প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বিটকয়েনের দাম সম্প্রতি কমে প্রায় ৬০ হাজার ডলারের কাছাকাছি নেমে আসায় এটি আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে ক্রিপ্টোকারেন্সি। বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান এই ডিজিটাল মুদ্রার দাম যখন রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছে যায় বা বড় ধরনের পতনের মুখে পড়ে, তখনই এটি সংবাদ শিরোনামে জায়গা করে নেয়। ২০২৬ সালেও এমন ঘটনা একাধিকবার ঘটেছে। এমনকি এক পর্যায়ে বিটকয়েনের দাম এমন স্তরে নেমে আসে, যা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার আগের সময়ের পর আর দেখা যায়নি।
যাই হোক, ক্রিপ্টোকারেন্সি নিয়ে আলোচনা শুরু হলেই সামনে আসে কিছু জটিল পরিভাষা, যেমন ইটিএফ, ব্লকচেইন, স্টেবলকয়েন কিংবা হালভিং। নতুনদের কাছে এসব শব্দ অনেক সময় বিভ্রান্তিকর মনে হতে পারে। তাই ক্রিপ্টোকারেন্সির জগতে বহুল ব্যবহৃত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ ও সেগুলোর অর্থ তুলে ধরা হলো।
ক্রিপ্টোকারেন্সির কথা উঠলেই সবার আগে আসে বিটকয়েনের নাম। এটি এক ধরনের ডিজিটাল মুদ্রা, যা প্রচলিত মুদ্রার মতো কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় না। বিকেন্দ্রীভূত হওয়ায় অনেকের কাছে এটি আর্থিক স্বাধীনতার প্রতীক। তবে একই কারণে এর মূল্য অত্যন্ত অস্থির। বাজারে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের চাহিদার ওপর নির্ভর করে এর দাম দ্রুত বাড়তে বা কমতে পারে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে ‘বিশ্বের ক্রিপ্টো রাজধানী’ বানানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। অথচ একসময় তিনিই বিটকয়েনকে ‘প্রতারণা’ বলে উল্লেখ করেছিলেন।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বিটকয়েন প্রথমবারের মতো ১ লাখ ডলারের সীমা অতিক্রম করে। এর পর ২০২৫ সালের জুলাইয়ে এর দাম বেড়ে ১ লাখ ২০ হাজার ডলারে পৌঁছায়। একই বছরের অক্টোবরে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং ইতিবাচক বাজার পরিস্থিতির কারণে এর মূল্য প্রায় ১ লাখ ২৬ হাজার ডলারে উঠে সর্বকালের সর্বোচ্চ রেকর্ড গড়ে।
তবে দাম বাড়ার পাশাপাশি বড় ধরনের পতনের ইতিহাসও রয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিটকয়েনের মূল্য ৬৫ হাজার ডলারের নিচে নেমে যায়। সম্প্রতি ৫ জুন এটি ৬২ হাজার ডলারেরও নিচে নেমে আসে, যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। এদিকে বিটকয়েনের রহস্যময় উদ্ভাবক সাতোশি নাকামোতোর প্রকৃত পরিচয় নিয়েও এখনো জল্পনা-কল্পনা চলছে।
ব্লকচেইন হলো সেই প্রযুক্তি, যার ওপর ভিত্তি করে বিটকয়েনসহ অধিকাংশ ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং এনএফটি পরিচালিত হয়। সহজভাবে বলতে গেলে, এটি একটি ডিজিটাল খতিয়ান বা ভার্চুয়াল স্প্রেডশিট, যেখানে সব লেনদেনের তথ্য সংরক্ষিত থাকে।
এসব তথ্য ব্লক আকারে সাজানো হয় এবং একটির সঙ্গে আরেকটি যুক্ত হয়ে একটি দীর্ঘ শৃঙ্খল তৈরি করে। সেখান থেকেই এসেছে ‘ব্লকচেইন’ নামটি।
ক্রিপ্টোকারেন্সির প্রতিটি লেনদেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা স্বেচ্ছাসেবকদের একটি নেটওয়ার্ক যাচাই করে। তারা বিশেষ সফটওয়্যার ব্যবহার করে লেনদেনের সত্যতা নিশ্চিত করে।
বিটকয়েন নেটওয়ার্কে লেনদেন যাচাইকারীদের বলা হয় মাইনার। তারা লেনদেন যাচাই করার বিনিময়ে বিটকয়েন পুরস্কার হিসেবে পান। তবে বিটকয়েনের মোট সরবরাহ সীমিত। সর্বোচ্চ ২ কোটি ১০ লাখ বিটকয়েন তৈরি করা সম্ভব এবং এর বড় অংশ এরই মধ্যে বাজারে রয়েছে।
এই কারণে প্রতি চার বছর পরপর, অথবা নির্দিষ্ট সংখ্যক ব্লক তৈরি হওয়ার পর, মাইনারদের দেয়া পুরস্কার অর্ধেকে নামিয়ে আনা হয়। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘হালভিং’। সর্বশেষ হালভিং অনুষ্ঠিত হয় ২০ এপ্রিল ২০২৪। তখন প্রতি ব্লকের পুরস্কার ৬ দশমিক ২৫ বিটকয়েন থেকে কমে ৩ দশমিক ১২৫ বিটকয়েনে নেমে আসে।
এভাবে বিটকয়েনের সরবরাহ দীর্ঘ সময় ধরে বজায় রাখা সম্ভব হয়। তবে পুরস্কার কমে যাওয়ায় অনেকের প্রশ্ন, ভবিষ্যতে মাইনিং কতটা লাভজনক থাকবে।
ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ হলো এমন একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, যেখানে বিনিয়োগকারীরা ক্রিপ্টোকারেন্সি কেনাবেচা ও লেনদেন করতে পারেন। এটি মূলত দালাল বা মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে।
এখানে ব্যবহারকারীরা ডলার অথবা পাউন্ডের মতো প্রচলিত মুদ্রার বিনিময়ে বিটকয়েন, ইথেরিয়ামসহ বিভিন্ন ডিজিটাল মুদ্রা কিনতে পারেন। অধিকাংশ লেনদেনের ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট ফি দিতে হয়।
ক্রিপ্টোকারেন্সি সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হয় ক্রিপ্টো ওয়ালেট। এটি সাধারণত দুই ধরনের হয়—হট ওয়ালেট এবং কোল্ড ওয়ালেট। হট ওয়ালেট ইন্টারনেটের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। ফলে এটি দ্রুত লেনদেন এবং সহজ ব্যবহারের সুবিধা দেয়।
অন্যদিকে কোল্ড ওয়ালেট হলো ইউএসবি ডিভাইসের মতো বিশেষ হার্ডওয়্যার, যেখানে অফলাইনে ক্রিপ্টোকারেন্সি সংরক্ষণ করা হয়। দীর্ঘমেয়াদি ও নিরাপদ সংরক্ষণের জন্য এটি বেশি জনপ্রিয়।
বিটকয়েনের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি হলো ইথেরিয়াম। একই সঙ্গে এটি একটি ব্লকচেইন প্ল্যাটফর্মও, যার ওপর বিভিন্ন ধরনের অ্যাপ্লিকেশন ও এনএফটি তৈরি করা যায়।
বিটকয়েনের মতোই এটি একটি ডিজিটাল মুদ্রা ব্যবস্থা। তবে ২০২২ সালে ইথেরিয়াম এমন একটি নতুন ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হয়, যার জন্য তুলনামূলক কম কম্পিউটিং শক্তি ও বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়।
ইটিএফ হলো এমন একটি বিনিয়োগ তহবিল, যা বিনিয়োগকারীদের সরাসরি কোনো সম্পদ না কিনেও তার মূল্যের ওঠানামায় অংশ নেয়ার সুযোগ দেয়। শেয়ারের মতোই এটি স্টক এক্সচেঞ্জে লেনদেন হয়। একটি ইটিএফে স্বর্ণ, রুপা, প্রযুক্তি কোম্পানি কিংবা বিভিন্ন ধরনের সম্পদের সমন্বয় থাকতে পারে।
স্পট বিটকয়েন ইটিএফ সরাসরি বিটকয়েনের বর্তমান বাজারমূল্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র একাধিক স্পট বিটকয়েন ইটিএফ অনুমোদন করে। এর ফলে ব্ল্যাকরক ও ফিডেলিটির মতো বড় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানগুলো ডিজিটাল ওয়ালেট বা ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ ব্যবহারের ঝামেলা ছাড়াই বিটকয়েনে বিনিয়োগের সুযোগ পায়।
মিম কয়েন হলো এমন এক ধরনের ক্রিপ্টোকারেন্সি, যা মূলত মজা, প্রচারণা এবং জল্পনা-কল্পনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় কোনো ট্রেন্ড বা ভাইরাল মিমকে কেন্দ্র করে এসব কয়েন চালু করা হয়। উদাহরণ হিসেবে ইন্টারনেটে জনপ্রিয় বামন জলহস্তী ‘মু ডেং’-এর নাম উল্লেখ করা যায়।
তবে উচ্চ ঝুঁকি এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কারণে মিম কয়েন নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই এগুলোর দাম দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকে না। এছাড়া ‘রাগ পুল’ নামে পরিচিত প্রতারণার ঘটনাও ঘটে। এতে কয়েনের নির্মাতারা বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করে দাম বাড়িয়ে পরে হঠাৎ লেনদেন বন্ধ করে অর্থ নিয়ে উধাও হয়ে যায়।
স্টেবলকয়েন এমন একটি ক্রিপ্টোকারেন্সি, যার মূল লক্ষ্য হলো মূল্য স্থিতিশীল রাখা। এই ধরনের কয়েন সাধারণত ডলার বা পাউন্ডের মতো প্রচলিত মুদ্রার সঙ্গে মূল্য সংযুক্ত করে পরিচালিত হয়। ফলে অন্যান্য ক্রিপ্টোকারেন্সির তুলনায় এর দামের ওঠানামা তুলনামূলক কম হয়।
স্টেবলকয়েন সাধারণত ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান দ্বারা পরিচালিত হয় এবং এর লেনদেন ডিজিটাল লেজারে সংরক্ষিত থাকে। অনেকেই একে ভবিষ্যতের আর্থিক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখছেন। তবে অতীতে কিছু স্টেবলকয়েনের বড় ধরনের মূল্যপতনের ঘটনা নিয়ন্ত্রকদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে এবং এর প্রকৃত স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
এক্সআরপি হলো একটি ক্রিপ্টোকারেন্সি, যা এক্সআরপি লেজার নামের একটি প্ল্যাটফর্মে পরিচালিত হয়। ২০১২ সালে রিপল ল্যাবসের সহ-প্রতিষ্ঠাতারা এটিকে বিটকয়েনের তুলনায় দ্রুত ও কম খরচের বিকল্প হিসেবে তৈরি করেন।
এক্সআরপির মোট সরবরাহ ১০০ বিলিয়ন কয়েনে সীমাবদ্ধ, যা শুরুতেই তৈরি করা হয়েছিল। এর বড় অংশ রিপলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং ধাপে ধাপে বাজারে ছাড়া হয়।
বিটকয়েনের মতো মাইনিংয়ের পরিবর্তে এক্সআরপিতে লেনদেন যাচাই করা হয় ‘কনসেনসাস’ পদ্ধতিতে। অর্থাৎ কোনো লেনদেন বৈধ কি না, সে বিষয়ে নেটওয়ার্কের অধিকাংশ ভ্যালিডেটর একমত হওয়ার পরই তা অনুমোদিত হয়।
এই পদ্ধতিতে দ্রুত ও কম খরচে বিপুল সংখ্যক লেনদেন সম্পন্ন করা সম্ভব বলে মনে করা হয়। ফলে আন্তঃসীমান্ত অর্থ স্থানান্তর এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবহারের ক্ষেত্রে এক্সআরপি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তবে অন্যান্য ক্রিপ্টোকারেন্সির মতো এটিও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি এবং মূল্য অস্থিরতার চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন