প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
আঞ্চলিক নিরাপত্তার পরিস্থিতির অবনতির কারণে এবং ভঙ্গুর স্থিতিশীলতার মধ্যে ইয়েমেনের হুত্থিরা সউদি আরবের বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা এবং বড় শহরগুলোকে লক্ষ্য করে হামলার পরিমাণ বৃদ্ধি করছে। এর ফলে আঞ্চলিক সংঘাতের আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তবে, সউদি বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনায় হামলার কারণ কী? হুত্থিরা তাদের হামলাকে সউদি হস্তক্ষেপ ও নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে প্রতিশোধ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
২০১৫ সাল থেকে ইয়েমেনে সউদি সামরিক আগ্রাসনে ৪ লাখেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে, যেখানে সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে ইয়েমেনের সার্বভৌমত্ব, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং জাতীয় সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দীর্ঘদিনের সউদি হস্তক্ষেপ। হুত্থিদের দাবি, সউদি সামরিক হস্তক্ষেপ, এর নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা এবং ইয়েমেনের নৌ ও বিমানবন্দরগুলোর ওপর চাপানো নিষেধাজ্ঞা ইয়েমেনের মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকটকে আরও গভীর করেছে।
২০২২ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি সীমান্তপারের বড় ধরনের হামলা অনেকাংশে বন্ধ রেখেছিল। কিন্তু হুত্থি সমর্থক ইরানের বিরুদ্ধে সউদি মিত্র আমেরিকা-ইসরায়েলের যুদ্ধ, ইয়েমেনের ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অমিমাংসিত পরস্পরবিরোধী অবস্থান এবং দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে বিরোধ পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে।
সেপ্টেম্বরে হুত্থিরা ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলজুড়ে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ সম্প্রসারণ করে এবং বাব আল-মান্দাবের কাছাকাছি কৌশলগত অবস্থান দখল করে। এর প্রতিক্রিয়ায় সউদি সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী পাল্টা অভিযান পরিচালনা করে। বিশ্লেষকদের মতে, ইয়েমেনে রিয়াদের সম্পৃক্ততার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যয় বাড়ানো হুত্থিদের বৃহত্তর কৌশলের অংশ। তাদের লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে সানা ও উত্তর ইয়েমেনের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা, ভবিষ্যৎ সরকারে নির্ধারক ভূমিকা নিশ্চিত করা, বিমানবন্দর ও সমুদ্রবন্দর পুনরায় চালু করা, বিদেশি সামরিক চাপ কমানো এবং বাব আল-মান্দাবের কাছে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করা।
হুত্থিরা কি ইরানের হয়ে কাজ করছে, নাকি নিজেদের লক্ষ্য অনুসরণ করছে? এই দুই বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ হুত্থিদের ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণের মাত্রা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। ইরান তাদের অস্ত্রপ্রযুক্তি, সামরিক দক্ষতা ও অন্যান্য সহায়তা প্রদান করেছে। এর ফলে হুতিরা দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন আকাশযান ব্যবহারের সক্ষমতা অর্জন করেছে। তবে, রয়টার্স চলতি মাসে জানিয়েছে, ইয়েমেনের ওপর নিষেধাজ্ঞাতে ছাড় আদায় এবং ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ কমাতে ওয়াশিংটনকে রাজি করানোর জন্য সউদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ওপর চাপ সৃষ্টি করাও এসব হামলার অন্যতম উদ্দেশ্য।
১৯৯০-এর দশকে উত্তর ইয়েমেনে হুত্থিদের এই আন্দোলনের উত্থান ঘটে এবং ২০১৪ সালে তারা সানা দখল করে। তাদের উচ্চাকাঙ্খার পেছনে রয়েছে বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ক্ষমতা, ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ ও স্বীকৃতি নিয়ে লড়াই। বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা ও নৌপথে হামলার উদ্দেশ্য কী? সামরিকভাবে শক্তিশালী সউদি আরবের বিরুদ্ধে চাপ সৃষ্টি করার জন্য হুত্থিরা অর্থনৈতিকভাবে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে হুমকির মুখে ফেলছে। তারা সামরিক অভিযান ও বিধিনিষেধের জবাব হিসেবে এই চাপ সৃষ্টির যুক্তি তুলে ধরেছে, যার মাধ্যমে দেশটির বিমানবন্দর, পাইপলাইন, শোধনাগার ও জাহাজ চলাচলের টার্মিনালে হামলা হলে বিমান চলাচল ব্যাহত হতে পারে, নিরাপত্তা ব্যয় বাড়তে পারে, বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়াতে পারে এবং জ্বালানি রপ্তানি হুমকির মুখে পড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ সংঘাতের গতিপথ কীভাবে বদলে দিয়েছে? হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় সউদি আরব পশ্চিমাঞ্চলের তেল অবকাঠামো এবং লোহিত সাগর দিয়ে রপ্তানির পথের ওপর আরও নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে ইয়ানবুর কাছের স্থাপনাগুলোও রয়েছে।
এসব পথে হুমকি সৃষ্টি হলে উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি রপ্তানি জটিল হয়ে উঠতে পারে, ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে ইরানের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়তে পারে এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যেতে পারে। বাব আল-মান্দাব কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? এই প্রণালি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। সুয়েজ খালের মধ্য দিয়ে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে পণ্য পরিবহনের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। এএফপি জানিয়েছে, গত মাসে দ্রুতগতির অভিযানে হুত্থিরা ইয়েমেনের পুরো লোহিত সাগর উপকূল দখল করে। বাব আল-মান্দাব ও হরমুজ প্রণালি, উভয় পথেই চলাচল ব্যাহত হলে তেলবাহী জাহাজের বিমা প্রিমিয়াম, পণ্য পরিবহন ব্যয় এবং জ্বালানির দাম বেড়ে যেতে পারে।
কীভাবে সংঘাতের অবসান হতে পারে? হুত্থিরা ইয়েমেনের রাজনৈতিক স্বীকৃতি এবং বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপ কমানোর দাবিতে লড়ছে, যদিও দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের জন্য শুধু সামরিক প্রতিরোধ যথেষ্ট নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইয়েমেনের জনগণের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও মানবিক চাহিদার সমাধানকে প্রাধান্য দিয়ে একটি রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা পরস্পর প্রতিশোধমূলক হামলার ক্রমবর্ধমান চক্রের চেয়ে অধিক স্থায়ী পথ।
সূত্র: গাল্ফ নিউজ, উইকিপিডিয়া।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন