প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার ভেলামারী পাথার অপার সম্ভাবনা ও বিপুল সম্পদের ভান্ডার নিয়ে হাতছানি দিচ্ছে। দীর্ঘ ৬০ বছর ধরে লোহা, তামা, নিকেল, ম্যাঙ্গানিজ এবং মূল্যবান সোনার ভান্ডার নিয়ে ডাকছে এই প্রত্যন্ত পল্লী। দেশের প্রথম বিশ্বমানের লৌহ খনির আশায় পীরগঞ্জবাসী অপেক্ষা করলেও, তা এখনও কংক্রিটের ঢালাইয়ের নিচে রয়েছে। পীরগঞ্জবাসীর দীর্ঘ ৬০ বছরের আশা-আকাঙ্খার বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি। সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও সরকারের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করছে এই আশা-আকাঙ্খা।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, রংপুর জেলার পীরগঞ্জ উপজেলা রংপুর বিভাগের শেষ সীমান্ত। এর তিন দিকেই গাইবান্ধা, দিনাজপুর এবং বগুড়া জেলা অবস্থিত। শানেরহাট ইউনিয়নের ছোট পাহাড়পুর গ্রামের ভেলামারী পাথার বিশাল এই খনির অবস্থান। জিওলজিক্যাল সার্ভে অব বাংলাদেশ-(জিএসবি) ও পেট্রোবাংলা থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, পীরগঞ্জ উপজেলার শানেরহাট ও মিঠিপুর ইউনিয়নের মাঝামাঝি এই ভেলামারী পাথারে আবিষ্কৃত হয় দেশের প্রথম ও বিশ্বমানের লৌহ খনি। এখানে লৌহ ছাড়াও তামা, নিকেল, ম্যাঙ্গানিজ এবং মূল্যবান সোনার ভান্ডারের সন্ধান পাওয়া যায়।
১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের পর, তৎকালীন পাকিস্তান খনিজ সম্পদ বিভাগের বিজ্ঞানীরা স্যাটেলাইট তথ্যের ভিত্তিতে অনুসন্ধান শুরু করেন। বিমান থেকে শক্তিশালী চুম্বকদণ্ড ব্যবহার করে তারা মাটির নিচে বিভিন্ন ধাতব পদার্থের অস্তিত্ব শনাক্ত করেন। ১৯৬৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর, তৎকালীন সরকারের খনিজ সম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা স্যাটেলাইটের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য চিত্র অনুযায়ী একটি বিমান ও গাড়িবহর নিয়ে প্রায় ছয় বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই মাঠে আসেন। তখনকার খনিজ বিজ্ঞানীরা এখানে লোহার খনির উৎস হিসেবে নিশ্চিত হয়ে কংক্রিটের ঢালাই করে চিহ্ন দিয়ে প্রাথমিক জরিপ কাজ সম্পন্ন করেন।
১৯৬৭ সালের দিকে পাকিস্তান সরকার এখানে বড় পরিসরে অনুসন্ধান চালিয়ে উত্তোলনের প্রক্রিয়া শুরু করে, তবে নানা কারণে তা বন্ধ হয়ে যায়। স্বাধীনতার পরে বিভিন্ন সময়ে জরিপ ও খনন করে লোহাসহ বিভিন্ন মূল্যবান ধাতব উপাদানের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়। তারা মাটির ৯’শ ফুট নিচ থেকে ২২ হাজার ফুট পর্যন্ত উন্নত মানের লোহার স্তরের সন্ধান পান। প্রায় ১০ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় পাওয়া লোহার পাশাপাশি অন্যান্য মূল্যবান তামা, নিকেল ও ম্যাঙ্গানিজের অস্তিত্বও শনাক্ত হয়। অনুসন্ধানের সময় পাইপের ভেতর দিয়ে মাটির গভীরে বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো হয়, যার ফলে অনেক কুয়া ভেঙে যায়।
এক বছরের বেশি সময় ধরে ব্যাপক অনুসন্ধান শেষে ভেলামারিতে বোরিংকৃত চারটি মূল পাইপের উৎসমুখে কংক্রিটের ঢালাই দিয়ে বন্ধ করে ক্যাম্প গুটিয়ে চলে যান। তারা তখন বলেন, লৌহ অপরিপক্ব অবস্থায় আছে এবং ধারণা করেন আগামী ২০ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে এটি উত্তোলনযোগ্য হতে পারে। সেই হিসেবে ৪২ বছর আগে লোহা খনিটি পরিপক্কতা লাভ করেছে এবং বর্তমানে এটি উত্তোলনযোগ্য।
তবে, বিভিন্ন সময় খনির কার্যক্রম শুরুর উদ্যোগের কথা বলা হলেও বাস্তবে তা আলোর মুখ দেখেনি। ১৯৯৯ ও ২০০০ সালে নতুন করে কিছু কূপ খনন করে জরিপ পরিচালনা করা হয়। অনুসন্ধানে ঐ এলাকায় মূল্যবান খনিজ উপাদানের সন্ধান পাওয়া যায়। ২০২৩ সালের শেষের দিকে খনিটির মূল উৎস থেকে প্রায় ৪ কি.মি. দূরে কাশিমপুর গ্রামে ড্রিলিংয়ের মাধ্যমে কূপ খনন করা হয়, তবে সেখানে কি পাওয়া গেছে তা প্রকাশ করেনি জেএসবি।
চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি, মিঠিপুর ইউনিয়নের কাশিমপুর গ্রামে ভূতাত্ত্বিক খনন কূপ জিডিএইচ-৭৯/২৫ নামে খনিতে অনুসন্ধান কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। তিন মাসব্যাপী এই প্রকল্পে এক হাজার ২০০ মিটার পর্যন্ত খনন করার পরিকল্পনা নেয়া হয়, যা বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। তবে, অপর একটি সূত্র জানিয়েছে, রোপণকৃত ধান কাটার পর আবার খনন কাজ শুরু হতে পারে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের (জিএসবি) উপ-মহাপরিচালক প্রকৌশলী আকবর আলী জানিয়েছেন, এর আগে এটি একবার খনন করা হয়েছিল। এটিকে ইডিএস-১৫ বলা হয় এবং সেখানে কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। স্বাধীনতার পর ২০০০ সালে জিডিএইচ-৫৪ নামে একটি কূপ খনন করে ভূগর্ভের অবস্থা জানার জন্য সার্ভে করা হয়। পরবর্তীতে ২০২৩ সালেও মিঠিপুর ইউপি’র কাশিমপুর গ্রামে ৭৮/২৩ নামে অপর একটি কূপ খনন করা হয়, সেখানেও কিছু খনিজ সম্পদের উপাদান পাওয়া যায়। এ বছর এক হাজার ২০০ মিটার খনন করা হবে।
তিনি আরও জানান, এখানকার বেজমেন্ট শিলা শক্তিশালী হওয়ায় ধাতব খনিজ যেমন লোহা, তামা, নিকেল, ম্যাঙ্গানিজ এমনকি স্বর্ণও থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে অনুসন্ধান শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাবে না।
জিএসবির পরিচালক (ভূতত্ত্ব) আরিফ মাহমুদ জানিয়েছেন, তিন মাস ধরে খনন কাজ চলবে। খনিজ নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার পরই জানা যাবে এখানে ঠিক কী কী খনিজ সম্পদ রয়েছে। এই মুহূর্তে এটিকে লৌহখনি বলা সঠিক নয়।
খনিজ সম্পদ উত্তোলন করা হবে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রিসোর্স কনফার্ম করার পর যদি জানা যায়, এখানে পর্যাপ্ত পরিমাণ সম্পদ আছে এবং ব্যয়ের চেয়ে আয় বেশি হয়, তাহলে সরকারকে খনি থেকে উত্তোলন করতে অনুরোধ করা হবে।
এখানে কী ধরণের খনিজ সম্পদ থাকতে পারে, সে ব্যাপারে তারা জানিয়েছেন, এখানকার বেজমেন্ট হাই সুতরাং এখানে ধাতব খনিজ পদার্থ যেমন লোহা, তামা, নিকেল, ম্যাঙ্গানিজ এমনকি স্বর্ণও থাকতে পারে। তবে সঠিকটা জানার জন্য অনুসন্ধান শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
জিএসবি সূত্রে জানা গেছে, পীরগঞ্জের ভেলামারিতে অনুসন্ধান চালিয়ে উন্নতমানের আয়রন কোর (লোহা আকরিক) পাওয়া গেছে। লৌহ খনিটি আবিষ্কারের পর এখন প্রায় ৬০ বছর অতিবাহিত হতে চলেছে। ভূতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগ থেকে পাওয়া তথ্য মতে, পীরগঞ্জের ভেলামারি পাথারের এই লোহার খনিটি এখন পরিপক্কতা অর্জন করেছে। তাই এখান থেকে এখন উত্তোলনের সময় চলে এসেছে।
এদিকে, ভেলামারি পাথারসহ পার্শ্ববর্তী এলাকার প্রায় ছয় বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই বিশাল এলাকায় নতুন করে কূপ খননের কার্যক্রম শুরু হওয়ায় স্থানীয় জনগণের মধ্যে বিপুল উৎসাহ ও উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে। বিশ্বমানের লৌহ খনি থেকে উত্তোলন কার্যক্রম চালু হলে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক চিত্র বদলে যাবে। বদলে যাবে সার্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং এ অঞ্চলের মানুষের জীবন-যাত্রা। ব্যাপক কর্মসংস্থানের পাশাপাশি কৃষি, মজুর, শ্রমিকসহ সকল পেশার মানুষের জীবন যাত্রা পাল্টে যাবে। বিশাল কর্মযজ্ঞে কর্মচঞ্চল হয়ে উঠবে ৪টি থানার মানুষ। বর্তমান জনবান্ধব সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন পীরগঞ্জের আপামর জনগণ। তারা অনতিবিলম্বে পীরগঞ্জের মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা বিশাল খনিজ ভান্ডার থেকে খনিজ সম্পদ উত্তোলনের দাবি জানিয়েছেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন