প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলায় সরকারি স্যানিটেশন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। টুইন পিট ল্যাট্রিন নির্মাণের জন্য নিম্নমানের কাজ, উপকারভোগীদের কাছ থেকে অর্থ আদায় এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না করার অভিযোগের কারণে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বেড়ে গেছে।
গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর তদন্ত কমিটি গঠন করে তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য বলা হলেও এখন মাস পেরিয়ে গেছে। স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন যে, এই ঘটনার সত্যতা ধামাচাপা দিতেই দেরি হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ রয়েছে, “উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল দপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী আবু সিয়াম এবং একটি প্রভাবশালী মহলকে ‘ম্যানেজ’ করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্পে অনিয়ম ও দায়িত্বহীনতা রক্ষা করছে। তদন্ত কমিটি গঠনের পরও নির্ধারিত সময়ে প্রতিবেদন জমা না হওয়া এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নীরবতা অভিযোগগুলোর সত্যতা আরও স্পষ্ট করেছে।
বিষয়টি নিয়ে উজানচর ইউনিয়নের স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি সুজন, বিএনপি নেতা বাবুল, মাসুমসহ অন্যান্যরা বলেন, ‘তদন্ত কমিটি গঠনের পরেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না থাকায় মনে হচ্ছে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। আমরা নিম্নমানের কাজ বরদাস্ত করব না।’
তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক উপজেলা ইঞ্জিনিয়ার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘আমি বদলি হয়ে গেছি, কিন্তু এরপরও আমাকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সহকারী প্রকৌশলীকে বলেছি, উনি বিষয়টি দেখবেন।’
অন্যদিকে, তদন্ত কমিটির সদস্য সচিব উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মিজানুর রহমান রিপোর্ট প্রকাশ না করেই হজ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে চলে গেছেন।
প্রকল্পের সূত্রে জানা যায়, উজানচর ইউনিয়নে হতদরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য ২২৯টি টুইন পিট ল্যাট্রিন নির্মাণে ৮০ লাখ ৩৯ হাজার ৭২ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রতিটি ল্যাট্রিনের ব্যয় ধরা হয় ৩৫ হাজার ১০৮ টাকা (ওয়াই জংশনসহ)। তার মানে ১৩টি ইউনিয়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট ১০ কোটি ৪৫ লাখ ১৬ হাজার ৫১৬ টাকা ব্যয় হওয়ার কথা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ২৫ জুলাই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স ইসলাম এন্টারপ্রাইজ’-এর সঙ্গে চুক্তি সই হয়। চুক্তি অনুসারে ছয় মাসের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও প্রায় দুই বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও প্রকল্পটি এখনো সম্পূর্ণ হয়নি। কার্যাদেশ অনুযায়ী সাত কর্মদিবসের মধ্যে কাজ শুরু হওয়া প্রয়োজন ছিল, তবে সেটারও বাস্তবায়ন হয়নি।
সরেজমিনে উজানচর গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, ল্যাট্রিন নির্মাণের সামগ্রী তৈরিতে নিম্নমানের ইট, সুরকি, বালু এবং রিং তৈরিতে দুর্বল মানের তার ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। বর্তমানে নির্মাণাধীন রিং, স্ল্যাব ও পাইপের মান ও আকার শিডিউল অনুযায়ী না হওয়ায় তা দ্রুত নষ্ট হতে পারে, স্থানীয়রা এ বিষয়ে অভিযোগ করেছেন।
লোকজন অভিযোগ করেছেন যে, ল্যাট্রিন সরবরাহের কথা বলে বিভিন্ন এলাকা থেকে অর্থ আদায় করা হয়েছে। অনেকেই এখনো ল্যাট্রিন পাননি। এই ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে চরম অসন্তোষ ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। ফরদাবাদ ইউনিয়নে ২৪৫টি ল্যাট্রিন নির্মাণের অনুমোদন থাকলেও মাত্র ১২৯টি ল্যাট্রিন নির্মাণ করেই পুরো বিল উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে।
এই পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার এবং জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী আবু সিয়ামের বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বাকি কাজ বাস্তবায়নের কোনো কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়ার কারণে প্রকল্পটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স ইসলাম এন্টারপ্রাইজ’-এর প্রতিনিধি দেওয়ান শহিদুল হক মুঠোফোনে জানান, ‘ভালোভাবে কাজ কীভাবে করব? এখানে (বাঞ্ছারামপুর) সব রাক্ষস এবং শকুনে ভরা। ওদের ম্যানেজ করতে গিয়ে আমি লসে পড়ে গেছি। এ কারণে নিম্নমানের কাজ হচ্ছে।’
উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আবু সিয়াম বলেন, ‘কয়েকজন উপকারভোগীর কাছ থেকে টাকা নেওয়ার বিষয়ে অভিযোগ ছিল। পরে আমি ঠিকাদারকে লিখিতভাবে বিষয়টি সমাধান করেছি। নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করে কাজ হচ্ছে বিষয়েও জানতে পেরেছি। সরেজমিনে গিয়ে বিষয়টি দেখব।’
ফরদাবাদ ইউনিয়নে কাজ শেষ না করেই বিল উত্তোলনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, ‘এই বিষয়ে কথা বলবেন না, এটা বাদ দেন।’ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. তারিকুল ইসলাম বলেন, ‘উপজেলা প্রকৌশলী অফিসে আসেন না। অন্য সদস্য প্রকল্প কর্মকর্তা (পিআইও) মিজানুর রহমান হজে গেছেন। এ জন্য রিপোর্ট প্রকাশে দেরি হচ্ছে।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. শফিউল হক বলেন, ‘এ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ পর্যায়ে। যদি কাজ শেষ করতে না পারে, তবে কার্যাদেশ বাতিল করে দেব। তবে তিনি নিম্নমানের কাজের প্রসঙ্গটি মুঠোফোনে এড়িয়ে যান।’
দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির (দুদক অংশ) বাঞ্ছারামপুর উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসেন রিপন বলেন, ‘কালের কণ্ঠসহ বিভিন্ন পত্রিকায় গরিবের টয়লেট নির্মাণের ক্ষেত্রে অনিয়মের বিষয়টি আমার নজরে এসেছে। আমরা যথাসম্ভব দ্রুত বিষয়টি যথাযথ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করব।’
এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক আবু সাইদ বলেন, ‘বিষয়টি আমি অবগত। আমি বাঞ্ছারামপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে তদন্ত করে আমাকে জানানোর জন্য বলেছি।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন