প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
প্রায় ২০০ যাত্রী বিলাসবহুল প্রমোদতরিতে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছিলেন, বিশ্বভ্রমণের স্বপ্ন নিয়ে। সমুদ্রের জীবনযাপনের আশায় কেউ ৪ লাখ ৪০ হাজার ডলার পর্যন্ত ব্যয় করেছেন, আবার কেউ বিক্রি করেছেন নিজেদের সব সম্পদ। কিন্তু ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় তাদের স্বপ্নে হঠাৎ ছেদ পড়েছে। বর্তমানে কম্বোডিয়ায় আটকা পড়েছেন এসব যাত্রী।
ভিলা ভি রেসিডেন্সেস, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রমোদতরি পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান, হঠাৎ তাদের কার্যক্রম স্থগিত করেছে। যাত্রীদেরকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে জাহাজ ছেড়ে যেতে বলা হয়েছে। ফলে অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও দূর থেকে কাজ করা কর্মীদের নতুন করে থাকার জায়গা খুঁজতে হচ্ছে, নিজেদের দেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে।
গত মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) ভিলা ভি রেসিডেন্সেস কর্তৃপক্ষ জানায়, ইরান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় তাদের কার্যক্রম কম্বোডিয়ায় স্থগিত করা হয়েছে।
কোম্পানির তথ্যমতে, এশিয়ার কিছু অঞ্চলে প্রতি কেবিনের মাসিক জ্বালানি ব্যয় ১ হাজার ৮০০ ডলার থেকে বেড়ে ৬ হাজার থেকে ৮ হাজার ডলারে পৌঁছেছে। এই পরিস্থিতিতে তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম আর্থিকভাবে টেকসই রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
কম্বোডিয়ার প্রিয়াহ সিহানুক প্রদেশের উপগভর্নর লং দিমাঞ্চে জানিয়েছেন, যাত্রীদের জাহাজ থেকে নামার জন্য মাত্র সাত ঘণ্টা সময় দেওয়া হয়েছিল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বাহামার পতাকাবাহী জাহাজটি ২৩ অক্টোবর থাইল্যান্ড থেকে ২০৩ জন যাত্রী ও ১৫৬ জন ক্রু নিয়ে কম্বোডিয়ায় পৌঁছায়। সেখান থেকে ভিয়েতনামের উদ্দেশে যাত্রা করার কথা ছিল জাহাজটির।
লং দিমাঞ্চে বলেন, ‘হঠাৎ জাহাজ থেকে নেমে যাওয়ার নির্দেশের কারণে অনেক অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও দূর থেকে কাজ করা মানুষ নিজ দেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে আবাসনহীন হয়ে পড়েছেন।’
কিছু যাত্রী কম্বোডিয়া ছেড়ে বিমানে অন্যত্র চলে গেছেন। অন্যরা পরবর্তী করণীয় ঠিক করতে সিহানুকভিলের বিভিন্ন হোটেলে অবস্থান করছেন।
২০০ মিটার দীর্ঘ জাহাজটির ৩১ অক্টোবর জ্বালানি নিয়ে বন্দর ছাড়ার কথা ছিল। তবে যাত্রীদের নিয়ে এর পরবর্তী কার্যক্রম কী হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
‘আমাদের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে’
জাহাজটির দুই যাত্রী ল্যানেট ক্যানেন ও জোহান বোদিন স্বামী-স্ত্রী। তারা বিবিসিকে জানান, মঙ্গলবার সকাল ৬টায় তাদের বলা হয়, দুপুর ২টার মধ্যে জাহাজ ছেড়ে যেতে হবে।
এই দম্পতি আরও জানান, প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক সংকট সম্পর্কে যাত্রীরা আগে থেকেই কিছুটা জানতেন। তবে কোনো বিনিয়োগকারী এসে শেষ পর্যন্ত তাদের সমুদ্রযাত্রা বাঁচাবেন, সেই আশা তারা ছাড়েননি।
তারা বলেন, ‘যদিও এমন কিছু ঘটতে পারে, তার ইঙ্গিত ছিল, তবু বাস্তবে যখন তা ঘটল, আমরা বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। আমরা ভেঙে পড়েছিলাম। মনে হচ্ছিল, আমাদের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।’
তারা আরও বলেন, ‘একে অপরকে সান্ত্বনা দিতে যাত্রীরা অনেককে জড়িয়ে ধরেছেন, কেঁদেছেন এবং কী ঘটেছে, তা মেনে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।’ তবে আকস্মিকভাবে যাত্রা থেমে গেলেও জাহাজে কাটানো সময়কে সার্থক বলে মনে করেন তারা।
বিবিসিকে এই দম্পতি বলেন, ‘ওডিসিতে কাটানো আমাদের দুই বছর দারুণ ছিল। রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা, বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণ এবং পথে তৈরি হওয়া বন্ধুত্বগুলো আমরা উপভোগ করেছি।’ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্য কোনো দেশে যাওয়ার আগে তারা কিছুদিন কম্বোডিয়ায় থাকার পরিকল্পনা করেছেন।
আরেক যাত্রী হলি হেনেসি জানিয়েছেন, জাহাজটি আবারও যাত্রা শুরু করবে, এমন আশায় তিনি কম্বোডিতে থেকে যেতে চান। বিবিসিকে তিনি বলেন, ‘তারা যতক্ষণ না বলছে যে সব শেষ, একেবারেই শেষ, ততক্ষণ আমি হাল ছাড়ছি না।’
কেবিনের দাম ছিল সর্বোচ্চ ৪ লাখ ৪০ হাজার ডলার।
ভিলা ভি ওডিসি ২০২৪ সালের অক্টোবরে উত্তর আয়ারল্যান্ডের বেলফাস্ট থেকে বিশ্বভ্রমণে যাত্রা শুরু করে। সাড়ে তিন বছর ধরে চলার পরিকল্পনা করা এই ভ্রমণে প্রায় ১৫০টি দেশ ঘোরার কথা ছিল। যাত্রীরা জাহাজের কেবিন কিনে অথবা ভাড়া নিয়ে সেটিকে নিজেদের স্থায়ী আবাস হিসেবে ব্যবহার করতে পারতেন।
বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, জাহাজে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য কেবিনের দাম ছিল ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ৪ লাখ ৪০ হাজার ডলার। আর ভাড়ার কেবিনের মাসিক খরচ শুরু হয়েছিল ৩ হাজার ৫০০ ডলার থেকে। জাহাজটিতে ছিল রেস্তোরাঁ, বার, সুইমিং পুল, বিনোদনের বিভিন্ন ব্যবস্থা এবং পিকলবল খেলার কোর্ট।
তবে যাত্রা শুরুর পর থেকেই নানা সমস্যায় পড়তে হয় প্রতিষ্ঠানটিকে। মেরামতের কাজের কারণে বেলফাস্ট থেকে যাত্রা শুরু করতে চার মাস দেরি হয়েছিল। এ ছাড়া জাহাজটির সর্বোচ্চ ৬৫০ জন যাত্রী ধারণক্ষমতা থাকলেও কখনোই সেই সংখ্যক যাত্রী ওঠেননি।
ক্রুজবিষয়ক ব্লগার ও যাত্রী র্যান্ডি ক্যাসিংহাম জানিয়েছেন, জাহাজটিতে সর্বোচ্চ প্রায় ৩৫০ জন বাসিন্দা ছিলেন। যাত্রীদের জাহাজ থেকে নেমে যেতে বলার পর তাদের যথাযথ সহায়তা দিতে প্রতিষ্ঠানটি ব্যর্থ হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বেড়েছে জ্বালানি ব্যয়।
ভিলা ভি রেসিডেন্সেস জানিয়েছে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি তাদের ভ্রমণ কার্যক্রম আর্থিকভাবে টিকিয়ে রাখার প্রচেষ্টাকে বড় ধরনের চাপে ফেলেছে। জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য প্রতিষ্ঠানটি আগেই ভ্রমণসূচির গতি কমিয়েছিল এবং বিভিন্ন বন্দরে অবস্থানের সময় বাড়িয়েছিল। কিন্তু তাতেও প্রয়োজনীয় ব্যয় সাশ্রয় করা সম্ভব হয়নি।
প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, ‘এত বড় অঙ্কের ব্যয়বৃদ্ধি সরাসরি বাসিন্দাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। ফলে আয় ও ব্যয়ের মধ্যে তৈরি হওয়া ঘাটতি বর্তমান পরিচালনব্যবস্থাকে অসহনীয় আর্থিক চাপে ফেলেছে।’
আগামী ৬০ দিন আর্থিক কাঠামো পুনর্গঠন এবং নতুন বিনিয়োগ সংগ্রহের কাজে ব্যয় করার পরিকল্পনা জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে এ প্রচেষ্টা সফল হবে, এমন নিশ্চয়তা দিতে পারেনি তারা। যাত্রীদের জাহাজ থেকে নামার প্রক্রিয়া সমন্বয় এবং অস্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা খুঁজে পেতেও সহায়তা করার কথা জানিয়েছে কোম্পানিটি।
সমুদ্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের স্বপ্নে নিজেদের সঞ্চয় বিনিয়োগ করা যাত্রীদের জন্য এ সিদ্ধান্ত আবাসন, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ ভ্রমণ পরিকল্পনা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। তারপরও কেউ কেউ আশা করছেন, একদিন আবারও যাত্রা শুরু করবে ওডিসি।
হলি হেনেসির ভাষায়, সমুদ্রে স্বাধীনভাবে জীবন কাটানোর অভিজ্ঞতার পর সাধারণ জীবনে ফিরে যাওয়া কঠিন হবে। তবে তিনি বলেন, ‘কম্বোডিয়ায় সময় কাটানোও খুব খারাপ কিছু নয়।’
তথ্যসূত্র: বিবিসি ও এএফপি
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন