প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
‘দ্য হাচিন্স স্কুলে মাধ্যমিক পর্যায়ের গণিতের শিক্ষক এবং ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) অধীনে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ক্রিকেট আম্পায়ার।’
স্যাম নোগাইস্কির প্রোফাইলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম লিংকডইনে এই পরিচয় দেখলে মনে হবে, এক দেহে দুই জগতের মানুষ! তিনি গণিত পড়ান এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেট পরিচালনা করেন।
এটি কোনো রসিকতা নয়। মিরপুর শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ-ওয়েস্ট ইন্ডিজ টেস্টের প্রথম দুই দিনে যাকে কয়েকবার লাইট মিটার দিয়ে আলো পরিমাপ করতে দেখা গেছে, তিনিই স্যাম নোগাইস্কি।
নোগাইস্কির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কটি গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে। গত বছর এ দেশে তার জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছিল। সিলেটে বাংলাদেশ-আয়ারল্যান্ড ম্যাচের মাধ্যমে মাঠের আম্পায়ার হিসেবে তার টেস্ট অভিষেক ঘটে। এরপর ওই সিরিজে মিরপুর টেস্টেও একই দায়িত্ব পালন করেন।
বছর ঘুরতেই নোগাইস্কি আবার মিরপুরে; এবার বাংলাদেশ-ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্ব তার কাঁধে। অর্থাৎ, ৪৭ বছর বয়সী এই অস্ট্রেলিয়ান তার প্রথম তিন টেস্টই পরিচালনা করছেন বাংলাদেশে!
আইসিসি নোগোইস্কির ওপর আস্থা রেখেছে কারণ তার আম্পায়ারিং ক্যারিয়ার যথেষ্ট সমৃদ্ধ। ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তার অভিষেক ঘটে। এই ৯ বছরে তিনি ছেলেদের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মাঠের আম্পায়ার হিসেবে ৬৯ ম্যাচে দায়িত্ব পালন করেছেন; টিভি আম্পায়ার হিসেবে ১৭ ম্যাচে।
এক সময় মেয়েদের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেও তিনি সক্রিয় ছিলেন—দুই সংস্করণ মিলিয়ে ২৯ ম্যাচে আম্পায়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রথম শ্রেণি, লিস্ট ‘এ’ ও ঘরোয়া টি-টোয়েন্টিতেও তিনি পরিচিত মুখ।
অস্ট্রেলিয়ার মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন রাজ্য তাসমানিয়া। স্যাম নোগোইস্কি সেই রাজ্যের রাজধানী হোবার্টের সন্তান। সেখানকার নির্মল, শান্তিপূর্ণ পরিবেশের মতোই তিনি যে শান্তিপূর্ণ স্বভাবের মানুষ, সেটি মাঠে তার প্রতিটি পদক্ষেপে বোঝা যায়।
মাত্র ২১ বছর বয়স থেকে নোগোইস্কি শিক্ষকতা করে আসছেন। হোবার্টের রোজেটা হাই স্কুল, ফ্রেন্ডস স্কুল হয়ে থিতু হয়েছেন হাচিন্স স্কুলে। দেড় যুগেরও বেশি সময় তিনি এই স্কুলে কাটিয়ে ফেলেছেন।
২০১২ সালে অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় আম্পায়ার প্যানেলে যোগ দেন নোগোইস্কি। চার বছর পর তিনি ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার আন্তর্জাতিক প্যানেলে জায়গা পান। ওই মৌসুমেই ভারতের রঞ্জি ট্রফিতে আম্পায়ার হিসেবে দাঁড়ান।
গণিতের শিক্ষক যে ক্রিকেটে দুর্দান্ত আম্পায়ারও হতে পারেন—নোগাইস্কি তার জীবন্ত উদাহরণ। ২০২৩ থেকে ২০২৫—টানা তিনবার তিনি অস্ট্রেলিয়ার বর্ষসেরা আম্পায়ার নির্বাচিত হয়েছেন। হাচিন্স স্কুলের ওয়েবসাইট জানাচ্ছে, ২০১১ ও ২০১২ সালেও তাসমানিয়ার বর্ষসেরা আম্পায়ার ছিলেন তিনি। ২০১২ সালে তিনি তাসমানিয়ার প্রথম আম্পায়ার হিসেবে জাতীয় প্যানেলে জায়গা পান।
তবে নোগাইস্কিও সাধারণের মতো ছোটবেলায় ক্রিকেটার হতে চেয়েছিলেন। তাসমানিয়ান প্রিমিয়ার ক্রিকেটে ক্ল্যারেন্স ক্লাবের হয়ে অলরাউন্ডার হিসেবে খেলেছেন। কিন্তু চোট তার ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন থামিয়ে দেয়।
ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়াকে (সিএ) দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নোগাইস্কি বলেছিলেন, ‘আমি খেলাটা ভীষণ ভালোবাসি। এমনকি যখন আম্পায়ারিং করি না, তখনো ক্রিকেট দেখি। ১৮ বছর বয়সে চোটে পড়ি। এক বছর মাঠের বাইরে থাকতে হয়। তারপর পরীক্ষামূলকভাবে আম্পায়ারিং শুরু করি।’
আম্পায়ারিংয়ের প্রতি আকর্ষণই স্যাম নোগাইস্কিকে সাফল্য এনে দিয়েছে। ছবি: মীর ফরিদ
চোট থেকে সেরে ওঠার পর আবার খেলায় ফিরেছিলেন নোগাইস্কি। তবে খেলোয়াড় না হয়ে কেন তিনি শেষ পর্যন্ত আম্পায়ার হয়েছেন—সেটির ব্যাখ্যা দিয়েছেন, ‘আবার খেলায় ফিরেছিলাম। কিন্তু প্রায় পাঁচ বছর পর বুঝলাম, আমার আসল টানটা আম্পায়ারিংয়ের দিকেই। সত্যি বলতে, আমি খেলোয়াড় হিসেবে যতটা ভালো, তার চেয়ে ভালো আম্পায়ারিংয়ে।’
ক্লাসরুমের বোর্ডে যিনি অঙ্ক কষান, তিনিই মাঠে দেন ‘নো’, ‘ওয়াইড’ আর ‘আউট’-এর সিদ্ধান্ত। কখনো কখনো পকেট থেকে বের করেন লাইট মিটার।
স্যাম নোগাইস্কির গল্পটা তাই শুধু এক আম্পায়ারের নয়, একজন মানুষ কিভাবে নিজের পছন্দের জায়গায় ফিরে গিয়ে তাতে সেরা হয়ে ওঠেন, সেটিরও।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন