প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
একাধিক মাদক মামলার আসামি ওয়ালিদ হোসেন অলি; মাদক ব্যবসা ও কিশোর গ্যাং পরিচালনার অভিযোগ, পুলিশের কিছু সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগের দাবিও
বরিশাল নগরীতে মাদকের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান জোরদার করেছে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ (বিএমপি)। একের পর এক মাদক কারবারি গ্রেপ্তার হলেও বাংলাবাজার এলাকায় ২২ বছর বয়সী ওয়ালিদ হোসেন অলিকে ঘিরে মাদক ব্যবসা, কিশোর গ্যাং পরিচালনা এবং পুলিশের কিছু সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তই চূড়ান্ত বিষয়।
বাংলাবাজার এলাকার একাধিক বাসিন্দার ভাষ্য, অল্প বয়সেই অলি মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে এলাকায় একটি প্রভাববলয় তৈরি করেছেন বলে তাদের ধারণা। তার সঙ্গে কিশোর ও তরুণদের একটি গ্রুপ রয়েছে এবং তাদের মাধ্যমে মাদক সরবরাহ ও বিক্রির কার্যক্রম পরিচালিত হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অলির বিরুদ্ধে একাধিক মাদক মামলাসহ বিভিন্ন মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে। ২০২৫ সালের ২৪ আগস্ট রাতে বাংলাবাজার ইঞ্জিনিয়ার সড়কের একটি ভাড়া বাসা থেকে ৭৫ পিস ইয়াবাসহ তাকে গ্রেপ্তার করে বরিশাল মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এ ঘটনায় ডিবির এসআই মো. ফিরোজ আলম বাদী হয়ে কোতোয়ালি মডেল থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করেন।
পরে জামিনে মুক্ত হয়ে অলি ফের এলাকায় সক্রিয় হয়েছেন বলে স্থানীয়দের একাংশের দাবি। বাংলাবাজার, রিফিউজি কলোনি, কালুশাহ সড়ক, আমতলার মোড়, আশেদ আলী সড়ক এবং ১১ নম্বর ওয়ার্ডের ব্যাপ্টিস্ট মিশন রোডসংলগ্ন এলাকায় মাদক কেনাবেচার অভিযোগও রয়েছে।
এলাকাবাসীর কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আশেদ আলী সড়কের সঙ্গে সংযুক্ত ড্রেনের ওপর তৈরি একটি রাস্তার এলাকায় সন্ধ্যার পর মাদকসেবী ও বিক্রেতাদের আনাগোনা বাড়ে। সেখানে নিয়মিত মাদক কেনাবেচা চলে বলেও কয়েকজনের দাবি।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, এসব কথিত মাদক কার্যক্রমের সঙ্গে অলির সম্পৃক্ততা রয়েছে। তার সঙ্গে থাকা কিশোর ও তরুণদের একটি অংশ মাদক সরবরাহ ও বিক্রির কাজে ব্যবহৃত হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
মাদক ব্যবসার পাশাপাশি কিশোর গ্যাংয়ের মাধ্যমে এলাকায় প্রভাব বিস্তার ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগও রয়েছে। বাংলাবাজার এলাকার এক ব্যবসায়ী বলেন, মাদক ব্যবসার সঙ্গে কিশোর গ্যাংয়ের কথিত যোগসূত্র ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের অপরাধের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
তালাশ বিডির অনুসন্ধানে অলিকে ঘিরে কয়েকজন ব্যক্তির নাম ও যোগাযোগের তথ্য সামনে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। একাধিক সূত্রের ভাষ্য, একসময় র্যাবের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত ‘নাক কাটা রুবেল’-এর মাধ্যমে অলির অপরাধজগতে প্রবেশ ঘটে বলে অভিযোগ রয়েছে। রুবেল আত্মগোপনে যাওয়ার পর বাংলাবাজার বড়বাড়ি এলাকার এক যুবকের কাছ থেকেও অলি আশ্রয়-প্রশ্রয় পাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই যুবক নিজেকে ছাত্রদল নেতা হিসেবে পরিচয় দেন বলে সূত্রের দাবি।
অলির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের আরেকটি গুরুতর দিক হলো পুলিশের কিছু মাঠপর্যায়ের সদস্যের সঙ্গে তার যোগাযোগ থাকার দাবি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি জানান, অভিযানের খবর আগেই পেয়ে যাওয়ার সুযোগ পান অলি—এমন ধারণা স্থানীয়ভাবে রয়েছে। কিছু পুলিশ সদস্যের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে বলে তারা দাবি করেন।
তবে কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করার মতো সরকারি নথি বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্য এই প্রতিবেদন প্রস্তুতের সময় পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। বিষয়টি পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবগত করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
২০২৬ সালের ২৫ মার্চ তরিকুল ইসলাম নামে এক যুবককে প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে জখম করার অভিযোগ ওঠে। পরে ধারালো অস্ত্র উঁচিয়ে একটি দল ঘটনাস্থল ত্যাগ করে বলে প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রের দাবি। একটি সূত্রের দাবি, মাদক ব্যবসায় বাধা দেওয়ার জেরে ওই হামলা হয় এবং এতে অলির সম্পৃক্ততা নিয়ে এলাকায় আলোচনা রয়েছে। তবে এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগের আইনগত অবস্থান ও তদন্তের অগ্রগতি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে যাচাই করা প্রয়োজন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় বাবা-মায়ের সঙ্গে টিনের ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন অলি এবং শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মাঠে খেলাধুলা করতেন। বর্তমানে তার জীবনযাপন ও চলাফেরায় পরিবর্তন এসেছে বলে তাদের দাবি। বাংলাবাজারের এক বাসিন্দার দাবি, অলির দুটি ইয়ামাহা এফজেড মোটরসাইকেল রয়েছে এবং তিনি একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে বসবাস করছেন।
তার বর্তমান জীবনযাপন ও সম্পদের উৎস নিয়েও এলাকায় আলোচনা রয়েছে। তবে এসব বিষয় নিজে কোনো অপরাধের প্রমাণ নয়; সম্পদের উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত হতে নথিপত্র যাচাই প্রয়োজন।
অন্যদিকে, বাংলাবাজার এলাকায় অলির কথিত মাদক নেটওয়ার্ক ও তার সঙ্গে থাকা কিশোরদের কার্যক্রম নিয়ে একটি বিশেষ ডিবি টিম তথ্য সংগ্রহ করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
অলির বক্তব্য জানতে তালাশ বিডির পক্ষ থেকে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে মাদক ব্যবসার অভিযোগ অস্বীকার করেন। পরে তাকে তার বিরুদ্ধে থাকা মাদক মামলার নথি এবং মাদকবিরোধী অভিযান চলাকালীন কথিত কার্যক্রমের বিষয়ে তথ্য ও প্রমাণ থাকার কথা জানানো হলে অলি বলেন, “আমি এখন থানায় আছি, আপনার সঙ্গে পরে কথা বলব।”
পরবর্তীতে হোয়াটসঅ্যাপে একাধিকবার তার বক্তব্য চাওয়া হয়। জবাবে ভয়েস বার্তায় তিনি বলেন, “আমি আপনার সঙ্গে রাতে বাসার সামনে এসে কথা বলব।” তবে নির্ধারিত সময়ে তার সঙ্গে সরাসরি কথা বলা সম্ভব হয়নি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে।
এ বিষয়ে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের (বিএমপি) উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) সুশান্ত সরকার, পিপিএম হোয়াটসঅ্যাপে তালাশ বিডিকে পাঠানো এক বার্তায় বলেন, “২২ বছর বয়সী ওয়ালিদ হোসেন অলির বিরুদ্ধে একাধিক মাদকসহ বিভিন্ন মামলা রয়েছে। তার বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসা পরিচালনার যে অভিযোগ উঠেছে, সেটিও আমাদের নজরে রয়েছে। তাকে নিয়ে আমাদের বিশেষ ডিবি টিম কাজ করছে। বরিশালে কোনো মাদক ব্যবসায়ীকে ছাড় দেওয়া হবে না। তাদের গ্রেপ্তার করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আইনগত প্রক্রিয়া অনুযায়ী যেকোনো সময় অলিকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “পুলিশের কোনো সদস্য মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগসাজশ করে অভিযানের তথ্য ফাঁস করেছেন বা তাদের কোনোভাবে সহযোগিতা করেছেন—তদন্তে এমন কোনো তথ্য বা প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে কাউকে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।”
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন