প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
টাঙ্গাইলের মধুপুরে সরকারি বিনামূল্যের পাঠ্যবই অবৈধভাবে বিক্রির অভিযোগ ঘিরে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। গত বুধবার নরকোনা এলাকায় প্রায় এক টন বিনামূল্যের পাঠ্যবই জনতার হাতে আটক হওয়ার পর বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। এ ঘটনায় ভাঙারি ব্যবসায়ী ইব্রাহীম হোসেন ও মধুপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের নৈশপ্রহরী তোফায়েল আহমেদকে আসামি করে থানায় মামলা হয়েছে।
তবে স্থানীয় শিক্ষকদের একাংশের অভিযোগ, শুধু ভাঙারি ব্যবসায়ী ও নৈশপ্রহরীকে আসামি করে মামলা হওয়ায় বই সরবরাহ, সংরক্ষণ ও বিতরণ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত অন্যদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বছরের পর বছর অবিক্রীত বইয়ের হিসাব, অতিরিক্ত চাহিদাপত্রের মাধ্যমে বই সংগ্রহ এবং এসব বই শেষ পর্যন্ত কোথায় যাচ্ছে—এসব বিষয় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।
মধুপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে এম ফজলুল হক ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, প্রতি বছর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের চাহিদার ভিত্তিতে সরকার বিনামূল্যের পাঠ্যবই সরবরাহ করে। পরে উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষা অফিস থেকে বই সংগ্রহ করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ করে।
অভিযোগ রয়েছে, মধুপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস প্রতিবছর অক্টোবর-নভেম্বরের দিকে প্রায় পৌনে চার লাখ থেকে সাড়ে চার লাখ বইয়ের চাহিদাপত্র পাঠায়। সরবরাহ করা বইয়ের মধ্যে জুন পর্যন্ত সাধারণত দুই থেকে আড়াই লাখ বই বিতরণ করা হয়। অবশিষ্ট বই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গুদামে সংরক্ষিত থাকার কথা।
গত শিক্ষাবর্ষেও প্রায় চার লাখ বইয়ের চাহিদাপত্র পাঠানো হয় এবং চাহিদা অনুযায়ী পুরো বই সরবরাহ করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। জুন পর্যন্ত প্রায় পৌনে দুই লাখ বই বিতরণের পর প্রায় সোয়া দুই লাখ বই অবশিষ্ট থাকার কথা বলা হচ্ছে। এসব বইয়ের বর্তমান অবস্থান ও হিসাব নিয়েই উঠেছে প্রশ্ন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোনো কারণে পাঠ্যবই অবিতরণকৃত থেকে গেলে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে উপজেলা পাঠ্যবই বিতরণ কমিটির সম্মতিক্রমে নিলামের মাধ্যমে তা বিক্রির সুযোগ রয়েছে। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, ২০১০ সাল থেকে মধুপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসে অবিতরণকৃত পাঠ্যবই নিলামের মাধ্যমে বিক্রির কোনো কার্যকর নজির নেই।
স্থানীয় কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকের দাবি, গত দেড় যুগে এভাবে প্রায় ৩৫ লাখ বই অবিতরণকৃত থাকার কথা বলা হলেও সেগুলোর সঠিক হিসাব ও পরিণতি স্পষ্ট নয়। এত বিপুলসংখ্যক বই কোথায় গেল, কীভাবে হিসাব সমন্বয় করা হয়েছে এবং কোনো কোনো বই কীভাবে ভাঙারির দোকানে পৌঁছেছে—এসব বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
স্থানীয় কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক অভিযোগ করেছেন, দীর্ঘদিন ধরে মধুপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসে মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার পদ শূন্য থাকায় একাডেমিক অফিসার মহিউদ্দীন আহমেদের প্রভাব বেড়েছে। তাদের অভিযোগ, অতিরিক্ত চাহিদাপত্রের মাধ্যমে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি বই আনা, অবিতরণকৃত বই গুদামজাত করে রাখা এবং পরে সেগুলো বিভিন্ন মাধ্যমে বিক্রির সঙ্গে একটি চক্র জড়িত থাকতে পারে।
তবে এসব অভিযোগের কোনোটি তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, বই পরিবহনের ক্ষেত্রেও অনিয়মের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। তাদের ভাষ্য, প্রকৃতপক্ষে যতসংখ্যক বই পরিবহন করা হয়েছে, তার চেয়ে বেশি বই পরিবহনের বিল দেখানোর অভিযোগ রয়েছে।
একাডেমিক অফিসার মহিউদ্দীন আহমেদ এসব বিষয়ে নিজের দায় অস্বীকার করে বলেন, চাহিদাপত্র পাঠানো, অবিতরণকৃত বইয়ের হিসাব এবং গুদামজাতকরণের বিষয়গুলো মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। এসব বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না।
অবসরপ্রাপ্ত কয়েকজন শিক্ষক আরও অভিযোগ করেন, মহিউদ্দীন আহমেদ ২০১৫ সালে মধুপুরে যোগদানের পর দীর্ঘ সময় একই কর্মস্থলে রয়েছেন। এ সময়ের মধ্যে তার ঘিরে একটি প্রভাববলয় গড়ে ওঠার অভিযোগ রয়েছে। ওই বলয়ের মাধ্যমে অতিরিক্ত বই সংগ্রহ ও অবিতরণকৃত বই বিক্রির অনিয়ম হয়ে থাকতে পারে বলে তাদের দাবি।
তবে এ অভিযোগেরও স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগগুলোর বিষয়ে তদন্ত হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
মধুপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার (অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত) বাবুল হাসান বলেন, তিনি মাত্র সাত মাস ধরে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। বছরের পর বছর ধরে চলে আসা পাঠ্যবই-সংক্রান্ত বিষয়গুলো সম্পর্কে বর্তমান একাডেমিক অফিসার এবং আগে দায়িত্বে থাকা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তারা বিস্তারিত বলতে পারবেন।
অন্যদিকে টাঙ্গাইল জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রেবেকা সুলতানা বলেন, জেলা শিক্ষা অফিসের এ বিষয়ে কোনো দায় নেই। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কোনো বই অবিতরণকৃত অবস্থায় থাকার কথা নয়। মধুপুরে এত বই কীভাবে অবিতরণকৃত অবস্থায় থেকে গেল বা চোরাই পথে বিক্রি হলো, তার দায় মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস ও উপজেলা পাঠ্যবই বিতরণ কমিটিকেই বহন করতে হবে।
মধুপুর উপজেলা পাঠ্যবই বিতরণ কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক পাঠ্যবই-সংক্রান্ত অভিযোগ ও অনিয়মের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি করার উদ্যোগ নিয়েছেন। তদন্ত শেষে কমিটিই বলতে পারবে কেন এসব ঘটনা ঘটেছে এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত।
এদিকে এক টন সরকারি বিনামূল্যের পাঠ্যবই আটকের ঘটনা সামনে আসার পর শুধু আটক বইয়ের উৎস ও গন্তব্য নয়, গত কয়েক বছরের বইয়ের চাহিদাপত্র, সরবরাহ, বিতরণ, অবিতরণকৃত বইয়ের হিসাব, গুদামজাতকরণ এবং নিলামসংক্রান্ত নথিপত্র যাচাইয়ের দাবি উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব নথি পর্যালোচনা করা হলে সরকারি বই সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তার প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন