প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বাংলাদেশের সীমান্তের পাশে অবস্থিত মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের কিয়াউকতাও শহরের একটি ব্যস্ত পাইকারি বাজারে বিমান হামলার ফলে অন্তত ৪৯ জন নিহত হয়েছেন। এছাড়া, আহত হয়েছেন আরও ৫৮ জন, যাদের মধ্যে ২২ জনের অবস্থা গুরুতর। সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় এই হামলার ঘটনা ঘটে। মঙ্গলবার, নিহত ও আহতের সংখ্যা ৪৯ ও ৫৮-তে পৌঁছানোর তথ্য নিশ্চিত করেছে আরাকান আর্মি ও স্থানীয় উদ্ধারকারী সূত্র।
আরাকান আর্মি (এএ) জানিয়েছে, মিয়ানমারের একটি যুদ্ধবিমান কিয়াউকতাও শহরের ব্যস্ত বাজারে পরপর দুটি বোমা ফেলে। হামলার সময় বাজারে ক্রেতা, বিক্রেতা ও পথচারীদের ভিড় ছিল। এই হামলায় ঘটনাস্থলেই অনেকের মৃত্যু হয় এবং বহু মানুষ আহত হন। স্থানীয় উদ্ধারকারী কর্মকর্তারাও হতাহতের সংখ্যা নিশ্চিত করেছেন।
রাখাইনের জ্যেষ্ঠ উদ্ধারকর্মী ওয়াই হুন অং বলেন, কিয়াউকতাওয়ের বাজারটি রাজ্যের অন্যতম প্রধান পাইকারি কেন্দ্র। এখানে রাখাইন রাজ্যের বিভিন্ন এলাকা থেকে ব্যবসায়ী, খুচরা বিক্রেতা ও সাধারণ ক্রেতারা কেনাকাটা করতে আসেন। হামলার সময় বাজারটিতে বিপুলসংখ্যক মানুষ উপস্থিত ছিলেন। তিনি এই হামলাকে রাখাইনে সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে অন্যতম ভয়াবহ বিমান হামলা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
হামলার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি ও ভিডিওতে বাজার এবং আশপাশের এলাকায় ব্যাপক অগ্নিকাণ্ডের দৃশ্য দেখা যায়। কয়েকটি ভবন ও যানবাহনে আগুন জ্বলতে দেখা যায়। বিমান হামলায় বাজারসংলগ্ন একটি সেতুও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব ছবি ও ভিডিওর সবগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী হামলার বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে পূর্বে বিভিন্ন হামলার ক্ষেত্রে সামরিক কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, তাদের বিমান হামলা নির্দিষ্ট সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে পরিচালিত হয় এবং বেসামরিকদের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে সর্বোচ্চ সতর্কতা নেওয়া হয়।
বর্তমানে কিয়াউকতাও শহরটি আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। রাখাইন রাজ্যে স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে লড়াই করে আসা এই সশস্ত্র গোষ্ঠী ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযান শুরু করে। এরপর তারা রাখাইনের বিস্তীর্ণ এলাকা দখলে নেয় এবং বর্তমানে ১৭টি টাউনশিপের মধ্যে ১৪টির নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে।
রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে সংঘাত চলছে। সাম্প্রতিক সময়ে সেনাবাহিনী স্থলপথে নিয়ন্ত্রণ হারানোর পাশাপাশি বিমান হামলার ওপরও বেশি নির্ভর করছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। কিয়াউকতাও, ম্রাউক-উ ও পন্নাগুনসহ আরাকান আর্মি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় এর আগে বেশ কয়েকটি বিমান হামলার ঘটনা ঘটেছে।
গত বছরের ডিসেম্বরে রাখাইনের ম্রাউক-উ এলাকায় একটি হাসপাতালে বিমান হামলায় অন্তত ৩৪ জন নিহত ও ৮০ জন আহত হওয়ার খবর জানিয়েছিল এপি। চলমান সংঘাতের পাশাপাশি সেনাবাহিনীর বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞায় রাখাইনে বাণিজ্য ও পণ্য পরিবহণও ব্যাহত হচ্ছে। এতে খাদ্যসংকট ও মানবিক পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মিয়ানমারে ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সামরিক বাহিনী অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর দেশজুড়ে ব্যাপক সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। এরপর গণতন্ত্রপন্থি ও বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রা সেই সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বর্তমানে রাখাইন রাজ্যের রাজধানী সিত্তে, কিয়াউকফিউ ও মানাউং—এই তিনটি টাউনশিপ মূলত মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বিপরীতে রাজ্যের অধিকাংশ এলাকা আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। ফলে কিয়াউকতাওয়ের মতো আরাকান আর্মি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় সামরিক বাহিনীর বিমান হামলা অব্যাহত থাকায় বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন