প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ চীনসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের গ্রেফতার করেছে। তবে, এসব বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে দেশের আইন-শৃঙ্খলা অবনতি বা রাষ্ট্রের জন্য হুমকি হওয়ার কোনো অভিযোগ ছিল না।
আটককৃতদের মধ্যে অনেকেই ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও বসবাস করছিলেন। তাদের সাথে পাওয়া বিভিন্ন ধরনের ইলেকট্রনিক ডিভাইস থেকেও রাষ্ট্রের জন্য হুমকিস্বরূপ কিছু পাওয়া যায়নি পুলিশ ও গোয়েন্দাদের দ্বারা। কিন্তু, রাষ্ট্রের জন্য হুমকি এবং দেশের আইন-শৃঙ্খলা অবনতির চেষ্টায় মরিয়া পলাতক আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে রাষ্ট্রের সবচেয়ে স্পর্শকাতর এলাকায় ঝটিকা মিছিল করছে।
ককটেল বা বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে পালিয়ে গেছে তারা। অথচ, এ বিষয়ে আগাম কোনো তথ্য ছিল না দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে। গোয়েন্দা ব্যর্থতার কারণে রাজধানীর গুলশানসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক ঝটিকা মিছিল করছে পলাতক ফ্যাসিস্টদের দোসররা। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক ঝটিকা মিছিলের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে, পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, যদিও দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা নিষ্ক্রিয়।
নির্দিষ্ট স্থান ও সময় সম্পর্কে সঠিক গোয়েন্দা তথ্য না পাওয়ার কারণে মিছিল শুরুর আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হচ্ছে মাঠপর্যায়ের পুলিশ। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বয়হীনতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ঢাকা, গাজীপুর ও চট্টগ্রামে একযোগে নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের ঝটিকা মিছিল এবং পুলিশ ও গোয়েন্দা ব্যর্থতা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ সর্বত্র আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। সমালোচনা হচ্ছে খোদ সরকারের ভেতর থেকেও।
রোববার পুলিশের একাধিক কর্মকর্তার সাথে কথা বলে জানা গেছে, মিছিল হবে এরকম আগাম কোনো তথ্য ছিল না। সাধারণত এনএসআই ও এসবি থেকে এসব তথ্য জানানো হয়ে থাকে। এ ছাড়া সিআইডি, ডিএমপির নিজস্ব গোয়েন্দা ইউনিট এবং থানার সিভিল ইউনিটও আগাম গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করে থাকে। এর বাইরে ডিজিএফআইও নানা ধরনের তথ্য সংগ্রহ করে। আগাম তথ্যের ভিত্তিতেই মূলত র্যাব ও পুলিশ আগাম ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। কিন্তু গুলশানে আওয়ামী লীগের এত বড় মিছিলের আগাম কোনো তথ্য ছিল না। ফলে পুলিশ তাৎক্ষণিক কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। পরবর্তী সময়ে মিছিলের ভিডিও ফুটেজ দেখে গুলশান ও এর আশপাশের এলাকা থেকে ৪৬ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের সবাইকে এরই মধ্যে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
অন্যদিকে, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর একাধিক কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সাধারণত লিখিত ও ম্যাসেজ আকারে সংস্থাগুলোর সদর দপ্তরে আগাম তথ্য পাঠানো হয়। দপ্তর প্রধানরা সেই তথ্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধানদের জানান। আর বাহিনী প্রধানরা সে অনুযায়ী আগাম ব্যবস্থা নিয়ে থাকেন। গুলশানের ঘটনায় তেমন কোনো আগাম তথ্য মাঠ থেকে যায়নি। কেন এমনটা হলো তা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। এরই মধ্যে কয়েক দফা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে। সেখানে নানা বিষয় উঠে এলেও গোয়েন্দা ব্যর্থতার কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায়নি। মাঠ পর্যায়ের গোয়েন্দারা জানিয়েছেন, তারা মিছিলের কোনো আগাম তথ্য পায়নি। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট উঠে এসেছে যে, পরিকল্পনাটি হয়েছে গুলশানের বাইরে। বাইরে থেকে এসে তারা গুলশানে জড়ো হয়ে হঠাৎ করেই মিছিল করে পালিয়ে গেছে। যে কারণে মিছিলের আগে কোনো আগাম তথ্য পায়নি গোয়েন্দারা। এদিকে, মিছিলের ঘটনাটি নিছক গোয়েন্দা ব্যর্থতা, নাকি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অবহেলা, তা নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে নানামুখী আলোচনা। মাঠ পর্যায়ের গোয়েন্দারা ইচ্ছা করেই এরকম তথ্য সংগ্রহ করেনি, নাকি তথ্য থাকার পরও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করেনি- তা নিয়েও পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ে চলছে বিশদ আলোচনা।
আওয়ামী লীগ উঁকি মারছে—এমন মন্তব্য করে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি প্রশ্ন করেন, গোয়েন্দারা কোথায়? তিনি বলেন, নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলটি হঠাৎ করে প্রকাশ্যে মিছিল করার চেষ্টা করছে। এত মানুষ কীভাবে জড়ো হলো, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তা জানত না কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন। পুলিশ প্রশাসন কী করছিল, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার বলে মন্তব্য করেন তিনি। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে রিজভী বলেন, আওয়ামী লীগ একটি রাজনৈতিক দল হলেও দলটির কর্মকাণ্ডের বিচার হওয়া প্রয়োজন। তার অভিযোগ, আন্দোলনের সময় প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, রিকশাচালক, শ্রমিকসহ সাধারণ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ যদি আগের সেই ‘জিঘাংসু’ চেহারা নিয়েই ফিরে আসতে চায়, তাহলে দেশের পরিণতি কী হবে, তা নিয়ে গণতন্ত্রকামী মানুষের শঙ্কিত হওয়ার কারণ রয়েছে।
সূত্র জানিয়েছে, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মিছিল বের করার পর থেকেই পুলিশের ওপর সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে তীব্র প্রশাসনিক চাপ তৈরি হয়েছে। মাঠপর্যায়ে পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থাকার পরও কীভাবে নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মীরা এভাবে একযোগে মিছিল করতে পারল, সে বিষয়ে কড়া জবাব চাওয়া হয়েছে। তবে অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি, এই সামগ্রিক পরিস্থিতির মূল কারণ গোয়েন্দা তথ্যের চরম ঘাটতি। বিষয়টি নিয়ে বর্তমানে পুলিশ বাহিনীর ভেতরে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের চাপের মুখে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারাও গোয়েন্দা তথ্যের ঘাটতির বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরছেন। তাদের মতে, আগে থেকে সুনির্দিষ্ট ও সময়োপযোগী তথ্য পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন ও নজরদারি বাড়িয়ে মিছিল শুরু হওয়ার আগেই তা পণ্ড করে দেওয়া সম্ভব হতো।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ক্ষমতাচ্যুতির পর ঝটিকা মিছিল এবং বিদেশে অবস্থানরত নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে কর্মীদের সক্রিয় রাখার নতুন কৌশল নিয়েছে দলটি। ডিসেম্বরকে সামনে রেখে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা বা নাশকতার পরিকল্পনা রয়েছে কি না, তা রুখতে পুলিশ বাহিনীকে হাই-অ্যালার্টে রেখে গোয়েন্দা সমন্বয় বাড়াতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল ঠেকাতে মাঠপর্যায়ের পুলিশকে আগেই কঠোর সতর্কবার্তাসহ প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। তবে কোথায়, কখন এবং কারা সংগঠিত হচ্ছে— এ জাতীয় সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য সময়মতো না পাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে আগে থেকে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি। মিছিল শুরু হওয়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করা হয়েছে।
পুলিশের আরেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় একই সময়ে এ ধরনের ঝটিকা কর্মসূচি পালন নিঃসন্দেহে বড় উদ্বেগের বিষয়। পুলিশের নিজস্ব সোর্সের মাধ্যমে সব স্থানের আগাম গতিবিধি জানা সম্ভব নয়, তাই গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে মাঠপর্যায়ে সময়মতো তথ্য পাওয়া অত্যন্ত জরুরি। শুক্রবারের ঘটনাগুলো নিয়ে ইতোমধ্যে পুলিশে অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনা শুরু হয়েছে এবং ঠিক কোথায় তথ্যের ঘাটতি ছিল তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মতে, গত কয়েক মাসে রাজধানীসহ চট্টগ্রাম ও গাজীপুরে জড়ো হয়ে দলীয় স্লোগান ও সরকারবিরোধী বক্তব্য দিয়ে দ্রুত সটকে পড়ার প্রবণতা বেড়েছে। কোথাও পুলিশ তাৎক্ষণিক ধাওয়া দিয়ে মিছিলকারীদের ছত্রভঙ্গ করেছে, আবার কোথাও ঝটিকা অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার নিশ্চিত করেছে। পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স উইংয়ের এআইজি এ. এইচ. এম. শাহাদাত হোসাইন ইনকিলাবকে বলেন, নিষিদ্ধ ঘোষিত কোনো দলের কার্যক্রম সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। কোনো ঘটনায় গোয়েন্দা ঘাটতি থাকলে তা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন