প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
নকশা অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুরের আয়ুষ্কাল ৬০ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে, এই সময়ের হিসাব এখানেই শেষ হচ্ছে না। বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেয়াদ বাড়ানোর যে নতুন প্রবণতা দেখা দিয়েছে, তার আলোকে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক পরিকল্পনা ও সতর্ক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৬০ বছরের পরিবর্তে ৮০ থেকে ১০০ বছর পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে বিদ্যমান পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদন অব্যাহত রাখতে কেন্দ্রগুলোর মেয়াদ বাড়ানোর কৌশল গ্রহণ করা হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিশাল অঙ্কের নতুন বিনিয়োগ ছাড়াই পুরোনো অবকাঠামোকে কাজে লাগিয়ে আরও কয়েক দশক অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। ফলে, এটি সময় ও অর্থ—দুদিক থেকেই অত্যন্ত সাশ্রয়ী ও যুক্তিযুক্ত সমাধান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেয়াদ সফলভাবে বাড়ানোর উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে রাশিয়ার অন্যতম প্রধান বিদ্যুৎকেন্দ্র ‘কালিনিন নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট’ উল্লেখযোগ্য। মস্কো ও সেন্ট পিটার্সবার্গের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী এই কেন্দ্রে ১৯৮৪ সালে প্রথম ইউনিট এবং ১৯৮৬ সালে দ্বিতীয় ইউনিট চালু করা হয়েছিল। এরপর ২০০৪ ও ২০১১ সালে উৎপাদনে আসে তৃতীয় ও চতুর্থ ইউনিট।
বিদ্যুৎকেন্দ্রটির বিশেষত্ব হলো, নির্ধারিত ৩০ বছরের প্রাথমিক মেয়াদ শেষ হওয়ার পর চুল্লির প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং আধুনিকায়নের মাধ্যমে প্রথম দুই ইউনিটের আয়ুষ্কাল বাড়ানো হয়েছে। প্রথম ইউনিট ২০৪৪ সাল এবং দ্বিতীয় ইউনিট ২০৩৮ সাল পর্যন্ত চালুর পূর্ণ অনুমোদন পেয়েছে।
কালিনিন বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্যেষ্ঠ প্রধান শিফট কর্মকর্তা আলেকজান্ডার ইয়াকোভলেভিচ জানান, “পুরোনো ইউনিটের মেয়াদ বাড়াতে আমরা মডিউলার কন্ট্রোল প্যানেল পুরোপুরি বদলে ফেলে নতুন কন্ট্রোল সিস্টেম চালু করেছি। কেব্ল ও পাম্পিং ইকুইপমেন্ট প্রতিস্থাপনসহ কারিগরি নানা সংস্কারের পর রাশিয়ার পরমাণু নিয়ন্ত্রক সংস্থা মেয়াদ আরও ৩০ বছর বাড়ানোর অনুমোদন দেয়।”
বাংলাদেশের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ‘থ্রি প্লাস জেনারেশন’ (VVER-1200) প্রযুক্তিতে নির্মিত হচ্ছে, যা পৃথিবীর অন্যতম সেরা ও আধুনিক প্রযুক্তি হিসেবে পরিচিত। এই প্রযুক্তির মূল কাঠামো অত্যন্ত টেকসইভাবে নকশা করা হয়েছে। ৬০ বছরের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার পর এই কেন্দ্রের আয়ুষ্কাল আরও ২০ থেকে ৪০ বছর পর্যন্ত বাড়ানো কারিগরিভাবে সম্ভব।
তবে, এই সেঞ্চুরি স্পর্শ করতে হলে রূপপুরকে কিছু জরুরি শর্ত ও বৈজ্ঞানিক ধাপ অতিক্রম করতে হবে:
নিয়মিত ও নিবিড় পরিচর্যা: পারমাণবিক চুল্লির বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি ও স্পর্শকাতর যন্ত্রাংশকে শতভাগ কার্যকর রাখতে প্রথম দিন থেকেই সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে।
প্রযুক্তির ক্রমাগত আধুনিকায়ন: সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কন্ট্রোল প্যানেল, কেব্লিং ও পাম্পিং সিস্টেমের মতো যন্ত্রাংশগুলো নিয়মিত বিরতিতে হালনাগাদ ও প্রতিস্থাপন করতে হবে।
কঠোর নিরাপত্তা ছাড়পত্র: নির্দিষ্ট সময় পরপর আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পরমাণু নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর পরিদর্শন এবং ছাড়পত্র নিশ্চিত করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শফিকুল ইসলাম এ বিষয়ে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, “পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেয়াদ বাড়াতে যে উদ্যোগগুলো প্রয়োজন, তার মধ্যে অন্যতম হলো প্রধান প্রধান কম্পোনেন্টকে দীর্ঘ মেয়াদে সচল রাখা। এর জন্য এখন থেকেই নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও নিবিড় পরিচর্যার প্রস্তুতি নিতে হবে। আগে থেকে প্রস্তুতি না নিলে মেয়াদ বাড়ানোর এই সুফল আমরা পাব না।”
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভূতপূর্ব এই সুফল পুরোপুরি ঘরে তুলতে হলে কারিগরি দক্ষতার পাশাপাশি দরকার উচ্চমানের ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতা। রাশিয়ার কালিনিন মডেলের অভিজ্ঞতা এবং এখন থেকেই সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ ও বাড়তি সতর্কতা নিশ্চিত করা গেলে, রূপপুরের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আগামী এক শতাব্দীজুড়ে বাংলাদেশ পাবে পরিচ্ছন্ন ও নিরবচ্ছিন্ন আলো।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন