প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
দেশে ব্যাংক কার্ডের ব্যবহার ও লেনদেনের হার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, তবে এক মাসের মধ্যে ক্রেডিট কার্ডের অভ্যন্তরীণ ব্যয় কমে গেছে। অন্যদিকে, বিদেশে বাংলাদেশিদের সম্মিলিত ব্যয় ক্রেডিট, ডেবিট ও প্রিপেইড কার্ডে প্রায় ৯৮৭ কোটি টাকা। একই সময়ে বিদেশিরা বাংলাদেশে কার্ডের মাধ্যমে ব্যয় করেছেন প্রায় ২৪৯ কোটি টাকা। এই কারণে, দেশের বাইরে কার্ডে ব্যয়ের পরিমাণ দেশীয় বিদেশিদের কার্ডে ব্যয়ের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি প্রতিবেদনে এসব তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত দেশে ইস্যু করা ডেবিট, ক্রেডিট ও প্রিপেইড কার্ডের সংখ্যা ৯৬ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে, এসব কার্ডের মাধ্যমে লেনদেনের মোট অর্থমূল্য ১০৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। পাঁচ বছরে কার্ডভিত্তিক লেনদেনের এই প্রবৃদ্ধি দেশে ডিজিটাল আর্থিক সেবার বিস্তার নির্দেশ করে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর শেষে দেশে ডেবিট কার্ডের সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৪২ লাখ ২৫ হাজার ১৬৪টি, ক্রেডিট কার্ড ১৭ লাখ ৬২ হাজার ৯৭৮টি এবং প্রিপেইড কার্ড ১০ লাখ ২৬ হাজার ৫৮০টি। সব মিলিয়ে কার্ডের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৭০ লাখ ১৪ হাজার ৭২২টি।
২০২৬ সালের আগস্টে ডেবিট কার্ডের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ কোটি ৮৭ হাজার ৮০৪টি, ক্রেডিট কার্ড ২৮ লাখ ৫ হাজার ৪৪৯টি এবং প্রিপেইড কার্ড ৯২ লাখ ৭০ হাজার ৯৮৮টি। তিন ধরনের কার্ড মিলিয়ে মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ কোটি ২৯ লাখ ৫৪ হাজার। অর্থাৎ পাঁচ বছরে কার্ডের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
কার্ডের ধরনভেদে প্রবৃদ্ধিতে বড় পার্থক্য লক্ষ্য করা গেছে। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরের তুলনায় ২০২৬ সালের আগস্টে ডেবিট কার্ডের সংখ্যা বেড়েছে ৬৯ শতাংশ, ক্রেডিট কার্ড ৫৯ শতাংশ এবং প্রিপেইড কার্ড ৮০৩ শতাংশ। প্রতিবেদনের পাঁচ বছরের তুলনায় প্রিপেইড কার্ডের বিস্তার সবচেয়ে বেশি। তবে মোট কার্ডের মধ্যে ডেবিট কার্ডই সংখ্যাগরিষ্ঠ।
কার্ডের মাধ্যমে লেনদেনের মোট অর্থমূল্য ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরের ২৪ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২০২৬ সালের আগস্টে ৪৯ হাজার ৭৭০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ মাসিক লেনদেনের অর্থমূল্য পাঁচ বছরে দ্বিগুণের বেশি হয়েছে।
আগস্টে দেশে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৮৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা। জুলাইয়ে এই পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৩২৫ কোটি টাকা। এক মাসে লেনদেনের পরিমাণ কমেছে ৫.৪৪ শতাংশ।
দেশে ক্রেডিট কার্ডে ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশ এসেছে ডিপার্টমেন্ট স্টোর বা বড় বিপণিবিতানে। আগস্টে এ খাতে ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৯৬৯ কোটি টাকা, যা অভ্যন্তরীণ ক্রেডিট কার্ড লেনদেনের ৪৮.১৪ শতাংশ। জুলাইয়ে এ খাতে ব্যয় ছিল ২ হাজার ১৭৬ কোটি টাকা বা মোট লেনদেনের ৫০.৩১ শতাংশ।
অন্যদিকে, খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রে ক্রেডিট কার্ডে ব্যয় জুলাইয়ের ৪৮৮ কোটি টাকা থেকে বেড়ে আগস্টে ৫১৮ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। বিদ্যুৎ-গ্যাসসহ বিভিন্ন পরিষেবার বিল পরিশোধে ব্যয় বেড়ে ৪৪২ কোটি টাকা হয়েছে। ওষুধ ও ফার্মেসিতে ব্যয় হয়েছে ২৮৪ কোটি টাকা, পোশাকের দোকানে ১৯৬ কোটি টাকা এবং পরিবহনে ১২৩ কোটি টাকা।
অন্যদিকে, নগদ অর্থ উত্তোলন, সরকারি সেবা, ব্যবসায়িক ও পেশাগত সেবা এবং অর্থ স্থানান্তর খাতে ব্যয় কমেছে। প্রতিবেদনের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, বড় বিপণিবিতানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনাকাটা, ব্যাংকের প্রচারমূলক সুবিধা এবং এসব প্রতিষ্ঠানে কার্ড গ্রহণের সুযোগ বেশি থাকার কারণে সেখানে কার্ডের ব্যবহার বেশি হতে পারে। তবে এগুলো সম্ভাব্য ব্যাখ্যা; প্রতিবেদনে এসব কারণের পৃথক পরিসংখ্যানভিত্তিক পরীক্ষা দেওয়া হয়নি।
লেনদেনের ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, আগস্টে দেশে ক্রেডিট কার্ডে মোট ব্যয়ের ৯৩.৩৭ শতাংশ পণ্য ও সেবা কেনাকাটায়, ৬.৪৩ শতাংশ নগদ উত্তোলনে এবং ০.২১ শতাংশ অর্থ স্থানান্তরে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ ক্রেডিট কার্ডের প্রধান ব্যবহার কেনাকাটা হলেও নগদ উত্তোলনেও উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় হচ্ছে।
আগস্টে বাংলাদেশে ইস্যু করা ক্রেডিট, ডেবিট ও প্রিপেইড কার্ড দিয়ে বিদেশে মোট ৯৮৭ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এর মধ্যে ক্রেডিট কার্ডে ৫০৫ কোটি, ডেবিট কার্ডে ৪২২ কোটি এবং প্রিপেইড কার্ডে ৬০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।
ক্রেডিট কার্ডে বিদেশে লেনদেনের সংখ্যা ছিল ৮ লাখ ২৩ হাজার ১৫০টি। জুলাইয়ে এ সংখ্যা ছিল ৮ লাখ ৩০ হাজার ৮৬টি। অর্থমূল্যের হিসাবে বিদেশে ক্রেডিট কার্ডে ব্যয় জুলাইয়ের ৫২৬ কোটি টাকা থেকে আগস্টে কমে ৫০৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
বিদেশে ক্রেডিট কার্ডের ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশ গেছে ডিপার্টমেন্ট স্টোরে—৩০.২৯ শতাংশ। খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রে ১৭.৮৯ শতাংশ, পরিবহনে ১২.০৯ শতাংশ এবং ওষুধ ও ফার্মেসিতে ১১.৮৬ শতাংশ ব্যয় হয়েছে। এ ছাড়া ব্যবসায়িক সেবা, পোশাক, সরকারি সেবা, পেশাগত সেবা, পরিষেবার বিল এবং নগদ উত্তোলনেও কার্ড ব্যবহার হয়েছে।
দেশভিত্তিক হিসাবে বিদেশে ক্রেডিট কার্ডের ব্যয়ে যুক্তরাষ্ট্র শীর্ষে। দেশটিতে ব্যয়ের অংশ ১৭.১৬ শতাংশ। এরপর থাইল্যান্ডে ১০.৮৬ শতাংশ, যুক্তরাজ্যে ৯.৭৫ শতাংশ, ভারতে ৯.১২ শতাংশ এবং সিঙ্গাপুরে ৭.৯৮ শতাংশ ব্যয় হয়েছে। মালয়েশিয়া, কানাডা, নেদারল্যান্ডস, সৌদি আরব, চীন ও অস্ট্রেলিয়াসহ অন্যান্য দেশেও বাংলাদেশি কার্ডধারীরা ব্যয় করেছেন।
ডেবিট কার্ডে বিদেশে ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ৪২২ কোটি টাকা, যা জুলাইয়ের ৪০১ কোটি টাকার চেয়ে বেশি। এ খাতে ডিপার্টমেন্ট স্টোরে ২০.২৪ শতাংশ, সরকারি সেবায় ১৭.১২ শতাংশ, ব্যবসায়িক সেবায় ১৩.৯৯ শতাংশ এবং নগদ উত্তোলনে ১২.৯২ শতাংশ ব্যয় হয়েছে। দেশভিত্তিক হিসাবে ডেবিট কার্ডের ব্যয়ে যুক্তরাজ্য ১৪.১৯ শতাংশ নিয়ে শীর্ষে; এরপর যুক্তরাষ্ট্র ১৩.৪৩ শতাংশ এবং ভারত ১১.৭৬ শতাংশ।
প্রিপেইড কার্ডে বিদেশে ব্যয় হয়েছে ৬০ কোটি টাকা, যা জুলাইয়ের ৫৮ কোটি টাকার চেয়ে বেশি। এ ধরনের কার্ডে সরকারি সেবায় ২০.৬০ শতাংশ, নগদ উত্তোলনে ১৭.৫৩ শতাংশ, ডিপার্টমেন্ট স্টোরে ১৬.৩৬ শতাংশ এবং ব্যবসায়িক সেবায় ১৪.৩৯ শতাংশ ব্যয় হয়েছে। দেশভিত্তিক হিসাবে প্রিপেইড কার্ডে ব্যয়ের শীর্ষে ভারত, যার অংশ ১৮.৭১ শতাংশ। এরপর যুক্তরাষ্ট্রে ১৪.৯৪ শতাংশ, সৌদি আরবে ১০.২১ শতাংশ এবং যুক্তরাজ্যে ৯.৪৭ শতাংশ ব্যয় হয়েছে।
বিদেশে ইস্যু করা কার্ড দিয়ে বাংলাদেশে আগস্টে লেনদেন হয়েছে ২৪৯ কোটি টাকা। জুলাইয়ে এ পরিমাণ ছিল ২৩৪ কোটি টাকা। এক মাসে প্রবৃদ্ধি ৬.২৭ শতাংশ।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের আগস্টের তুলনায় ২০২৬ সালের আগস্টে বাংলাদেশে বিদেশিদের কার্ডে ব্যয় বেড়েছে ৩৪.৬৬ শতাংশ।
বিদেশি কার্ডধারীরা বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি ব্যয় করেছেন ডিপার্টমেন্ট স্টোরে, যার অংশ ৩৫.২৫ শতাংশ। নগদ উত্তোলনে ২৩.৭৬ শতাংশ, পরিবহনে ১২.৯৯ শতাংশ এবং পোশাকের দোকানে ৯.১৭ শতাংশ ব্যয় হয়েছে। দেশভিত্তিক হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রে ইস্যু করা কার্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশে মোট লেনদেনের ২১.২৯ শতাংশ হয়েছে। যুক্তরাজ্যের অংশ ১০.৮১ শতাংশ এবং ভারতের ৮.৬১ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের আগস্ট শেষে ৪৭টি তফসিলি ব্যাংক ও একটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে বিতরণযোগ্য ঋণের অনুমোদিত সীমা ছিল ৪৩১.০৮ বিলিয়ন টাকা বা ৪৩ হাজার ১০৮ কোটি টাকা। কার্ড ব্যবহারকারীদের কাছে পাওনা বা স্থিতি ছিল ১৪৪.৮২ বিলিয়ন টাকা বা ১৪ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা। অর্থাৎ ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে ঋণসুবিধার অনুমোদিত সীমা ও ব্যবহারকারীদের কাছে বিদ্যমান পাওনার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান রয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দেশে কার্ডভিত্তিক লেনদেন বাড়লেও নগদনির্ভর অর্থনীতি, ডিজিটাল অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, আর্থিক সাক্ষরতার ঘাটতি, সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ, ডিজিটাল ব্যবস্থার প্রতি আস্থার অভাব, লেনদেনের খরচ এবং স্মার্টফোন ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা নগদবিহীন লেনদেন বিস্তারের পথে বাধা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল্যায়ন অনুযায়ী, কার্ডের ব্যবহার বৃদ্ধি আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও ডিজিটাল অর্থনীতির প্রসারে সহায়ক হতে পারে। তবে কার্ডভিত্তিক লেনদেন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জালিয়াতি প্রতিরোধ, গ্রাহক সুরক্ষা এবং ব্যবহারকারীদের সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন