প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ভারতের নির্বাচন কমিশন (ইসিআই) নথিভুক্ত ১৮,৮৯৫টি আপিলের মধ্যে নন্দীগ্রামে ৮৬টি এবং রেজিনগরে ৪টি আপিলের নিষ্পত্তি সম্পন্ন হয়েছে। গত ২৮ সেপ্টেম্বর, সুপ্রিম কোর্ট নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর উপ-নির্বাচনের আগে পশ্চিমবঙ্গ বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) সংক্রান্ত মামলাটির জরুরি ভিত্তিতে শুনানি করতে অস্বীকার করে। ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত মন্তব্য করেন, "এগুলো তো শুধুই উপ-নির্বাচন, আর কিছুই নয়।"
আগামীকাল ৬ অক্টোবর ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে এই দুটি কেন্দ্রে। তবে নির্বাচন কমিশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই দুটি কেন্দ্র থেকে মোট ১৮,৮৯৫টি আপিল নথিভুক্ত হয়েছিল। ৫ অক্টোবর পর্যন্ত অ্যাপোলেট ট্রাইব্যুনালের ৩ নম্বর তালিকা অনুযায়ী—মোট ৯০টি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে। যার নিষ্পত্তির হার মাত্র ০.৪৭৬%। এর মধ্যে নন্দীগ্রামে ৮৬টি এবং রেজিনগরে ৪টি আপিল নিষ্পত্তি হয়েছে।
রেজিনগর: ১২,৪৫২টি আপিলের মধ্যে সিদ্ধান্ত মাত্র ৪টিতে
মুর্শিদাবাদ জেলার রেজিনগরে মুসলিম জনসংখ্যার হার ৬২.৪৬%। এখানে ১৯,৮০০ জন ভোটারকে বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের সামনে পাঠানো হয়েছিল, যার মধ্যে ১৫,৮৭৭ জনকে বৈধ হিসেবে অনুমোদন দেওয়া হয় এবং ৩,৯২৩ জনকে 'অযোগ্য' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। অযোগ্য চিহ্নিতদের মধ্যে ৩,৭৫২ জন অর্থাৎ ৯৫.৬% ভোটার মুসলিম ছিলেন।
সুপ্রিম কোর্টে পেশ করা নির্বাচন কমিশনের ১০ সেপ্টেম্বরের রিপোর্ট অনুযায়ী, রেজিনগরে ১২,৪৫২টি আপিল জমা পড়েছিল। এর মধ্যে মাত্র ৪টির নিষ্পত্তি হয়েছে। এটি ০.০৩২% নিষ্পত্তির হার, যেখানে পুরো রাজ্যজুড়ে নিষ্পত্তির হার ৩.২০১%। রাজ্য গড়ের তুলনায় রেজিনগরের ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম প্রায় একশত গুণ ধীরগতিতে চলছে।
গত ১৩ এপ্রিল ট্রাইব্যুনাল কাজ শুরু হওয়ার পর থেকে ১৭৫ দিনে রেজিনগরে ৪টি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা প্রতি ৪৪ দিনে একটি করে মামলার সিদ্ধান্ত। এই গতিতে চললে সেখানে বাকি থাকা ১২,৪৪৮টি আপিল নিষ্পত্তি হতে প্রায় ১,৪৯০ বছর লাগবে!
নন্দীগ্রাম: ৬,৪৪৩টি আপিল, সিদ্ধান্ত ৮৬টিতে
নন্দীগ্রামের জনসংখ্যার চিত্র ভিন্ন হলেও প্রক্রিয়াগত সমস্যা একই। পূর্ব মেদিনীপুরের এই কেন্দ্রে মুসলিম জনসংখ্যার হার ২৩.০২%। বিশেষ সংশোধনের (এসআইআর) সময় ১০,৬১৬ জন ভোটারকে পর্যালোচনার জন্য পাঠানো হয়। বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তারা ৭,১৫৪ জনকে অনুমোদন দেন এবং ৩,৪৬১ জনকে 'অযোগ্য' ঘোষণা করেন। অযোগ্য ঘোষিত ব্যক্তিদের মধ্যে ৩,২৭০ জন অর্থাৎ ৯৪.৫% মুসলিম, যদিও কেন্দ্রে মুসলিমরা মোট জনসংখ্যার চারভাগের একভাগের চেয়েও কম।
নির্বাচন কমিশনের ১০ সেপ্টেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, নন্দীগ্রামে ৬,৪৪৩টি আপিল ছিল—যা বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার কারণে বিধানসভা নির্বাচনে ভোটদান থেকে বাদ পড়া মানুষের সংখ্যার প্রায় দ্বিগুণ। এর মধ্যে ৮৬টির সিদ্ধান্ত হয়েছে—যার নিষ্পত্তির হার ১.৩৮১% এবং বাকি ৬,৩৫৪টি মামলা এখনও বিচারাধীন।
৮৫ জন ভোটারকে দ্বিতীয়বার বৈধতা দেওয়া হয়েছে
তবে এই কম সংখ্যক সিদ্ধান্ত দিয়েও নন্দীগ্রামে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায় না। সিদ্ধান্ত অপেক্ষায় থাকা ভোটারদের দুটি ভাগে ভাগ করা যায়—যাদের অযোগ্য চিহ্নিত করা হয়েছিল এবং যাদের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, তবুও নির্বাচন কমিশন কর্তৃক বাদ দেওয়ার জন্য আপিলের মুখোমুখি হতে হয়েছিল।
তালিকা অনুযায়ী, নন্দীগ্রামের ৮৬টি সিদ্ধান্তের অর্থ বাদ পড়া মানুষদের ফিরিয়ে আনা নয়। এটি মূলত ৮৫ জন ভোটারের আপিল খারিজের ঘটনা, যাদের বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা আগেই বৈধ ঘোষণা করেছিলেন এবং তাদের নাম বাদ দেওয়ার জন্য পুনরায় আপিল করা হয়েছিল। মাত্র ১ জন ভোটারের নাম নতুন করে ফিরিয়ে আনা বা পুনর্বহাল করা হয়েছে।
রেজিনগরে দেখা গেছে ঠিক বিপরীত চিত্র। সেখানকার ৪টি সিদ্ধান্তের সবগুলোতেই বাদ পড়া ভোটারদের নাম তালিকায় ফেরত আনা হয়েছে এবং নাম অন্তর্ভুক্তির বিরুদ্ধে করা কোনো আপিলের নিষ্পত্তি হয়নি।
এই দুই কেন্দ্রে নতুন করে অন্তর্ভুক্ত হওয়া বা টিকে যাওয়া প্রতিটি ভোটারই মুসলিম। নন্দীগ্রামে এর অর্থ হলো, ৮৫ জন মুসলিম ভোটারকে দু'বার বৈধতার প্রমাণ দিতে হয়েছে—একবার বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তার কাছে এবং দ্বিতীয়বার ট্রাইব্যুনালে।
যে ১৭৭ জন ভোটার মামলা জিতেও অপেক্ষায় ছিলেন
এই অসম্পূর্ণ বিচার প্রক্রিয়ার আরেকটি স্তর রয়েছে। এপ্রিলে ভোটার তালিকা চূড়ান্ত করার পর নন্দীগ্রামে ২৫৬টি এবং রেজিনগরে ৫টি মামলা "বিচারাধীন" অবস্থায় রয়ে যায়। ৭ আগস্টের মধ্যে নন্দীগ্রামের মাত্র একটি মামলা বিচারিক সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় ছিল। বাকি মামলাগুলোর সিদ্ধান্ত হয়ে গেলেও নির্বাচন কর্তৃপক্ষের ইলেকট্রনিক স্বাক্ষরের অপেক্ষায় আটকে ছিল। তাদের মধ্যে নন্দীগ্রামের ১৭৭ জন ভোটার ছিলেন, যাদের বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তারা যোগ্য বলে রায় দিয়েছিলেন। নির্বাচন কমিশন এখনও স্পষ্ট করেনি যে সেই স্বাক্ষরগুলো পরবর্তীতে দেওয়া হয়েছিল কিনা এবং এই ১৭৭ জনের নাম উপ-নির্বাচনের আগে তালিকায় যোগ করা হয়েছে কিনা।
অন্যদিকে রেজিনগরে ৫ জন ভোটার বিচারাধীন অবস্থায় থেকে যান, আর আপিলের জন্য প্রয়োজনীয় বাদ পড়া ভোটারদের তালিকাটি সর্বসাধারণের জন্য প্রকাশই করা হয়নি।
বিজেপির 'লক্ষ্যমাত্রা' এবং জয়ের ব্যবধান
নন্দীগ্রামের নির্বাচনী ফলাফল ছোটখাটো পরিবর্তনের ওপর ভীষণভাবে সংবেদনশীল। গত মে মাসে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই কেন্দ্র থেকে ৯,৬৬৫ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন—তিনি পেয়েছিলেন ১,২৭,৩০১ ভোট এবং তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী পবিত্র কর পেয়েছিলেন ১,১৭,৬৩৬ ভোট। সেখানে অযোগ্য ঘোষিত ৩,৪৬১ জন ভোটার মোট জয়ের ব্যবধানের প্রায় ৩৬%।
যদিও এই হিসাব থেকে বোঝা যায় না ওই ভোটাররা কাকে ভোট দিতেন, তবে এটি দেখায় যে নিষ্পত্তহীন ভোটার তালিকার আকার জয়-পরাজয়ের ব্যবধানের তুলনায় কতটা প্রভাব ফেলবে। শুভেন্দু অধিকারী ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) ফলতা পুনর্নির্বাচনে রেকর্ড করা ১.০৯ লাখের জয়ের ব্যবধান অতিক্রম করার একটি "লক্ষ্য" নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন, যেখানে বিজেপির প্রার্থী হাসিরানী রথ এই ব্যবধানকে আরও বাড়িয়ে ১.৫০ লাখে নিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন।
সংখ্যানীতি অনুযায়ী এই ধরণের ব্যবধান কতটা বড় হতে পারে তা স্পষ্ট। নন্দীগ্রামের ভোটার তালিকায় ২,৬৬,৪১৫ জন ভোটার ছিলেন। মে মাসের নির্বাচনে ২,৫২,৭২২টি ভোট পড়েছিল, যা মোট ভোটারের প্রায় ৯৪.৯%। নির্বাচন কমিশনের আনুষ্ঠানিক ফলাফল অনুযায়ী বিজেপি ৫০.৩৭% এবং তৃণমূল ৪৬.৫৫% ভোট পেয়েছিল।
একই পরিমাণ ভোট পড়লে ১ লাখ ভোটের ব্যবধানে জিততে হলে জয়ী প্রার্থীকে প্রায় ১,৭৬,৩৬১টি ভোট পেতে হবে, যা বাকি সমস্ত প্রার্থীদের জন্য সম্মিলিতভাবে মাত্র ৭৬,৩৬১টি ভোট অবশিষ্ট রাখবে।
এর অর্থ দাঁড়ায় কোনো একটি দলকে মোট পড়া ভোটের প্রায় ৭০% পেতে হবে, যেখানে মে মাসে বিজেপি পেয়েছিল ৫০.৩৭% ভোট। এমনকি ১০০% ভোট পড়লেও, ১ লাখের ব্যবধান পেতে নিবন্ধিত মোট ভোটারের প্রায় ৬৯% মানুষের ভোট বিজয়ী প্রার্থীর পক্ষে যেতে হবে।
এই পরিমাণের একটি তুলনা টানা যেতে পারে। ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে ডায়মন্ড হারবার আসন থেকে তৃণমূলের অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ৬৮.৪৮% ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছিলেন—যে ফলাফলকে বিজেপি প্রকাশ্যে বড় ধরনের কারচুপি বলে অভিহিত করেছিল। অধিকারী এখন যে ব্যবধানকে লক্ষ্য হিসেবে বর্ণনা করছেন, তার জন্য তাঁর নিজের দল যাকে কারচুপিপূর্ণ বলেছিল তার চেয়েও বেশি শতাংশ ভোটের প্রয়োজন হবে।
'শুধুই একটি উপ-নির্বাচন' বলতে যা বোঝায়
যে ভোটার তালিকা সম্পূর্ণভাবে নিষ্পত্তি করতে পারেনি নির্বাচন কমিশন, এই দুটি কেন্দ্রের উপ-নির্বাচন হতে যাচ্ছে সেই তালিকার প্রথম নির্বাচনী পরীক্ষা। এটি এমন দুটি আসনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যেখানে কমিশন সবচেয়ে কম মামলার নিষ্পত্তি করেছে।
নন্দীগ্রামে, ২০০৭ সালের আন্দোলনের সাথে সম্পর্কিত পরোয়ানার কারণে কংগ্রেস প্রার্থী ১৬ দিনের প্রচারণার মধ্যে ১১ দিনই হেফাজতে কাটিয়েছেন। তাঁর মুক্তির পরদিনই তাঁর দুই সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হয়, অন্যদিকে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী প্রচারণার সময় আক্রান্ত হন। তৃণমূল প্রার্থী মুখ্যমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাতের পর তাঁর প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেন।
রেজিনগরে, আম জনতা উন্নয়ন পার্টি (এইউজেপি) সমর্থিত প্রার্থীকে গ্রেপ্তার করার পর দলটি প্রচারণা বন্ধ করে দেয়। প্রতীক না পেয়ে রেভোলিউশনারি সোশ্যালিস্ট পার্টি (আরএসপি) সরে দাঁড়ায়। এদিকে, ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট (আইএসএফ) 'আলমারি' প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে—কারণ তারা ২০২৪ সালে এবং এপ্রিলে যে 'খাম' প্রতীক ব্যবহার করেছিল, তা তৃণমূল থেকে বেরিয়ে যাওয়া ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন দল ডেমোক্রেটিক তৃণমূল কংগ্রেসকে দিয়ে দেওয়া হয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন