প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
দেশের বিভিন্ন জায়গায় টানা বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও বন্যার কারণে জনজীবন বর্তমানে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। জনজীবনে বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা সহ বহু স্থানে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এদিকে, বিভিন্ন জেলায় উজানের ঢলে বন্যা দেখা দিয়েছে। ফলে অসংখ্য মানুষ এখন পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। এমন পরিস্থিতির মধ্যে, পানিবাহিত এবং সংক্রামক রোগের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে সতর্ক করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে, তারা সতর্ক থাকার জন্য ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েড, চর্মরোগ, ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন (ইউটিআই), হেপাটাইটিস এ ও ই-সহ বিভিন্ন রোগের বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও আইইডিসিআরের সাবেক উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন বলেছেন, বন্যা এবং জলাবদ্ধতার সময় দুই কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়। প্রথমত, বিশুদ্ধ পানি, নিরাপদ খাদ্য এবং স্যানিটেশন ব্যবস্থার সংকট দেখা দেয়। চারপাশে পানি থাকলেও তা পানযোগ্য নয়, ফলে দূষিত খাবার ও পানির মাধ্যমে ডায়রিয়া, কলেরা এবং অন্যান্য পানিবাহিত রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে।
ডায়রিয়া সাধারণত দূষিত পানি ও খাদ্য গ্রহণের ফলে হয়ে থাকে। এটি শরীর থেকে দ্রুত পানি ও প্রয়োজনীয় খনিজ লবণ বের করে নেয়, ফলে রোগী মারাত্মক পানিশূন্যতায় ভুগতে পারেন। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এই রোগ প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। কলেরা হল ডায়রিয়ার কারণে হওয়া একটি সংক্রামক রোগ, যা যোগাযোগপূর্ণ ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের ফলস্বরূপ হয়ে থাকে। শারীরিক অবস্থার মধ্যে তীব্র ডায়রিয়া, বারবার বমি, অতিরিক্ত তৃষ্ণা, দুর্বলতা, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া এবং রক্তচাপ কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ উপস্থিত হতে পারে। গুরুতর অবস্থায় কিডনির জটিলতা বা শকের ঝুঁকি সৃষ্টি হতে পারে।
ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, রোগের কারণ যদিও আলাদা, তবে ডায়রিয়া এবং কলেরার ক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি বিষয়টি হল শরীরের পানিশূন্যতা প্রতিরোধ করা। এজন্য দ্রুত ওরস্যালাইন খাওয়ানো, নিরাপদ পানি পান করানো এবং গুরুতর লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্বিতীয় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি আসতে পারে জলাবদ্ধতা ও বন্যার পরিবেশগত প্রভাব থেকে। এ সময় পানিতে ডুবে দুর্ঘটনা, সাপের কামড়, জলাবদ্ধ পানিতে থাকা কাচ, টিন বা ধারালো বস্তুতে পা কেটে সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশেষজ্ঞরা জানান, বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পরেও ঝুঁকি শেষ হয় না। এ সময় টাইফয়েড এবং হেপাটাইটিস এ ও ই-এর মতো পানিবাহিত রোগের প্রকোপও বাড়তে পারে। টাইফয়েডের জটিলতায় অন্ত্রে রক্তক্ষরণ, অন্ত্র ছিদ্র হয়ে যাওয়া, হেপাটাইটিস, পিত্তথলির প্রদাহ এবং এমনকি মৃত্যুও ঘটে যেতে পারে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর প্রায় ৪ লাখ ৭৮ হাজার মানুষ টাইফয়েডে আক্রান্ত হন এবং প্রায় ৮ হাজার মানুষ মারা যান। এগুলোর মধ্যে বড় অংশই শিশু।
হেপাটাইটিস এ ও ই সাধারণত অন্যান্য হেপাটাইটিসের তুলনায় কম জটিল, কিন্তু গর্ভবতী নারীদের জন্য হেপাটাইটিস ই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই নিরাপদ পানির ব্যবহার এবং খাবার প্রস্তুত ও দৈনন্দিন কাজে বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
এ ছাড়া, দীর্ঘ সময় স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে বা আশ্রয়কেন্দ্রে গাদাগাদি করে থাকার কারণে স্ক্যাবিসসহ বিভিন্ন চর্মরোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে। সময়মতো চিকিৎসা না হলে এসব সংক্রমণ থেকে কিডনির জটিলতা দেখা দিতে পারে। শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে নিউমোনিয়া, শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ, হাঁপানি এবং শ্বাসকষ্টের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়।
বন্যাকবলিত এলাকায় নারী-পুরুষ উভয়েই ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশনে (ইউটিআই) আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যদিও নারীদের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। যদি মানুষ ও গবাদিপশু একই আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করে, তাহলে অ্যানথ্রাক্সের মতো প্রাণিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশু, বয়স্ক, গর্ভবতী নারী এবং ডায়াবেটিস, হৃদরোগ বা হাঁপানির মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে আছেন। জ্বর, ডায়রিয়া, পেশিব্যথা, কিংবা অন্য কোনো গুরুতর উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে, নিরাপদ টয়লেট ব্যবহার, বিশুদ্ধ পানি পান, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং প্রয়োজন ছাড়া জলাবদ্ধ পানিতে না নামার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। যদি পানিতে নামতেই হয়, তাহলে পরে সাবান-পানি দিয়ে ভালোভাবে শরীর পরিষ্কার করতে এবং শুকনো ও পরিষ্কার পোশাক পরিধান করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন