প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
দেশের তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) বাজারে অস্থিরতা প্রায় দুই মাস ধরে চলমান রয়েছে। সরবরাহ সংকটের সুযোগ নিয়ে সিলিন্ডারগুলো বাড়তি দামে বিক্রি করা হচ্ছে। গ্রাহকরা এই পরিস্থিতিতে ভোগান্তিতে পড়েছেন। এলপিজি বিক্রিতে কমিশন দুই-তিন গুণ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন আমদানিকারক, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতারা। গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) গণশুনানিতে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা এসব প্রস্তাব তুলে ধরেন।
রাজধানীর বিয়াম মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত শুনানিতে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারে আমদানিকারকদের কমিশন বর্তমান ১৯১ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০০ থেকে ৪৭৮ টাকা করার প্রস্তাব এসেছে। পরিবেশকরা কমিশন ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫০ টাকা এবং খুচরা বিক্রেতারা ৪৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০ টাকা করার দাবি জানিয়েছেন। এছাড়া অটোগ্যাসের প্রতি লিটারে কমিশন আট টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
শুনানিতে সরকারি এলপিজি কোম্পানি এলপি গ্যাস পিএলসি, বেসরকারি আবেদনকারী এবং এলপিজি অপারেটর, ডিস্ট্রিবিউটর ও রিটেইলার ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের হিসাব ও মূল্য পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়। অটোগ্যাস স্টেশনগুলোর পক্ষ থেকেও প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী সংগঠন, কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব), ভোক্তা এবং অন্যান্য পক্ষ নিজেদের মতামত ও পর্যবেক্ষণ উপস্থাপন করেন।
বিইআরসির গঠিত কারিগরি কমিটি বিভিন্ন কোম্পানির প্রস্তাব পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন উপস্থাপন করে। কম্পানিগুলোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে বেসরকারি এলপিজির বিভিন্ন পর্যায়ে অপারেটর চার্জ, ডিস্ট্রিবিউটর চার্জ, রিটেইলার চার্জ বাড়ানোর পাশাপাশি ভোক্তা পর্যায়ে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম এক হাজার ৮৩৭ থেকে এক হাজার ৯৭৬ টাকা করার সুপারিশ করেছে কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি।
কারিগরি কমিটির প্রতিবেদনে বেসরকারি এলপিজির মজুদ ও বোতলজাতকরণ বাবদ ব্যয় কেজিতে ১৬ টাকা ৭৪ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২৩ টাকা ৪৮ পয়সা করার সুপারিশ করা হয়েছে। এই প্রস্তাবে কারখানা পরিচালনা, শ্রমিকদের মজুরি, রক্ষণাবেক্ষণ, পরিবহন এবং মূলধনের ওপর নির্ধারিত রিটার্ন বিবেচনা করা হয়েছে। পরিবেশকের কমিশন প্রতি কেজিতে চার টাকা ১৭ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ছয় টাকা ৬৭ পয়সা করার সুপারিশ করা হয়েছে। এর ফলে ১২ কেজির সিলিন্ডারে পরিবেশকের কমিশন ৫০ টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ৮০ টাকা হবে। খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন প্রতি কেজিতে তিন টাকা ৭৫ পয়সা থেকে পাঁচ টাকা ৮৩ পয়সা করার সুপারিশ করেছে কমিটি। অর্থাৎ প্রতি সিলিন্ডারে শুধুমাত্র কমিশন বাবদ ব্যয় ৪৫ টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ৭০ টাকা হবে। আমদানি পর্যায়ে অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয়ও কিছুটা বাড়ানোর সুপারিশ রয়েছে। তবে সৌদি আরামকোর ঘোষিত আন্তর্জাতিক বাজারদর এবং জাহাজভাড়া ও ট্রেড প্রিমিয়ামের বিদ্যমান হার অপরিবর্তিত ধরে এই মূল্যায়ন করা হয়েছে।
মেঘনা ফ্রেশ এলপিজির প্রধান বিপণন কর্মকর্তা আবু সাঈদ রাজা মন্তব্য করেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর আগে জাহাজভাড়াসহ এলপিজি আমদানির প্রিমিয়াম ছিল প্রতি টনে ৮০ থেকে ১২০ ডলার। বর্তমানে তা বেড়ে ২৫০ থেকে ৪০০ ডলারে দাঁড়িয়েছে। পরিচালন ব্যয়ও বেড়েছে। সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে দাম নির্ধারণ করা উচিত, যাতে নির্ধারিত দামের চেয়ে এক টাকাও বেশি নিয়ে কেউ বাজারে এলপিজি বিক্রি করতে না পারে।’
এদিকে, অনুমতি থাকা সত্ত্বেও আমদানি করতে না পারা কম্পানিগুলোর পক্ষ থেকেও পাইকারি দাম নির্ধারণের দাবি জানানো হয়েছে। শুনানিতে ওরিয়ন গ্যাস লিমিটেডের চিফ অপারেটিং অফিসার অনুপ কুমার সেন বলেন, ‘নতুন পরিস্থিতিতে ১০টি কম্পানি এলপিজি আমদানি করতে পারছে না। ফলে তাদের অবকাঠামো অব্যবহৃত পড়ে আছে এবং বাজারে সিলিন্ডারের সংকট তৈরি হচ্ছে। অন্য কম্পানির কাছ থেকে এলপিজি কিনে বিইআরসি নির্ধারিত দামে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে পাইকারি দাম নির্ধারণ করা হলে বাজারে কৃত্রিম সংকট ও অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি কমবে।’
গণশুনানিতে বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে যৌক্তিকতা বজায় রেখে এলপিজির দাম সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
জানা গেছে, দেশে সক্রিয় ৩৫টি এলপিজি কোম্পানির মধ্যে ২৩টির আমদানির অবকাঠামোগত সক্ষমতা রয়েছে। তবে গত মাসে আমদানি করেছে মাত্র ১০টি কোম্পানি। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আমদানি ও সরবরাহব্যবস্থায় এই সীমাবদ্ধতা বাজারের অস্থিরতা বাড়াচ্ছে।
পরিবেশকদের পক্ষ থেকে মেসার্স উজ্জল ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মনি মুক্তা পাল জানান, ‘আমদানিকারক কোম্পানিগুলোর পরিচালন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি পরিবেশকদের খরচও বেড়েছে।’
এই পরিস্থিতিতে প্রতি সিলিন্ডারে পরিবেশকদের কমিশন ১৫০ টাকা নির্ধারণের দাবি জানান তিনি। এ দাবি পূরণ না হলে বাজারে দাম কমানো কঠিন হবে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
অটোগ্যাসের কমিশন বাড়ানোর দাবি জানিয়ে এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন অ্যান্ড কনভারশন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সিরাজুল মাওলা বলেন, ‘২০২১ সালে অটোগ্যাসের প্রতি লিটারে কমিশন আট টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এরপর পাঁচ বছরে পরিচালন ব্যয় অনেক বেড়েছে। শহরের কিছু স্টেশন মুনাফা করতে পারলেও প্রায় ৮০ শতাংশ স্টেশন লোকসানে রয়েছে।’ এ কারণে প্রতি লিটারে কমিশন ১১ টাকা করার দাবি জানান তিনি।
এর আগে পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের ধর্মঘটের হুমকির মুখে কমিশন পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ নেয় বিইআরসি। এলপিজি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি ১৫ ও ১৬ অক্টোবর ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিল। সরকারের সঙ্গে আলোচনার পর ১৪ অক্টোবর কর্মসূচি প্রত্যাহার করা হয়। ওই দিনই গণশুনানির ঘোষণা দেয় বিইআরসি।
দেশের এলপিজি বাজারের প্রায় ৯৯ শতাংশ বেসরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণে। ২০২১ সালের এপ্রিল থেকে প্রতি মাসে এলপিজির দাম সমন্বয় করে আসছে বিইআরসি। তবে নির্ধারিত দামে বাজারে সিলিন্ডার বিক্রি না হওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। চলতি মাসে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে এক হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করা হলেও গ্রাহকদের কিনতে হচ্ছে দুই হাজার ২০০ থেকে দুই হাজার ৩০০ টাকায়।
শুনানির ৯০ দিনের মধ্যে সুপারিশ ও মতামতের ভিত্তিতে নতুন দাম দেওয়ার কথা বিইআরসির। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নভেম্বরের শুরুতেই নতুন দাম ঘোষণা দিতে পারে বিইআরসি।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন