প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
চীন ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী একটি দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা সড়ক সেতু সম্প্রতি চালু করা হয়েছে। সেতুটি দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের উন্নতির লক্ষ্যে চালু করা হয়েছে বলে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে জানানো হয়েছে।
বিবিসি সূত্রে জানা যায়, চীন উত্তর কোরিয়ার প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে পরিচিত। যদিও উত্তর কোরিয়ার ওপর পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির কারণে কঠোর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তবুও চীন দেশটির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়তার উৎস হিসেবে কাজ করছে।
নতুন ইয়ালু নদীর সেতুটি চীনের দানদং শহর থেকে উত্তর কোরিয়ার সিনুইজু পর্যন্ত বিস্তৃত। সেতুটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৩ কিলোমিটার এবং এটি দুই দেশের মধ্যে পণ্য পরিবহনের প্রধান স্থলপথ হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
২০১৪ সালে সেতুটি চালুর পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু পরে তা অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে যায়। বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হলে উত্তর কোরিয়া সেতুর সঙ্গে যুক্ত সড়ক ও শুল্কসুবিধা নির্মাণের কাজ বন্ধ করে দেয়। নতুন সেতুটি পুরোনো চীন-উত্তর কোরিয়া মৈত্রী সেতুর বিকল্প হিসেবে নির্মিত হয়েছে, যা ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৩ সালের মধ্যে নির্মিত হয়। তখন অঞ্চলটি জাপানের দখলে ছিল।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং বুধবার বলেন, নতুন সেতুটি দুই দেশের যোগাযোগের জন্য একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো’। তিনি উল্লেখ করেন, এটি দুই দেশের বাণিজ্য এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগকে আরও সহজ করবে।
গত বছর চীন ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ২৭০ কোটি ডলার। এই পরিমাণ মহামারির আগে পর্যায়ের বাণিজ্যের পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত দেয়। উত্তর কোরিয়ায় চীনের পণ্য রপ্তানি এই বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
তবে নতুন সেতু চালু হওয়ার পরেও সীমান্ত দিয়ে বাণিজ্য দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ, উত্তর কোরিয়ার ওপর জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা এখনো কার্যকর রয়েছে। হানকুক ইউনিভার্সিটি অব ফরেন স্টাডিজের চীনবিষয়ক অধ্যাপক কাং জুন-ইয়ং বিবিসিকে বলেন, পিয়ংইয়ং চীন থেকে হঠাৎ করে বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানির বিষয়ে সতর্ক রয়েছে। এতে উত্তর কোরিয়ার অভ্যন্তরীণ বাজারে চীনের প্রভাব বাড়তে পারে। কাং জুন-ইয়ং আরও বলেন, চীনও এসব উদ্বেগ সম্পর্কে জানে, তাই দুই দেশের বাণিজ্য ধীরে ধীরে বাড়তে পারে।
চীন ও উত্তর কোরিয়া দীর্ঘদিনের মিত্র। দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে, যা অন্য কোনো দেশের সঙ্গে চীনের নেই। দুই দেশের সম্পর্ক বোঝাতে প্রায়ই ‘ঠোঁট ও দাঁতের মতো ঘনিষ্ঠ’ কথাটি ব্যবহার করা হয়। চীনের সাবেক নেতা মাও সে তুং প্রথম এই মন্তব্য করেছিলেন। তবে দীর্ঘদিনের এই মিত্রতার মধ্যেও দুই দেশের মধ্যে টানাপোড়েন ছিল।
২০১০-এর দশকের বেশিরভাগ সময় দুই দেশের সম্পর্ক শীতল ছিল। উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে চীনের উদ্বেগ বাড়ছিল। ২০১৭ সালে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন পারমাণবিক পরীক্ষা চালান এবং নিষিদ্ধ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষাও বাড়ান। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ বৃদ্ধি পায় এবং দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে উত্তর কোরিয়ার বিষয়ে চীনের অবস্থানে পরিবর্তন দেখা গেছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক এডওয়ার্ড হাওয়েল বিবিসিকে বলেন, এক দশক আগে চীন প্রকাশ্যে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সমালোচনা করত এবং পিয়ংইয়ংকে পারমাণবিক অস্ত্র ত্যাগের আহ্বান জানাত। কিন্তু এখন চীন এ বিষয়ে খুব কম কথা বলে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হওয়ায় চীনের অবস্থানেও পরিবর্তন এসেছে। ধারণা করা হয়, ইউক্রেনে রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধে উত্তর কোরিয়ার অন্তত ২ হাজার ৩০০ সেনা নিহত হয়েছেন। এর বিনিময়ে রাশিয়া উত্তর কোরিয়াকে তেল সরবরাহ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে, যা জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করছে। ২০২৪ সালে উত্তর কোরিয়ার দেওয়া অস্ত্র ও সেনাদের বিনিময়ে রাশিয়া ১০০ কোটি ব্যারেলের বেশি তেল পাঠিয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
গত মাসে উত্তর কোরিয়া ও রাশিয়ার মধ্যে প্রথম সড়ক সেতু চালু হয়েছে। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, সেতুটি দিয়ে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৩০০টি যানবাহন এবং ২ হাজারের বেশি মানুষ চলাচল করতে পারবেন। এই পরিস্থিতিতে উত্তর কোরিয়ার ওপর নিজের প্রভাব ধরে রাখতে চীনও দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার চেষ্টা করছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
মহামারির কারণে ছয় বছর বন্ধ থাকার পর গত মার্চে বেইজিং ও পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যে সরাসরি বিমান চলাচল আবার শুরু করে এয়ার চায়না। একই মাসে দুই দেশের মধ্যে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচলও চালু হয়। চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং চলতি বছরের জুনে রাষ্ট্রীয় সফরে উত্তর কোরিয়া যান এবং সেখানে তিনি দেশটির নেতা কিম জং উনের সঙ্গে বৈঠক করেন।
দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলের ইহা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লেইফ-এরিক ইজলি বলেন, নতুন ইয়ালু নদীর সেতু চালু হওয়া দুই দেশের সম্পর্কের উন্নতির প্রমাণ। তিনি আরও বলেন, এটি দেখায়, জুনে শি চিনপিংয়ের উত্তর কোরিয়া সফর শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিকতা ছিল না।
তবে সেতুটি চালু করতে দীর্ঘ বিলম্বের বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি। তার মতে, মহামারির সময় উত্তর কোরিয়া নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে রাখা এবং দেশের অভ্যন্তরে আর্থসামাজিক কর্মকাণ্ডে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের কারণে দুই দেশের যোগাযোগ ব্যাহত হয়েছে। এসব ঘটনা দেখায়, উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা চীনের জন্য কতটা কঠিন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন