প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
‘শিক্ষক-শিক্ষার্থী’ অনুপাতকে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষার পরিবেশ ও একাডেমিক মানদণ্ড মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) এই সূচকে দেশের অন্যান্য স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগ ও ইনস্টিটিউটভেদে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাতের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য লক্ষ্য করা গেছে। ৬১টি বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৩৪টিতে একজন শিক্ষকের বিপরীতে শিক্ষার্থী ২৫ জনের বেশি রয়েছে।
শিক্ষার পরিবেশ মূল্যায়নের ক্ষেত্রে কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাঙ্কিংস ও টাইমস হায়ার এডুকেশন আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় র্যাঙ্কিংয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচনা করে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের বার্ষিক প্রতিবেদন ও উচ্চশিক্ষাসংক্রান্ত নীতিমালা পর্যালোচনায় দেখা যায়, বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর কাম্য অনুপাত প্রতি ১৫ জন শিক্ষার্থীর জন্য ১ জন শিক্ষক এবং সর্বোচ্চ সহনীয় সীমা প্রতি ২০ জন শিক্ষার্থীর জন্য ১ জন শিক্ষক হিসেবে ধরা হয়। সেই অনুযায়ী, রাবির ৩৪টি বিভাগ ও ইনস্টিটিউটে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত সহনীয় সীমার চেয়েও বেশি।
এদিকে, ইউজিসির ২০২৫ সালে প্রকাশিত ৫০তম বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, তিন স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতি ১৫ জন শিক্ষার্থীর জন্য ১ জন শিক্ষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতি ১৮ জন শিক্ষার্থীর জন্য ১ জন এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতি ১৮ জন শিক্ষার্থীর জন্য ১ জন শিক্ষক রয়েছেন। এর তুলনায়, রাবিতে প্রতি ২১ জন শিক্ষার্থীর জন্য ১ জন শিক্ষক রয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, রাবিতে বর্তমানে ৩০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী এবং প্রায় ১ হাজার ২০০ শিক্ষক রয়েছেন। এ হিসাবে, বর্তমান শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত দাঁড়ায় প্রায় প্রতি ২৫ জন শিক্ষার্থীর জন্য ১ জন শিক্ষক। অর্থাৎ, একজন শিক্ষককে গড়ে প্রায় ২৫ জন শিক্ষার্থীকে পাঠদান করতে হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সর্বশেষ পাঁচটি বার্ষিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতের কিছুটা উন্নতি ঘটেছে, তবে তা ধারাবাহিক নয়। ৪৬তম প্রতিবেদনে প্রতি ৩৩ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক থাকলেও ৪৭তম প্রতিবেদনে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫ জনে। এরপর ৪৮তম প্রতিবেদনে ২৪, ৪৯তম প্রতিবেদনে ২০ এবং সর্বশেষ ৫০তম প্রতিবেদনে প্রতি ২১ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক ছিলেন।
৩৪ বিভাগে নেই আন্তর্জাতিক মান
বিভাগভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাতে সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় রয়েছে মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ। সেখানে প্রতি ৫৬ জন শিক্ষার্থীর জন্য ১ জন শিক্ষক। এরপর ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্সে প্রতি ৪৬ জনের জন্য ১ জন, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্টে প্রতি ৪১ জনের জন্য ১ জন রয়েছেন।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানে প্রতি ৪০ জনের জন্য ১ জন শিক্ষক, সংস্কৃত বিভাগে প্রতি ৩৮ জনের জন্য ১ জন, চিত্রকলা, প্রাচ্যকলা ও ছাপচিত্র এবং অর্থনীতি বিভাগে প্রতি ৩৫ জনের জন্য ১ জন, আইবিএতে প্রতি ৩৪ জনের জন্য ১ জন এবং চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানে প্রতি ৩৩ জনের জন্য ১ জন শিক্ষক রয়েছেন।
মার্কেটিং বিভাগে প্রতি ৩২ জনের জন্য ১ জন, ইতিহাসে প্রতি ৩১ জনের জন্য ১ জন, আইন ও ভূমি প্রশাসন, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং ইংরেজি বিভাগে প্রতি ৩০ জনের জন্য ১ জন শিক্ষক রয়েছেন।
দর্শনে প্রতি ২৯ জনের জন্য ১ জন, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে প্রতি ২৮ জনের জন্য ১ জন, ইনফরমেশন সায়েন্স অ্যান্ড লাইব্রেরি ম্যানেজমেন্ট, ইসলামিক স্টাডিজ ও ফাইন্যান্সে প্রতি ২৭ জনের জন্য ১ জন এবং আইন ও ফলিত গণিতে প্রতি ২৬ জনের জন্য ১ জন শিক্ষক রয়েছেন।
সমাজবিজ্ঞান, গ্রাফিক ডিজাইন, কারুশিল্প ও শিল্পকলার ইতিহাস এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে প্রতি ২৫ জনের জন্য ১ জন; মৃৎশিল্প ও ভাস্কর্য, ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ এবং ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যায় প্রতি ২৪ জনের জন্য ১ জন, ভূ-তত্ত্ব ও খনিবিদ্যা এবং নৃবিজ্ঞানে প্রতি ২৩ জনের জন্য ১ জন শিক্ষক রয়েছেন।
ফারসি ও ভাষা সাহিত্যে প্রতি ২২ জনের জন্য ১ জন এবং শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়া বিজ্ঞানে প্রতি ২১ জনের জন্য ১ জন শিক্ষক রয়েছেন। একই অনুপাতে বাংলা, প্রাণিবিদ্যা এবং ফলিত রসায়ন ও রসায়ন প্রকৌশল বিভাগেও প্রতি ২১ জন শিক্ষার্থীর জন্য ১ জন শিক্ষক রয়েছেন।
অনুপাতে এগিয়ে ১৭ বিভাগ
অন্যদিকে, ১৭টি বিভাগ ও ইনস্টিটিউটে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত কাম্য সীমার মধ্যে রয়েছে। সবচেয়ে ভালো অবস্থানে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগে প্রতি ৭ জন শিক্ষার্থীর জন্য ১ জন শিক্ষক এবং প্রাণ রসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগে প্রতি ৮ জনের জন্য ১ জন শিক্ষক রয়েছেন।
নাট্যকলায় প্রতি ৯ জনের জন্য ১ জন, ফার্মেসিতে প্রতি ১০ জনের জন্য ১ জন, ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও ভেটেরিনারি অ্যান্ড এনিমেল সায়েন্সেসে প্রতি ১১ জনের জন্য ১ জন।
কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ও পদার্থবিজ্ঞানে প্রতি ১২ জনের জন্য ১ জন এবং ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে প্রতি ১৩ জনের জন্য ১ জন শিক্ষক রয়েছেন।
পপুলেশন সায়েন্স অ্যান্ড হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট, ক্রপ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, রসায়ন ও ফিশারিজে প্রতি ১৪ জনের জন্য ১ জন এবং সমাজকর্ম, উদ্ভিদবিজ্ঞান, লোক প্রশাসন ও গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে প্রতি ১৫ জন শিক্ষার্থীর জন্য ১ জন শিক্ষক রয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স সেলের (আইকিউএসি) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. আবু রেজা মন্তব্য করেন, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত শিক্ষার মান ও পাঠদানের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে। অনুপাত ঠিক না থাকলে একজন শিক্ষকের ওপর শিক্ষার্থীর চাপ বৃদ্ধি পায়। ফলে পর্যাপ্তসংখ্যক শিক্ষার্থীকে কার্যকরভাবে পাঠদান করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং শিক্ষার মানে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। একটি বিভাগে যদি শিক্ষার্থীসংখ্যা বেশি থাকে কিন্তু শিক্ষক কয়েকজন থাকেন, তাহলে প্রত্যেক শিক্ষকের ওপর অতিরিক্ত একাডেমিক চাপ তৈরি হয়। এ অবস্থায় মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সভাপতি অধ্যাপক ড. আকতার বানু বলেন, শিক্ষার মানের ক্ষেত্রে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাতের প্রভাব অত্যন্ত বেশি। ক্লাসে শিক্ষার্থীর সংখ্যা যত বেশি হয়, একজন শিক্ষকের পক্ষে পুরো শ্রেণিকক্ষ নিয়ন্ত্রণ করা এবং প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছে পাঠটি যথাযথভাবে পৌঁছে দেওয়া তত কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ সব শিক্ষার্থী একইভাবে বা একই গতিতে বিষয় বুঝতে পারে না। কারও দ্রুত বোঝার সক্ষমতা থাকে, আবার কারও বেশি সময় প্রয়োজন হয়। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত কম থাকলে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর প্রয়োজন ও সমস্যাকে আলাদাভাবে গুরুত্ব দিয়ে মোকাবিলা করা সম্ভব হয়।
তিনি আরও বলেন, আমাদের দেশে জনসংখ্যা অনেক বেশি, সে তুলনায় শিক্ষকসংখ্যা কম। একইসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী ভর্তির সংখ্যাও বেশি। ফলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। দেশের অতিরিক্ত জনসংখ্যার প্রভাব শিক্ষা থেকে শুরু করে জীবনের প্রায় সব ক্ষেত্রেই পড়ছে। শিক্ষার্থীর সংখ্যা ও শিক্ষকের সংখ্যার মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করা খুবই জরুরি।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল আলিম জানান, রাবিতে দীর্ঘদিন শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ থাকায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাতের মধ্যে বড় ধরনের ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে। ২০১৮ থেকে প্রায় ২০২৪ সাল পর্যন্ত কয়েক বছর নিয়মিত শিক্ষক নিয়োগ না হওয়ায় এ অনুপাত আরও বেড়ে গেছে। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় রাবিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত কিছুটা বেশি। দীর্ঘ সময় নিয়োগ বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি আরও প্রকট হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতের বিষয়ে তিনি বলেন, "আমরা সব ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার চেষ্টা করছি। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাতও এর একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। কাঙ্ক্ষিত আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছাতে না পারা অবশ্যই আমাদের জন্য একটি নেতিবাচক দিক। শিক্ষকসংকট কমিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত উন্নত করার বিষয়টি আমাদের বিবেচনায় রয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন