প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, বাংলাদেশ সরকার এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। সরকারের উদ্দেশ্য হচ্ছে, এলডিসিতে উত্তরণ বিলম্বিত করা নয়, বরং একটি টেকসই ও সুশৃঙ্খল উত্তরণ নিশ্চিত করা।
তিনি বলেন, ‘উত্তরণের জন্য এই অতিরিক্ত সময় আমাদের বিভিন্ন কারণে প্রয়োজন। আমরা বিলম্ব চাই না; বরং একটি টেকসই, স্থিতিশীল এবং কার্যকর অর্থনৈতিক রূপান্তরের জন্য এই সময় প্রয়োজন।’
আজ বৃহস্পতিবার আগারগাঁওয়ে এনইসি সম্মেলন কক্ষে ‘বাংলাদেশ প্রিপার্ডনেস ফর এলডিসি গ্রাজুয়েশব এন্ড রেশনাল ফর এক্সটেনশন অব দি প্রিপারেটরি প্রিয়ড’ শীর্ষক সেমিনারে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় অর্থমন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) এ সেমিনারের আয়োজন করেছে।
মন্ত্রী জানান, দায়িত্ব গ্রহণের পর বর্তমান সরকার জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি’র কাছে বাংলাদেশকে এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিমূলক সময় তিন বছর বাড়ানোর আবেদন জানায়।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, এই প্রস্তুতিমূলক সময়ে বাংলাদেশ একাধিক বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বৈশ্বিক বাণিজ্যে অস্থিরতা, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ ও সরবরাহ চেইনে বিঘ্নতা। এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করেছে এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ওপর সীমাবদ্ধতা তৈরি করেছে। সুতরাং, সরকার সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার ও টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি সুদৃঢ় করতে অগ্রাধিকার দিয়েছে।
জাতিসংঘের ওএইচআরএলএলএস পরিচালিত গ্র্যাজুয়েশন প্রস্তুতি মূল্যায়ন প্রতিবেদন উদ্ধৃত করে মন্ত্রী বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি এলডিসি উত্তরণের জন্য নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে যথেষ্ট অনুকূল নয়। অতএব, অতিরিক্ত প্রস্তুতিমূলক সময় প্রয়োজন।
আমরা ইতোমধ্যে ২৫টি অগ্রাধিকারভিত্তিক সংস্কার সমন্বিত একটি রোডম্যাপ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সংস্কার, ডিরেগুলেশন, প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিশালীকরণ ও মানবসম্পদ উন্নয়ন।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা ব্যবসা শুরু করার সময় এক বছর থেকে কমিয়ে ১৪ দিনে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে কাজ করছি। যাতে ১৫তম দিনে কোনো প্রতিষ্ঠান যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য এলসি খুলতে পারে।’
তিনি আরও জানান, ব্যবসা নিবন্ধন ও লাইসেন্সিং প্রক্রিয়ায় বিদ্যমান জটিলতা ও ওভারল্যাপ চিহ্নিত করে তা দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এভাবে ব্যবসা করার সময় ও খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর জন্য কাজ চলছে।
সেমিনারে জানানো হয়, সরকারের গঠিত জাতীয় গ্র্যাজুয়েশন মনিটরিং ও সমন্বয় কমিটি এবং পাবলিক-প্রাইভেট টাস্কফোর্সের মাধ্যমে বাস্তবায়ন কার্যক্রম তদারকি করা হচ্ছে।
মন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার মাত্র চার মাস আগে দায়িত্ব গ্রহণ করলেও ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।
সেমিনারে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি বলেন, বর্তমান সরকার একটি নাজুক অর্থনীতি ও দুর্বল আর্থিক খাতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনে কাজ করছে। এ লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মেয়াদ বৃদ্ধি ও উন্নয়ন অংশীদারদের অব্যাহত সমর্থন প্রয়োজন। তিনি বলেন, সংকট কাটিয়ে টেকসই উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে সকলের সহযোগিতা অপরিহার্য।
সেমিনারের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, কাঠামোগত ও আন্তর্জাতিকভাবে বিদ্যমান প্রধান ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেন। তিনি সুষ্ঠু ও টেকসই এলডিসি উত্তরণ নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে সরকারের কৌশলগত অগ্রাধিকার ও প্রস্তাবিত প্রস্তুতিকাল বৃদ্ধির সময়টি কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর জন্য একটি রোডম্যাপ তুলে ধরেন।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক পরিবেশ বর্তমানে অত্যন্ত গতিশীল বলে উল্লেখ করে বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার বলেন, সংস্কারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের গতি যেন থেমে না যায়, সেটি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্কের সুযোগ ও সম্ভাবনা ইউরোপীয় ইউনিয়ন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। তবে এ ক্ষেত্রে বাজার আরও উন্মুক্ত করা এবং লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম, অর্থ বিভাগের সচিব ড. মো. খায়রুজ্জামান মজুমদার, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খান, বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতি (ইঅচও)-এর সভাপতি আবদুল মুক্তাদির, জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী (ভারপ্রাপ্ত) গীতাঞ্জলি সিং, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ’র সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান, সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং-এর নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান, ফুটওয়্যার লেদারগুডস এন্ড এক্সেসরিজ এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি সৈয়দ নাসিম মহ্জুর, বাংলাদেশের পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি এবং ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রতিনিধিবৃন্দ।
এছাড়া সুইডেন, নরওয়ে, ইন্দোনেশিয়া, সুইজারল্যান্ড, থাইল্যান্ড, নেপাল ও ভিয়েতনামের রাষ্ট্রদূতরাও সেমিনারে বক্তব্য প্রদান করেন।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান আহসান হাবিব।
রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনারগণ টেকসই এলডসি উত্তরণ নিশ্চিত করতে রপ্তানি বহুমুখীকরণ, আর্থিক খাতে প্রয়োজনীয় সংস্কার সাধন এবং করের আওতা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সেমিনারে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার ও বিদেশি কূটনৈতিক মিশনের প্রতিনিধিবৃন্দ, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধিবৃন্দ, বেসরকারি খাত, থিংক ট্যাঙ্ক এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থার প্রতিনিধিগণ অংশগ্রহণ করেন।
বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (ইউএনসিডিপি)-এর নিকট এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতিকাল আরও তিন বছর বৃদ্ধির জন্য অনুরোধ জানিয়েছে।
তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে পরামর্শ ও বিদ্যমান পরিস্থিতি বিচার-বিশ্লেষণ করে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (ইউএনসিডিপি) ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে এবং তাদের মূল্যায়ন প্রতিবেদন জাতিসংঘ অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ইকোসক)-এর নিকট দাখিল করেছে। এখন ইকোসক বর্ধিত প্রস্তুতিকাল নিয়ে এই বিষয়ে বিবেচনা করে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রস্তাব চূড়ান্তভাবে অনুমোদনের জন্য পাঠাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এ প্রেক্ষাপটে এলডিসি হতে বাংলাদেশের উত্তরণ সংক্রান্ত প্রস্তুতি কার্যক্রম ও তা বাস্তবায়নে অর্জিত অগ্রগতি এবং সুষ্ঠু ও টেকসই উত্তরণ নিশ্চিত করতে এই প্রস্তুতিকাল বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বাংলাদেশে অবস্থিত বিদেশি কূটনৈতিক মিশন, উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য অংশীজনদের অবহিত করার লক্ষ্যে এ সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন