীর সংখ্যা ৮২ লাখ। প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়েও বেশি হতে পারে। হাত বাড়ালেই পাওয়া যাচ্ছে হেরোইন, ফেন্সিডিল, ক্রিস্টাল মেথ বা আইস, ফেন্টানিল, ক্রোকোডিল (মাংস-খেকো মাদক), কোকেন ও ক্র্যাক কোকেন, এমডিএমএ বা এক্সট্যাসি, এলএসডির মতো প্রাণঘাতী মাদক। ইয়াবা এখন সর্বত্র পাওয়া যাচ্ছে।
তবে মাদকের বিস্তার রোধে দেশের একমাত্র সংস্থা ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর’ উল্লেখিত ভয়ানক মাদক ঠেকানোর পরিবর্তে কম ক্ষতিকর ও বৈধ মদের বারগুলোতেই অভিযান চালাতে বেশি আগ্রহী। দেশের বৈধ বারগুলোর মালিকরা সরকারী আইন-কানুন মেনে লাইসেন্স নিয়ে বৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছেন এবং নিয়মিত সরকারকে ভ্যাট প্রদান করছেন। অথচ পারমিটবিহীন কেউ মদপান করছেন কিনা, এই অজুহাত তুলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এসব বারগুলোতেই অভিযান চালায়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঠিক মনিটরিং এবং দিক নির্দেশনার অভাবে, দুর্নীতির সাথে জড়িত কিছু কর্মকর্তা দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছেন। অভিযোগ রয়েছে, বারগুলোতে মাসোহারা পেতে দেরি হলেই তারা অভিযানে যান। কিন্তু ভয়ঙ্কর সব মাদকে দেশ সয়লাব হওয়ার দিকে তাদের নজর নেই। বন্ডেড ওয়্যারহাউজগুলোতে নারকোটিক্সের অভিযানের নিয়ম না থাকলেও, তারা সেখানে অভিযান চালাচ্ছে আইন ভঙ্গ করে। সম্প্রতি রাজধানীতে এমন একাধিক অভিযানের পর নারকোটিক্সের রহস্যজনক ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা চলছে। বড় শিল্প গোষ্ঠীগুলো তাদের বিভিন্ন পণ্য বাজারে চড়া দামে বিক্রি ও প্রচার বাড়াতে ছোট-মাঝারি প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালানোর জন্য দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে অভিযান পরিচালনা করছে।
অভিযোগ রয়েছে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে একযোগে কাজ করছে দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রায় সবগুলো সংস্থা। তবে পুলিশ, এসআরবি, বিজিবি, কোস্টগার্ড নিজেদের মূল দায়িত্বের বাইরে গিয়ে যে পরিমাণ অবৈধ মাদক দ্রব্য উদ্ধার করে এবং এর সাথে জড়িতদের গ্রেফতার করে, তার সিকিভাগও সাফল্য দেখাতে পারেন না নারকোটিক্স। মাঝে মাঝে কিছু ইয়াবা ও গাঁজা ব্যবসায়ীকে ধরলেও, তারা টাকা নিয়ে ছেড়ে দেয় এমন অভিযোগও রয়েছে। নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে, দু’একটি অভিযানের সামান্য সাফল্যের খবর তারা প্রচার করেন ঢাকঢোল পিটিয়ে বিশাল সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে।
টাকা খরচ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে নিজেদের সফলতা জাহির করা হয়। এদিকে ভয়ঙ্কর সব মাদকের বিস্তার প্রসঙ্গে নারকোটিক্সের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, "মদপান বা মদের বারগুলোতে প্রবেশ সহজীকরণ করা হলে ভয়ঙ্কর মাদক সেবনে অনিহা চলে আসবে। কাজেই মদ সহজলভ্য করা উচিত।"
২০২৫ সালে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটি এবং আরএমসিএলের পরিচালিত জরীপ অনুযায়ী, দেশে মোট মাদকসেবীর সংখ্যা ৮,১৯৪,৬০৫ জন বা ৮২ লাখ। এটি মোট জনসংখ্যার ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ। এ হিসেবে এটি মহামারির দিকে যাচ্ছে। একজন ব্যক্তি একাধিক ধরনের নেশায় আসক্ত হতে পারেন। ৩৩ শতাংশ ব্যবহারকারী জানিয়েছেন, তারা ৮ থেকে ১৭ বছর বয়সে মাদক শুরু করেছেন। ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সি ৫৯ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা ২৫ বছর বয়সে শুরু করেছেন। অর্ধেকের বেশি জানিয়েছেন, তারা ২০ বছর বা তার আগেই নেশা শুরু করেছে। জরীপ অনুযায়ী, ভয়ঙ্কর সব মাদক আসে দেশের বাইরে থেকে, বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্ত দিয়ে। ভারত সীমান্ত দিয়ে ফেন্সিডিল, গাঁজা ও হেরোইন এলেও ইয়াবা আসে টেকনাফের নাফ নদী হয়ে, যা মায়ানমারের তৈরি। কর্মকর্তারা জানান, আমাদের দেশে ইয়াবার কোনো কারখানার সন্ধান মেলেনি। জন্ম নিবন্ধন বড়ি দিয়ে বানানো ইয়াবা উদ্ধার হলেও সেটি আসলে ইয়াবার আদলে তৈরি। একমাত্র আমিন হুদার বাসার ভেতরে ইয়াবার কারখানাটি ছিল অরিজিন্যাল।
এদিকে নারকোটিক্স সূত্রে জানা যায়, মাদকের গডফাদার রয়েছে, এটি সত্য। তবে তাদের অবস্থান সর্বদা আড়ালে। ধরা পড়ে ছোটরা। সারাদেশে ছোট-বড় মিলিয়ে বিভিন্ন ধরনের অবৈধ মাদক বিক্রেতার সংখ্যা ২৩ হাজার। যদিও এ সংখ্যার হেরফের হয়। কারণ ত্রৈমাসিক জরীপের সময় এসব বিক্রেতার কেউ গ্রেফতার হন, কেউ জেলে থাকেন, কেউ বিদেশে পালিয়ে যান। আবার কেউ কেউ মৃত্যুবরণ করেন। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট বার লাইসেন্সের সংখ্যা ২৪৩টির মতো (যার মধ্যে হোটেল বার ১২৭টি, রেস্তোরাঁ বার ৬৪টি, ক্লাব বার ৪৮টি এবং রিসোর্ট বার ৪টি)। বিগত আওয়ামী সরকারের দীর্ঘ মেয়াদকালে এর আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেশি মদের বার ও মাদকের লাইসেন্স প্রদান করা হয়েছিল। তবে চব্বিশের পট পরিবর্তনের পর নতুন কোনো লাইসেন্স দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছে অধিদপ্তর।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (অপারেশ) মুকুল জ্যেতি চাকমা মঙ্গলবার ইনকিলাবকে বলেন, "মাদকের বিস্তার যে পর্যায়ে পৌঁচেছে তা নিয়ন্ত্রণ করা আসলেই চ্যালেঞ্জিং। সবার আগে পরিবার থেকে দায়িত্ব নিতে হবে যাতে কোনো তরুণ-কিশোর মাদকের সংস্পর্শে না আসে। এরপর রাষ্ট্রীয় বিষয়। মাদকের সঙ্গে জড়িতরা যাতে সহজে মুক্তি না পায়, সে বিষয়টি বিচার ব্যবস্থাকেও আমলে নিতে হবে। আইনজীবীদেরও ভূমিকা রয়েছে। যে সব ব্যক্তির বিরুদ্ধে মাদকের অনেক মামলা রয়েছে, তার পক্ষে আদালতে না ওকালতি করা শ্রেয়।"
মাদকের সামাজিক বিস্তার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "জেনেভা ক্যাম্পে সব সময় মাদক বিক্রি হয়। ক্যাম্পটির ভৌগোলিক অবস্থান, সেখানের বাসিন্দাদের সামাজিক মর্যাদা সব মিলিয়ে সেখানে অভিযান চালানো কষ্টকর। সরকারের উচিত আগারগাঁও বিএনপি বস্তির মতো জেনেভা ক্যাম্পের বাসিন্দাদের অন্যত্র সরিয়ে সেখানে সরকারি অফিস আদালত তৈরি করা।"
মাদক নিয়ন্ত্রণ শুধুমাত্র একক কোনো সংস্থার পক্ষে সম্ভব নয়। এর জন্য দরকার সমন্বিত উদ্যোগ। মাদকের করাল গ্রাসে সমাজ বিপর্যস্ত হলেও মূল হোতা বা গডফাদাররা অতীতে যেমন ছিলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে, এখনো তেমনই আছেন।
এদিকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অসাধু কর্মকর্তারাই মাদক নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলে নিজেদের অর্থনৈতিক সুবিধা নিচ্ছেন। আবার মাদক মামলায় নিরপরাধ মানুষকে ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে বা আসামিকে মামলা থেকে বাদ দেওয়ার কথা বলে বড় অঙ্কের ঘুষ নেওয়া, জব্দকৃত মাদক ফেরত বা পরিমাণ কমানো, অভিযানে উদ্ধার করা ইয়াবা, ফেনসিডিল বা অন্যান্য মাদকের পরিমাণ কম দেখিয়ে আদালতে প্রতিবেদন দেওয়া কিংবা জব্দ করা আলামত সরিয়ে ফেলা, মাসিক চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
৩০ সেপ্টেম্বর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সংক্রান্ত এক ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, "সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ এবং মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকা আমাদের হাতে আছে। তাদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান চলছে। এই অভিযান আরও তীব্র করা হবে।"
গত ১১ আগস্ট রাজশাহী মহানগরীর দামকুড়া থানাধীন কাদিপুর গ্রামে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) একটি অভিযানকে কেন্দ্র করে ১ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণ, আসামি ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। রাজশাহী জেলা শাখার ‘খ’ সার্কেলের পরিদর্শক হেলাল উদ্দীনের নির্দেশনায় উপ-পরিদর্শক আল আমিনের নেতৃত্বে এই অভিযান পরিচালিত হয়। গত ১ অক্টোবর নওগাঁর বদলগাছীতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক সহকারী উপপরিদর্শকের বিরুদ্ধে মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়ে এক নারী ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ১০ হাজারের পর আরও ৪০ হাজার টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ ওঠে।
গত জুন মাসে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) ১০ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ২০ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণ, চাঁদা দাবি এবং মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয় ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের (ডিজি) কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন রাজধানীর নিকুঞ্জ এলাকার ব্যবসায়ী ও লা পেসেতা ফ্যাশন অ্যান্ড ট্রেডিং করপোরেশনের মালিক ফরহাদ বিল্লা রুবেল। জানা গেছে, দেশে মাদকের প্রবাহ রোধে কাজ করা সংস্থাটির বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রায় সময়েই বিভিন্ন অনৈতিক কাজে জড়ানোর অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগে বিভিন্ন কমিটি গঠন করা হলেও বেশিরভাগ সময়েই সেই কমিটির প্রতিবেদন অন্ধকারেই থেকে যায়।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন