প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতিতে উৎপাদিত পণ্যের বাণিজ্য নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যুক্তরাজ্য। এই পদক্ষেপের ফলে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ব্রিটেনের এই সিদ্ধান্ত এবং একই সঙ্গে আরও ১১টি দেশের নিষেধাজ্ঞামূলক ব্যবস্থা দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় অবনতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
যুক্তরাজ্য ইসরায়েলের ক্ষোভের মূল লক্ষ্য হলেও, ১২টি দেশ একযোগে একই ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করায় বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। লন্ডন পূর্ব থেকেই জানত যে, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন নীতিতে এমন বড় পরিবর্তন তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিতে পারে। তবে ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়ার গতি ও তীব্রতা ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের জন্যও বিস্ময়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইসরায়েলের পাল্টা পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে পূর্ব জেরুজালেমে ব্রিটিশ কনস্যুলেট বন্ধ করে দেওয়া। এই কনস্যুলেট পশ্চিম তীরের বিষয়াদি নিয়ে কাজ করে এবং রামাল্লায় ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখে। পাশাপাশি গাজা উপত্যকায় স্থিতিশীলতা ও ত্রাণ কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য গঠিত ইন্টারন্যাশনাল গাজা সাপোর্ট সেন্টার থেকেও ব্রিটিশ প্রতিনিধিদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ইসরায়েলের এই পদক্ষেপগুলো থেকে বোঝা যাচ্ছে, যুক্তরাজ্যসহ ১২ দেশের মঙ্গলবারের সিদ্ধান্তকে দেশটি কতটা গুরুতর হিসেবে দেখছে। ওই দেশগুলোর মধ্যে ফ্রান্স, স্পেন ও কানাডাও রয়েছে।
ইসরায়েল থেকে রপ্তানি হওয়া পণ্যের তুলনায় বসতিতে উৎপাদিত পণ্যের পরিমাণ হয়তো খুব বেশি নয়। তবে এসব পণ্যকে আলাদাভাবে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনার রাজনৈতিক তাৎপর্য অনেক বেশি। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন পশ্চিমা সরকার
অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বসতিগুলোকে অবৈধ বলে বিবেচনা করে এলেও
সেখান থেকে উৎপাদিত বা চাষ করা পণ্যের ওপর সরাসরি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেনি।
এবার ব্রিটেন সেই অবস্থানে বড় পরিবর্তন এনেছে। ২০২৪ সালের আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) রায়ের সঙ্গে যুক্তরাজ্য একমত বলে ঘোষণা করার পর দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড বলেছেন, দখলদারত্বকে কেন্দ্র করে ব্রিটেনের অর্থনৈতিক সম্পর্কেও সেই অবস্থানের প্রতিফলন থাকা উচিত।
এর ফলে শুধু বসতিতে উৎপাদিত পণ্য নয়, বসতিগুলোর নির্মাণ, অবকাঠামো উন্নয়ন বা অর্থায়নের সঙ্গে যুক্ত কোম্পানিগুলোকেও নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়েছে। পাশাপাশি এমন অস্ত্র বিক্রিতেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে, যা ‘দখলদারত্বে বস্তুগতভাবে অবদান রাখে’। প্রত্যাশার তুলনায় এসব পদক্ষেপ অনেক বেশি কঠোর বলে মনে করা হচ্ছে।
ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এডওয়ার্ড মিলিব্যান্ড বলেছেন,
। একই সঙ্গে ইসরায়েলি সরকার এসব কর্মকাণ্ডের দিকে চোখ ফিরিয়ে রেখেছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
মিলিব্যান্ড ব্রিটিশ নীতির এই পরিবর্তনকে ‘রিসেট’ বা নতুন করে সাজানোর উদ্যোগ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে এর ব্যাপ্তি দেখে এটিকে কেবল নীতির পুনর্বিন্যাস নয়, বরং বড় ধরনের পুনর্বিবেচনা হিসেবেও দেখা হচ্ছে। এর ফলে ব্রিটেন-ইসরায়েল সম্পর্ক কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় পৌঁছেছে।
ইসরায়েলে আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিবেশ দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিওন সারের কঠোর প্রতিক্রিয়ায় ভূমিকা রাখতে পারে। তবে দেশটির অধিকাংশ মানুষও ব্রিটেনের সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়েছেন বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
ইসরায়েলের অনেক নাগরিক কিছু বসতিস্থাপনকারীর সহিংস ও ধর্মীয় উগ্র মতাদর্শকে সমস্যা মনে করেন। এমনকি কেউ কেউ তাদের দেশের জন্য বিব্রতকর বলেও মনে করেন। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে তারা ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধে দখল করা ভূখণ্ডে গড়ে ওঠা বসতিগুলোকে অবৈধ বলে মনে করেন।
অন্যদিকে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ ওলমার্ট গত বছর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে করে দেওয়ার অভিযোগ তুলেছিলেন। এমন বক্তব্যের সঙ্গে অধিকাংশ ইসরায়েলি একমত নাও হতে পারেন। তবে আন্তর্জাতিক চাপ যে ক্রমেই বাড়ছে, তা নিয়ে তাদের উদ্বেগ রয়েছে।
ইউরোভিশন ও বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ইসরায়েলবিরোধী প্রতিবাদ, দেশটির নেতাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং এবার বসতিতে উৎপাদিত পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা—সব মিলিয়ে ইসরায়েলের ওপর আন্তর্জাতিক চাপের পরিধি বাড়ছে। এতে দেশটির মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও আত্মরক্ষামূলক মনোভাব আরও জোরালো হচ্ছে।
ফিলিস্তিনিদের দৃষ্টিতে অবশ্য পরিস্থিতিটি ভিন্ন। তারা ১২ দেশের নেওয়া পদক্ষেপকে অগ্রগতি হিসেবে দেখছে। ফিলিস্তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিষেধাজ্ঞা আরোপকারী দেশগুলোকে স্বাগত জানালেও ইসরায়েলের ‘অবৈধ বসতি স্থাপন কার্যক্রম’ বন্ধে আরও ‘জরুরি ও বাস্তব পদক্ষেপ’ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
লন্ডনে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রদূত ড. হুসাম জোমলট ব্রিটিশ সরকারের সিদ্ধান্তকে যুক্তরাজ্য-ফিলিস্তিন সম্পর্কের ‘একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার ভাষ্য, ব্রিটেনের ‘সাহসী পদক্ষেপ’ ১৯৬৭ সালের সীমান্তের ভিত্তিতে পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করতে সহায়তা করবে।
তবে জোমলটও জানেন, ইসরায়েলের ৫৯ বছরের দখলদারত্ব এই সিদ্ধান্তের ফলে শেষ হয়ে যায়নি, এমনকি এতে পরিস্থিতির মৌলিক পরিবর্তনও ঘটেনি। কার্যকর ও টেকসই ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা এখনও অত্যন্ত ক্ষীণ। ১২ দেশের সম্মিলিত পদক্ষেপে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান নিয়ন্ত্রণ থামবে—এমন তাৎক্ষণিক কোনো লক্ষণও নেই।
এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়। ১৯৯১ সালে প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ এবং তার তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেমস বেকার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী ইয়িৎসহাক শামিরের সরকারকে ১০ বিলিয়ন ডলারের ঋণ নিশ্চয়তা বন্ধের হুমকি দিয়েছিলেন। অধিকৃত ভূখণ্ডে বসতি স্থাপনে ওই অর্থ ব্যবহার করা হবে না—এমন নিশ্চয়তা দিতে শামির অস্বীকৃতি জানালে ওয়াশিংটন এই চাপ প্রয়োগ করেছিল।
কিন্তু বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন পর্যন্ত নেতানিয়াহুর বসতি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নিয়ন্ত্রণে আনার কোনো আগ্রহ দেখাননি। ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ (ম্যাগা) আন্দোলনের কিছু অংশ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরায়েলের সমালোচনা করলেও ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি একজন দৃঢ় খ্রিস্টান জায়নবাদী। তিনি পশ্চিম তীরকে ইহুদিদের জন্য ঈশ্বরের প্রতিশ্রুত ভূমি হিসেবে দেখার ইসরায়েলি অবস্থানের সঙ্গে একমত।
ফলে যুক্তরাজ্য ও তার অংশীদার ১১ দেশের মঙ্গলবারের পদক্ষেপ শুধু ইসরায়েলের বিরুদ্ধেই নয়, বরং ওয়াশিংটনে ইসরায়েলের প্রধান সমর্থক যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের সঙ্গেও এক ধরনের সংঘাত তৈরি করেছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন