প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
রামু সহিংসতার ১৪ বছর পূর্ণ হলো আজ। এই সময়ের মধ্যে বৌদ্ধদের মধ্যে সম্প্রীতি ফিরে এসেছে। দৃষ্টিনন্দন স্থাপনাশৈলীতে নির্মিত বিহারগুলোতে পূণ্যার্থীদের পাশাপাশি বেড়েছে পর্যটক আকর্ষণ। বর্তমানে পুজাপার্বন ও ধর্মীয় উৎসবে অন্য ধর্মালম্বীদের উপস্থিতিতে মুখরিত হয়ে ওঠে বিহার প্রাঙ্গন। সম্প্রীতিতে ফিরে আসায় বৌদ্ধরা খুশি। কিন্তু মামলাগুলোর নিষ্পত্তি না হওয়ায় আদালতে হাজিরা দিতে আসা নিরীহ লোকজনের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। পুলিশের দায়েরকৃত এসব মামলার বিষয়ে বিতর্ক শুরু থেকেই বিদ্যমান। রাজনৈতিক দলের নেতাদের টার্গেট হিসেবে নিজেদের ব্যর্থতা আড়াল করতে পুলিশ অসংখ্য নিরীহ লোকজনকে মামলায় জড়িয়েছে। আবার বিভিন্ন এলাকার লোকজন পুলিশকে ম্যানেজ করে এসব মামলায় ফাঁসাতে নাম জড়িয়ে দেয়।
এই ঘটনায় বৌদ্ধ সম্প্রদায় কোনো মামলা করেনি। তবে পুলিশের দায়েরকৃত বিতর্কিত মামলাগুলোতে আদালতে বছরের পর বছর হাজিরা দিয়ে নিরীহ লোকজন চরম দূর্ভোগের শিকার হচ্ছে। সাক্ষীর অভাবে এসব মামলার নিষ্পত্তি হচ্ছে না। পুলিশ মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেয়ার পরও ১৪ বছর পেরিয়ে গেলেও একটি মামলারও নিষ্পত্তি হয়নি। বারবার নোটিশের পরও সাক্ষীরা উপস্থিত না হওয়ায় মামলাগুলো খারিজ হওয়ার পথে। অর্থাৎ, মামলার বিচারপ্রক্রিয়া এখন থমকে গেছে।
২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের রামু, ৩০ সেপ্টেম্বর উখিয়া ও টেকনাফের বৌদ্ধ বিহার এবং বৌদ্ধ পল্লীতে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ১৯টি বৌদ্ধ বিহার ও ৪১টি বসতঘর পুড়ে যায়। ভাংচুর ও লুটপাটের শিকার হয় আরো ৬টি বৌদ্ধ বিহারসহ অর্ধশত বৌদ্ধ বসতঘর। এতে কয়েক শত বছরের প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পুড়ে যায়। ঘটনার পরপরই পোড়া মন্দিরে নান্দনিক স্থাপনা নির্মাণ করা হয়। এই নারকীয় হামলার বিচারপ্রক্রিয়া ১৪ বছরেও শেষ হয়নি। সাক্ষীর অভাবে বিচার প্রক্রিয়া থমকে আছে।
২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ভয়াল রাতে দুষ্কৃতিকারীদের আগুনে বসত ঘরে পুড়ে যায় এডভোকেট সুমথ বড়ুয়ার ঘর। তিনি জানান, বর্তমানে পুলিশের দায়েরকৃত মামলাগুলোতে অনেক নিরীহ মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছে। যা নিয়ে মানুষের ক্ষোভ বাড়ছে। তাই তিনি একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করে প্রকৃত আসামীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান। এতে নিরীহ লোকজনের হয়রানি বন্ধ হবে।
ক্ষতিগ্রস্ত বৌদ্ধদের আক্ষেপ ও অভিযোগ হলো মামলার আসামী এবং সাক্ষীর সাক্ষ্য দেয়ার বিষয়ে। বৌদ্ধরা মনে করেন, মামলার আসামী এবং সাক্ষী হিসেবে যাদের নাম দেয়া হয়েছিল, তাদের নাম যথাযথভাবে উল্লেখ করা হয়নি। বর্তমানে সাক্ষীর তালিকায় থাকা অনেকেই জানেন না যে তাদের নাম সেখানে রয়েছে। এই কারণে ১৪ বছর পরও বিচারপ্রক্রিয়ার অচলাবস্থা নিয়ে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মধ্যে অসন্তোষ বিদ্যমান।
রামু সহিংসতার সেই কালো রাতের ঘটনা স্মরণ করে রামু কেন্দ্রীয় সীমা মহাবিহারের পরিচালক শীলপ্রিয় থের বলেন, ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর আমাদের বৌদ্ধ বিহারগুলো ধ্বংস করা হয়েছে। সেই সম্পদ ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। সেই সময়ে কিছু দুর্বৃত্তের একটি রাত ছিলো। ঘটনার স্মরণে এখনও চোখ দিয়ে জল বাহির হয়ে আসে। কঠিন সময় গেছে আমাদের। দুর্বৃত্তরা আমাদের বৌদ্ধ বিহার ও বৌদ্ধ পল্লী পুড়িয়ে দিয়ে অনেক ক্ষতি করেছে। তিনি বলেন, আমরা হারিয়ে যাওয়া দিনের চেয়ে বর্তমানে অনেক সম্প্রীতি ভোগ করছি। এখন আমাদের সম্প্রীতি অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা রামুবাসিরা সম্প্রীতিতে আছি। আগামী দিনেও আমাদের এ সম্প্রীতি ধরে রাখতে হবে।
জানা গেছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে পবিত্র কোরআন অবমাননার গুজব ছড়িয়ে ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রামুর ১২ বৌদ্ধ বিহার, ৩০টি বসতঘর, পরদিন ৩০ সেপ্টেম্বর উখিয়া ও টেকনাফে ৭টি বৌদ্ধ বিহার, ১১টি বসতঘর পুড়িয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা। পুড়ে যায় এসব মন্দিরে থাকা হাজার বছরের প্রত্নতাত্ত্বিক সব নিদর্শন। লুটপাট ও ভাংচুর করা হয় আরো ৬টি বৌদ্ধ বিহার, অর্ধশত বৌদ্ধ বসতঘরে। এ ঘটনার পর দায়ের করা হয় ১৯টি মামলা। এর মধ্যে রামুর আটটি মামলায় ৪৫৮ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। তবে রামু থানায় জনৈক সুধাংশু বড়ুয়ার করা মামলাটি দু’পক্ষের আপস মীমাংসার ভিত্তিতে প্রত্যাহার করা হয়।
কক্সবাজার বৌদ্ধ সুরক্ষা পরিষদের সভাপতি প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু বলেন, রামু সহিংসতার ১৪ বছরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ফিরে এসেছে। রামুর বৌদ্ধরা পেয়েছে দৃষ্টিনন্দন বৌদ্ধ বিহার। কিন্তু রামুর ঘটনার মামলার কার্যক্রম থমকে আছে। পুলিশ মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দিলেও একটি মামলাও নিষ্পত্তি হয়নি। সেই মামলার বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা সংশয়।
বৌদ্ধদের অভিযোগ, ২০১২ সালের ২৯ ও ৩০ সেপ্টেম্বর রামু ও উখিয়া-টেকনাফে বৌদ্ধপল্লীতে চালানো নারকীয় হামলার ১৮ মামলার একটি বিচারও শেষ হয়নি। ন্যাক্কারজনক এ ঘটনায় দায়ীরা কেউ শাস্তি পায়নি এখনও। ঘটনার পর বিভিন্ন মামলায় ৯৯৫ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয় পুলিশ। এ ঘটনায় আটকরা সবাই এখন জামিনে মুক্ত। অনেকেই বিদেশে চলে গেছে। ঘটনার পরপরই ক্ষতিগ্রস্ত বৌদ্ধ বিহার ও ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ করেছে সরকার। দীর্ঘ ১৪ বছরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আবারও ফিরে এসেছে বলে জানিয়েছেন রামুর বৌদ্ধরা।
কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পি.পি) অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ ইউনুস জানিয়েছেন, কয়েকটি মামলায় স্বাক্ষীরা আসলেও অনেক মামলায় স্বাক্ষীরা এখনো সাক্ষ্য দিতে আসেননি। সাক্ষীরা যদি যথাযথ সাক্ষ্যদান করেন, তাহলে প্রকৃত দোষীদের শাস্তি দিয়ে বিচারকার্য সম্পন্ন করা যাবে এবং ঘটনার সত্য উদঘাটন হবে। ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রামু ট্র্যাজেডির ঘটনায় ফেইসবুকে কোরআন অবমাননার ছবি ট্যাগকারী উত্তম বড়ুয়া বর্তমানে সপরিবারে ফ্রান্সে অবস্থান করছেন। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ছবি দেখে এ ধারণা করা হচ্ছে। এর আগে রামুতে বৌদ্ধ বিহার পোড়ানোর দিন থেকেই আত্মগোপনে ছিলেন উত্তম বড়ুয়া।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন